নুর উদ্দীন মোঃ জাহাংগীর, প্রধান লেখক ও সম্পাদক

ভূমিকা:

বাংলার কৃষি-সভ্যতার ইতিহাসে ধান কেবল একটি খাদ্যশস্য নয়; ধান আমাদের জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, লোকজ জ্ঞান ও গ্রামীণ অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলার মাঠে একসময় ঋতুভেদে, মাটির বৈশিষ্ট্য অনুসারে, নদী-খাল-বিলের জলাবদ্ধতা বিবেচনায় এবং মানুষের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চাষ হতো অসংখ্য দেশী ধানের জাত। কোনোটি বন্যার পানিতে টিকে থাকত, কোনোটি লবণাক্ত মাটিতে ফলত, কোনোটি খরার মধ্যেও শীষ মেলত। আবার কোনো ধানের সুগন্ধে ভরে উঠত গ্রামের উঠোন, কোনোটি দিয়ে তৈরি হতো পিঠা-পায়েস, মুড়ি-চিড়া কিংবা নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবার।

কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে কৃষির উৎপাদনব্যবস্থায় এসেছে বৈপ্লবিক রূপান্তর। অধিক ফলন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা পূরণের লক্ষ্যে কৃষিতে প্রবেশ করেছে উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত, আধুনিক প্রযুক্তি, রাসায়নিক সার, সেচ ও যান্ত্রিকীকরণ। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও এর আড়ালে ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়েছে দেশী ধানের বৈচিত্র্য। বহু স্থানীয় জাত হারিয়ে গেছে কৃষকের জমি থেকে, কিছু টিকে আছে বিচ্ছিন্ন গ্রামাঞ্চলে, আর কিছু আশ্রয় পেয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও জিন ব্যাংকের সংরক্ষণাগারে।

 এখানেই জন্ম নিয়েছে এক গভীর প্রশ্ন—উচ্চ ফলনশীলতার প্রতিযোগিতায় আমরা কি আমাদের কৃষির আদি প্রাণ, দেশী ধানের অমূল্য জিনগত সম্পদ হারিয়ে ফেলছি। দেশী ধানের হারিয়ে যাওয়া কেবল কয়েকটি বীজের বিলুপ্তি নয়; এটি বাংলার কৃষি-ঐতিহ্য, পরিবেশগত অভিযোজনক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তার সম্ভাবনার সংকোচন। তাই দেশী ধান সংরক্ষণ এখন শুধু অতীতকে স্মরণ করার বিষয় নয়, বরং আগামী দিনের কৃষিকে নিরাপদ ও জলবায়ুসহিষ্ণু করার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।

১. দেশী ধান: বাংলার মাটি ও মানুষের হাজার বছরের খাদ্যসংস্কৃতি

দেশী ধান বলতে সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের কৃষকসমাজের হাতে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচিত, অভিযোজিত ও সংরক্ষিত স্থানীয় ধানের জাত বা ল্যান্ডরেসকে বোঝায়। এগুলো কোনো একক গবেষণাগারে তৈরি হয়নি। বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম কৃষকের অভিজ্ঞতা, প্রাকৃতিক নির্বাচন এবং স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজনের মধ্য দিয়ে এসব জাতের বৈশিষ্ট্য গড়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য দেশী ধানের বিকাশের জন্য বিশেষ অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। উত্তরাঞ্চলের অপেক্ষাকৃত উঁচু ও খরাপ্রবণ জমি, হাওরাঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী জলমগ্ন পরিবেশ, দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় লবণাক্ত মাটি, নদীবিধৌত চরাঞ্চল এবং বরেন্দ্রভূমির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কৃষকেরা বিভিন্ন ধরনের ধানের জাত নির্বাচন করেছেন।

দেশী ধানের বৈচিত্র্যের মধ্যে রয়েছে আমন, আউশ ও বোরো মৌসুমের নানা স্থানীয় জাত। কালিজিরা, চিনিগুঁড়া, কাটারিভোগ, তুলসীমালা, বালাম, রাঁধুনীপাগল, বিরই, দুধকলম, হিজলদীঘা, লালমোটা, কন্টকতারা, ধারিয়াল, কাজলশাইল, রাজাশাইল, অগুনীশাইল, কুটিয়ামণি, ধলামোডা, গিগোজ, মধূমালতী, টেপাবোরো, খইয়াবোরো, কালিবোরো ও বিভিন্ন স্থানীয় নামের ধান বাংলার কৃষি ঐতিহ্যের পরিচিত অংশ। তবে এসব নামের জাতের পরিচয়, বৈশিষ্ট্য ও বিস্তৃতি অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে।

কোনো জাতের চাল সুগন্ধি, কোনোটি তুলনামূলক পুষ্টিসমৃদ্ধ, কোনোটি বন্যার পানির সঙ্গে উচ্চতা বাড়িয়ে টিকে থাকতে পারে। আবার কোনোটি স্বল্প উপকরণে উৎপাদনযোগ্য। এসব বৈশিষ্ট্যই দেশী ধানকে সাধারণ ফসলের গণ্ডি ছাড়িয়ে এক অমূল্য জীবন্ত জিনগত সম্পদে পরিণত করেছে।

২. উচ্চ ফলনশীল ধানের আগমন: উৎপাদন বাড়ল, কমল বৈচিত্র্য

বাংলাদেশের কৃষিতে উচ্চ ফলনশীল ধানের সম্প্রসারণ খাদ্য উৎপাদনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বাধীনতার পর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা পূরণ, খাদ্য আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে উচ্চ ফলনশীল জাতের গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার হয়।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) এবং অন্যান্য গবেষণা ও সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবিত জাত কৃষকের কাছে পৌঁছে যায়। আধুনিক সেচব্যবস্থা, সার ব্যবস্থাপনা, উন্নত বীজ ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ফলে ধান উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে।

বিশেষ করে বোরো মৌসুমে উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড ধানের সম্প্রসারণ দেশের মোট চাল উৎপাদন বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখে। এর ফলে একদিকে খাদ্যনিরাপত্তা শক্তিশালী হয়েছে, অন্যদিকে কৃষকের উৎপাদন পরিকল্পনায় এসেছে নতুন মাত্রা।

কিন্তু এই পরিবর্তনের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দিকও রয়েছে। অধিক ফলনশীল ও বাজারে চাহিদাসম্পন্ন জাতের প্রতি কৃষকের ঝোঁক বাড়ায় অনেক এলাকায় স্থানীয় জাতের আবাদ কমে গেছে। একই জমিতে বারবার একই বা অল্প কয়েকটি জাতের চাষের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

আগে কৃষক জমির প্রকৃতি ও মৌসুম অনুযায়ী একাধিক জাতের ধান চাষ করতেন। এখন অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন, বাজারমূল্য ও সংগ্রহের সুবিধা বিবেচনায় নির্দিষ্ট কয়েকটি জাতের ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। ফলে কৃষিজমিতে ধানের জিনগত বৈচিত্র্য সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

তবে মনে রাখতে হবে, উচ্চ ফলনশীল জাতের সম্প্রসারণই একমাত্র কারণ নয়। নগরায়ণ, কৃষিজমির পরিবর্তিত ব্যবহার, শ্রমসংকট, বীজ সংরক্ষণের ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়া, বাজারব্যবস্থা এবং জলবায়ু পরিবর্তনও দেশী ধানের সংকটকে ত্বরান্বিত করছে।

৩. দেশী ধানের বৈচিত্র্য কেন অমূল্য জিনগত সম্পদ

দেশী ধানের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো এর জিনগত বৈচিত্র্য। দীর্ঘদিন ধরে ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে অভিযোজিত হওয়ার ফলে স্থানীয় জাতগুলোর মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য গড়ে উঠেছে, যা ভবিষ্যতের ধান গবেষণায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বন্যা ও জলাবদ্ধতা সহনশীলতা: বাংলাদেশের হাওর ও নিম্নাঞ্চলের কিছু স্থানীয় ধান দীর্ঘসময় পানিতে ডুবে থাকা পরিবেশে টিকে থাকার ক্ষমতা অর্জন করেছে। এসব জাতের বৈশিষ্ট্য আধুনিক জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যাসহিষ্ণু ধান উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ জিনগত উপাদান হতে পারে।

খরা সহনশীলতা: বরেন্দ্র ও উত্তরাঞ্চলের কিছু স্থানীয় জাত স্বল্প পানিতে চাষের উপযোগী। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সেচের পানির সংকট বাড়লে এ ধরনের বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যৎ কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

লবণাক্ততা সহনশীলতা: উপকূলীয় অঞ্চলের স্থানীয় ধানের মধ্যে লবণাক্ত পরিবেশে অভিযোজিত কিছু বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার বিস্তার মোকাবিলায় এসব জিনগত সম্পদ কাজে লাগতে পারে।

রোগ ও পোকামাকড় প্রতিরোধক্ষমতা: বিভিন্ন স্থানীয় জাতের মধ্যে নির্দিষ্ট রোগ বা পোকামাকড়ের বিরুদ্ধে সহনশীলতার বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। এসব বৈশিষ্ট্য আধুনিক জাত উদ্ভাবনে মূল্যবান উৎস।

পুষ্টি ও খাদ্যগুণ: লাল, কালো, বেগুনি ও অন্যান্য রঙের দেশী ধানের মধ্যে অ্যান্থোসায়ানিন, খনিজ উপাদান, আঁশ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ভিন্নতা থাকতে পারে। কিছু স্থানীয় সুগন্ধি ধান স্বাদ ও খাদ্যসংস্কৃতির কারণে বিশেষভাবে মূল্যবান।

অর্থাৎ দেশী ধান শুধু অতীতের স্মারক নয়; এটি ভবিষ্যতের কৃষিবিজ্ঞানের সম্ভাবনাময় জিনগত ভান্ডার।

৪. মাঠ থেকে জিন ব্যাংকে: দেশী ধানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

বাংলাদেশের দেশী ধানের বৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নুসরাত ইয়াসমিন ও সহকর্মীদের ২০১৪ সালের একটি গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (IRRI) জিন ব্যাংকে বাংলাদেশ থেকে সংগৃহীত আট হাজারের বেশি ঐতিহ্যবাহী ধানের জাত সংরক্ষিত রয়েছে। গবেষণাপত্রটি আরও উল্লেখ করে, এর বাইরেও নতুন স্থানীয় জাত আবিষ্কারের সম্ভাবনা রয়েছে।

এই তথ্য আমাদের কৃষি ইতিহাসের এক বিস্ময়কর অধ্যায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। একসময় বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকের ঘরে ঘরে ছিল নিজস্ব ধানের বীজভান্ডার। কৃষক নিজের জমির জন্য উপযোগী ধান নির্বাচন করতেন, ভালো গাছের শীষ আলাদা করে রাখতেন এবং পরবর্তী মৌসুমে বীজ হিসেবে ব্যবহার করতেন। এভাবেই গড়ে উঠেছিল স্থানীয় ধানের অসাধারণ বৈচিত্র্য।

কিন্তু আট হাজার জাতের তথ্যকে বাংলাদেশের বর্তমানে মাঠে প্রচলিত আট হাজার স্বতন্ত্র জাত হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। এটি বিভিন্ন সময়ে সংগ্রহ করা ঐতিহ্যবাহী জাত বা জার্মপ্লাজমের সংখ্যা। এর মধ্যে কোনো কোনো জাতের নাম আলাদা হলেও জিনগত বৈশিষ্ট্যে মিল থাকতে পারে। আবার কোনো কোনো জাতের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণের জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের জিন ব্যাংকেও স্থানীয় ধানের গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহ রয়েছে। বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যবিষয়ক পঞ্চম জাতীয় প্রতিবেদনে ব্রির জিন ব্যাংকে ৫,২০২টি স্থানীয় ল্যান্ডরেস বা দেশী ধানের জার্মপ্লাজম নিবন্ধিত থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ মাঠে চাষের পরিমাণ কমে গেলেও দেশী ধানের একটি অংশ গবেষণাগারের সংরক্ষণাগারে বেঁচে আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু জিন ব্যাংকে বীজ রেখে কি একটি জাতের পূর্ণাঙ্গ জীবন ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব ?

উত্তর হচ্ছে, না। বীজের জিনগত পরিচয় সংরক্ষণ করা সম্ভব হলেও সেই জাতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কৃষকের অভিজ্ঞতা, চাষপদ্ধতি, খাদ্যসংস্কৃতি এবং স্থানীয় পরিবেশের অভিযোজনজ্ঞান সংরক্ষণের জন্য মাঠপর্যায়ের উদ্যোগও প্রয়োজন।

৫. জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে দেশী ধানের নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, খরা, লবণাক্ততা এবং তাপমাত্রার পরিবর্তন কৃষি উৎপাদনকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

এই পরিস্থিতিতে দেশী ধানের গুরুত্ব নতুনভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। কারণ স্থানীয় পরিবেশে দীর্ঘদিন অভিযোজিত হওয়ার ফলে অনেক দেশী ধানে প্রতিকূলতা মোকাবিলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

হাওরাঞ্চলের ধান চাষের কথাই ধরা যাক। সেখানে আগাম বন্যা কৃষকের বছরের একমাত্র বোরো ফসল নষ্ট করে দিতে পারে। এ অঞ্চলে স্বল্প জীবনকাল, আগাম পরিপক্বতা এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার ৪০টি স্থানীয় ধানের জাতের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে উল্লেখযোগ্য জিনগত ও কৃষিতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য পাওয়া গেছে। গবেষণাটি ভবিষ্যতে আগাম পরিপক্ব ও উচ্চ ফলনশীল ধান উদ্ভাবনে এসব জার্মপ্লাজম ব্যবহারের সম্ভাবনা তুলে ধরেছে।

একইভাবে উপকূলীয় অঞ্চলের হরকচ, পোক্কালি ও বয়লামসহ কয়েকটি স্থানীয় ধানের মধ্যে লবণাক্ততা সহনশীলতার বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা হয়েছে। এসব জাতের জিনগত বৈশিষ্ট্য আধুনিক লবণাক্ততাসহিষ্ণু ধান উদ্ভাবনে কাজে লাগতে পারে।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—দেশী ধান মানেই কম ফলনশীল বা আধুনিক কৃষির অনুপযোগী নয়। কোনো কোনো দেশী জাতের ফলন কম হতে পারে, কিন্তু তার বিশেষ গুণাগুণ, প্রতিকূলতা সহনশীলতা, স্বাদ, পুষ্টিমান কিংবা বাজারমূল্য তাকে আলাদা গুরুত্ব দিতে পারে।

ভবিষ্যতের কৃষি হবে এমন একটি কৃষিব্যবস্থা, যেখানে শুধু সর্বোচ্চ ফলন নয়; বরং পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন, উৎপাদনের স্থিতিশীলতা, পুষ্টিমান ও কৃষকের অর্থনৈতিক লাভকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে দেশী ধানের জিনগত বৈচিত্র্য অপরিহার্য।

৬. দেশী ধানের খাদ্যসংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক মূল্য

বাংলার খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে দেশী ধানের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। শীতের সকালে নতুন আমন ধানের চালের ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, পায়েস, মুড়ি, চিড়া কিংবা খই—এসব খাবারের স্বাদ ও গুণাগুণ অনেকাংশে নির্ভর করে ধানের জাতের ওপর।

কালিজিরা, চিনিগুঁড়া, কাটারিভোগ ও তুলসীমালার মতো সুগন্ধি চালের রয়েছে বিশেষ বাজার। এসব চাল দিয়ে তৈরি পোলাও, বিরিয়ানি, পায়েস ও অন্যান্য খাবার ভোজনরসিক মানুষের কাছে সমাদৃত। ফলে স্থানীয় জাতের কিছু ধান সাধারণ চালের তুলনায় বেশি মূল্য পেতে পারে।

দেশী ধানের এই বিশেষত্বকে কাজে লাগিয়ে কৃষকের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। যেমন—

  • স্থানীয় সুগন্ধি ধানের ব্র্যান্ডিং ও বাজারজাতকরণ।
  • রাসায়নিক উপকরণের ব্যবহার কমিয়ে নিরাপদ উৎপাদনব্যবস্থার উন্নয়ন।
  • ঐতিহ্যবাহী লাল ও কালো চালের বাণিজ্যিক উৎপাদন।
  • বিশেষ খাদ্য ও পুষ্টিপণ্য তৈরিতে স্থানীয় ধানের ব্যবহার।
  • কৃষিপর্যটন ও ঐতিহ্যবাহী ধান উৎসবের আয়োজন।
  • দেশী ধানের বিশুদ্ধ বীজ উৎপাদন ও বিক্রির উদ্যোগ।

এ ক্ষেত্রে কৃষকের উৎপাদিত ধানের পরিচয় ও বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একই নামে ভিন্ন জাতের চাল বিক্রি কিংবা স্থানীয় জাতের সঙ্গে অন্য জাত মিশিয়ে বাজারজাত করলে ভোক্তার আস্থা নষ্ট হতে পারে। তাই জাত শনাক্তকরণ, বীজের বিশুদ্ধতা এবং মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

৭. দেশী ধান সংরক্ষণে আমাদের করণীয়

দেশী ধান সংরক্ষণ কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। এ জন্য কৃষক, গবেষক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বীজ সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, স্থানীয় প্রশাসন এবং বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন।

প্রথমত, হারিয়ে যাওয়া জাতের তালিকা তৈরি: দেশের প্রতিটি কৃষি-পরিবেশ অঞ্চলে মাঠপর্যায়ে জরিপ চালিয়ে স্থানীয় ধানের নাম, বৈশিষ্ট্য, চাষের সময়, ফলন, ব্যবহার এবং বীজের প্রাপ্যতা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। বিশেষ করে প্রবীণ কৃষকদের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, কৃষকের হাতে বীজ সংরক্ষণ: শুধু গবেষণাগারে বীজ সংরক্ষণ যথেষ্ট নয়। কৃষকের জমিতে দেশী ধানের নিয়মিত চাষ অব্যাহত রাখতে হবে। এ জন্য কমিউনিটি সিড ব্যাংক, কৃষক বীজ সমিতি এবং গ্রামভিত্তিক বীজ সংরক্ষণাগার গড়ে তোলা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, জিন ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধি: ব্রি ও অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জিন ব্যাংকে সংগৃহীত ধানের বীজ নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে জীবনীশক্তি যাচাই, পুনরুৎপাদন, বিশুদ্ধতা রক্ষা এবং ডিজিটাল তথ্যভান্ডার তৈরি করতে হবে। প্রতিটি জাতের সঙ্গে তার উৎস, সংগ্রহের স্থান ও বৈশিষ্ট্যের তথ্য সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

চতুর্থত, গবেষণা ও নতুন জাত উদ্ভাবন: দেশী ধানের মূল্যবান বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করে আধুনিক ধানের সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী সংকরায়ণ ও নির্বাচনের মাধ্যমে উচ্চ ফলনশীল, পুষ্টিসমৃদ্ধ এবং জলবায়ুসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জাতের মূল জিনগত পরিচয়ও সংরক্ষণ করতে হবে।

পঞ্চমত, দেশী ধানের প্রদর্শনী প্লট: প্রতিটি কৃষি অঞ্চলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে স্থানীয় জাতের প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা যেতে পারে। এতে কৃষক নতুন করে দেশী ধানের বৈশিষ্ট্য, উৎপাদন সম্ভাবনা ও বাজারমূল্য সম্পর্কে জানতে পারবেন।

ষষ্ঠত, প্রণোদনা ও বাজার সৃষ্টি: দেশী ধান চাষে আগ্রহী কৃষকদের বীজ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বাজারসংযোগ দিতে হবে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন দেশী ধানের জন্য আলাদা বাজারব্যবস্থা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে কৃষকের আগ্রহ বাড়বে।

সপ্তমত, কৃষি শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি: বিদ্যালয়, কৃষি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে স্থানীয় ধানের বৈচিত্র্য, কৃষকের বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি এবং জিনগত সম্পদের গুরুত্ব অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে, তাদের পূর্বপুরুষের কৃষিজ্ঞানও এক মূল্যবান সম্পদ।

৮. কৃষকের হাতে ফিরুক দেশী ধানের ভবিষ্যৎ

দেশী ধান সংরক্ষণের সবচেয়ে বড় শক্তি কৃষক। কারণ হাজার বছর ধরে কৃষকের হাতেই এই বৈচিত্র্য জন্ম নিয়েছে, বিকশিত হয়েছে এবং টিকে থেকেছে। তাই সংরক্ষণের উদ্যোগে কৃষককে শুধু সুবিধাভোগী নয়, বরং অংশীদার ও জ্ঞানসম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

প্রতিটি অঞ্চলে কৃষকভিত্তিক দেশী ধান সংরক্ষণ দল গঠন করা যেতে পারে। এসব দলের মাধ্যমে স্থানীয় জাতের বীজ সংগ্রহ, বিনিময়, উৎপাদন, পরিচিতি এবং বাজারজাতকরণ করা সম্ভব। বিশেষ করে নারী কৃষকদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক এলাকায় বীজ নির্বাচন, শুকানো, সংরক্ষণ ও খাদ্য প্রস্তুতের ঐতিহ্য নারীদের হাত ধরেই প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হয়েছে।

দেশী ধান নিয়ে আঞ্চলিক উৎসব, বীজ মেলা এবং ঐতিহ্যবাহী খাদ্য উৎসব আয়োজন করা হলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হবে। কৃষি গবেষণার ফলাফল কৃষকের ভাষায় পৌঁছে দিতে হবে এবং স্থানীয় জ্ঞানকে বৈজ্ঞানিক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্বও কম নয়। কৃষিজীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে জাতীয় কৃষি পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকের বীজ সংরক্ষণ ও বিনিময়ের অধিকার, স্থানীয় জাতের পরিচয় এবং জিনগত সম্পদ ব্যবহারে ন্যায্য স্বার্থ নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

৯. আধুনিক কৃষি ও ঐতিহ্যের সহাবস্থানই হোক ভবিষ্যৎ

উচ্চ ফলনশীল ধানের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক ধানের জাত, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি এবং কৃষি গবেষণার বিকল্প নেই। কিন্তু উৎপাদন বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় দেশী ধানের বৈচিত্র্যকে বিসর্জন দেওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত উচ্চ ফলনশীল ও দেশী ধানের মধ্যে কোনো বিরোধ তৈরি না করে উভয়ের গুণাগুণকে কাজে লাগানো। একদিকে আধুনিক ধানের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে, অন্যদিকে দেশী ধানের জিনগত সম্পদ, পরিবেশগত অভিযোজনক্ষমতা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে হবে।

দেশী ধানের প্রতিটি জাত যেন হারিয়ে যাওয়ার আগে গবেষণার আওতায় আসে, কৃষকের হাতে বেঁচে থাকে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত হয়—এটাই হওয়া উচিত আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার।

বাংলার কৃষির ইতিহাসে দেশী ধান ছিল প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানের এক অনন্য নিদর্শন। নদীর পানি, মাটির উর্বরতা, ঋতুর পরিবর্তন এবং কৃষকের অভিজ্ঞতা মিলেমিশে তৈরি করেছিল এই বৈচিত্র্যময় কৃষিসভ্যতা। সেই ঐতিহ্যকে অবহেলা করে টেকসই কৃষির স্বপ্ন পূরণ সম্ভব নয়।

মনে রাখতে হবে, একটি দেশী ধানের জাত হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি বীজ হারানো নয়; হারিয়ে যাওয়া মানে হাজার বছরের কৃষক-অভিজ্ঞতা, প্রকৃতির সঙ্গে অভিযোজনের ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার একটি সম্ভাবনাময় দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া।

তাই সময় এসেছে দেশী ধানকে কেবল অতীতের স্মৃতি হিসেবে নয়, ভবিষ্যতের কৃষির সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার। জিন ব্যাংকের সংরক্ষিত বীজ আবার কৃষকের মাঠে ফিরুক, নতুন প্রজন্ম জানুক তাদের কৃষির শেকড়ের কথা। উচ্চ ফলনশীলতার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যের সমৃদ্ধিও হোক বাংলাদেশের কৃষির অগ্রযাত্রার মাপকাঠি।

ধানের শীষে শুধু খাদ্য নয়, লুকিয়ে আছে একটি জাতির ইতিহাস। সেই ইতিহাসের আদি প্রাণকে বাঁচিয়ে রাখাই হোক আমাদের আগামী দিনের কৃষি দর্শন।

 

তথ্যসূত্র:

1. Yesmin, N., Elias, S. M., Rahman, M. S., Haque, T., Hasan, A. K. M. M., & Seraj, Z. I. (2014). Unique Genotypic Differences Discovered among Indigenous Bangladeshi Rice Landraces. International Journal of Genomics.

2. Saha, S. R., et al. (2022). Rice landraces from haor areas of Bangladesh possess greater genetic diversity as revealed by morpho-molecular approaches along with grain quality traits. Cogent Food & Agriculture.

3. Convention on Biological Diversity. Fifth National Report of Bangladesh to the Convention on Biological Diversity.

4. বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। ব্রি উদ্ভাবিত ধানের জাতসমূহ ও গবেষণা তথ্য। 5. The Daily Star. (28 February 2026). The rice gene bank that feeds Bangladesh.

­­­­­­­­­­­­­­­­­­­­­­­­­­­­­­লেখক পরিচিতি: নুর উদ্দীন মোঃ জাহাংগীর, BAgEd, MSS in Sociology & Anthropology, প্রধান লেখক ও সম্পাদক, কৃষি ও কৃষক ডট কম (krishiokrishok.com)  সাবেক সহকারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, ডিএই, কৃষি মন্ত্রণালয়।