নুর উদ্দীন মোঃ জাহাংগীর, প্রধান লেখক ও সম্পাদক
শহরের ব্যস্ত জীবনে এক টুকরো সবুজের আকাঙ্ক্ষা মানুষের চিরন্তন। কংক্রিটের দেয়াল, ইট-পাথরের ভবন আর যানবাহনের কোলাহলের মধ্যেও ছাদে যখন সবুজ পাতার সমারোহ, ফুলের সৌরভ কিংবা টাটকা সবজির সমাহার দেখা যায়, তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন আবার মানুষের কাছে ফিরে এসেছে। কিন্তু নগরজীবনে ছাদবাগানের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো জায়গার অভাব। ছোট ছাদ, সীমিত টব, পানি ও পরিচর্যার ব্যয়—সব মিলিয়ে অনেকেই চাইলেও পরিকল্পিতভাবে সবজি উৎপাদন করতে পারেন না। এ সমস্যার কার্যকর সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি করেছে ‘শেকড়’ প্রযুক্তি। এ প্রযুক্তির মূল ভাবনা হলো—গাছের শিকড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, মাটির ব্যবহার, গাছের বিন্যাস ও পরিচর্যাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে সীমিত জায়গায় অধিক সংখ্যক গাছ এবং তুলনামূলক বেশি ফলন নিশ্চিত করা। অর্থাৎ শুধু বেশি টব বসানো নয়; বরং গাছের শিকড়, পুষ্টি, পানি, আলো ও জায়গার সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ছাদবাগানকে আরও উৎপাদনশীল করে তোলা। তবে ‘শেকড়’ প্রযুক্তি বলতে কোনো নির্দিষ্ট যন্ত্র, বাণিজ্যিক পদ্ধতি বা স্বীকৃত প্রযুক্তিগত মডেল বোঝানো হলে তার নির্দিষ্ট নকশা ও কার্যপদ্ধতি জানা প্রয়োজন। এখানে শেকড়কেন্দ্রিক পরিকল্পিত ছাদবাগান ব্যবস্থাপনাকে ভিত্তি করে প্রযুক্তিটির ব্যবহারিক দিক তুলে ধরা হয়েছে। লক্ষ্য—বাংলাদেশের নগরবাসী যেন অল্প জায়গায় নিরাপদ, সতেজ ও পুষ্টিকর শাকসবজি উৎপাদনের সুযোগ পান।
‘শেকড়’ প্রযুক্তি কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ:
গাছের শিকড় শুধু মাটি আঁকড়ে ধরে রাখে না; মাটি থেকে পানি ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করে গাছের বৃদ্ধি, ফুল ও ফল ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিকড়ের বিস্তার, মাটির বায়ু চলাচল, পানি ধারণক্ষমতা এবং পুষ্টি সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। শেকড়কেন্দ্রিক ছাদবাগান ব্যবস্থাপনায় গাছের শিকড়ের প্রয়োজন অনুযায়ী পাত্রের গভীরতা ও আয়তন নির্ধারণ, উপযুক্ত মাটির মিশ্রণ, পানি নিষ্কাশন, জৈব পদার্থের ব্যবহার এবং সুষম পুষ্টি সরবরাহের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে লতানো, খাটো, ঝোপালো ও দীর্ঘমেয়াদি গাছকে উপযুক্ত স্থানে বিন্যাস করে উল্লম্ব ও অনুভূমিক জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হয়। এর ফলে অল্প জায়গায় পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদন করা সম্ভব। তবে মনে রাখতে হবে, প্রতিটি গাছের জন্য পর্যাপ্ত শিকড়ের জায়গা ও আলো নিশ্চিত না করে শুধু গাছের সংখ্যা বাড়ালে ফলন বাড়বে না; বরং গাছ দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
ছাদবাগানে ‘শেকড়’ প্রযুক্তি প্রয়োগের মূল কৌশল
১. গাছের শিকড় অনুযায়ী পাত্র নির্বাচন
ছাদবাগানে ফলন বাড়ানোর প্রথম শর্ত হলো ফসলের শিকড়ের প্রকৃতি বুঝে পাত্র নির্বাচন করা। সব গাছের জন্য একই আকারের টব ব্যবহার করা ঠিক নয়। লালশাক, পালংশাক, ধনেপাতা ও অন্যান্য পাতাজাতীয় সবজির শিকড় তুলনামূলক অগভীর। তাই মাঝারি গভীরতার ট্রে বা পাত্রে এগুলো চাষ করা যায়। অন্যদিকে টমেটো, বেগুন, মরিচ, ঢেঁড়স ও শসার মতো ফসলের জন্য তুলনামূলক বড় ও গভীর পাত্র প্রয়োজন। গাজর, মুলা ও বিটের মতো মূলজাতীয় সবজির ক্ষেত্রে পাত্রের গভীরতা এবং মাটির ঝুরঝুরে অবস্থা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পাত্রের নিচে পর্যাপ্ত ছিদ্র রাখতে হবে, যাতে অতিরিক্ত পানি বের হয়ে যেতে পারে। পানি জমে থাকলে শিকড়ে অক্সিজেনের ঘাটতি এবং শিকড় পচা রোগ দেখা দিতে পারে।
২. মাটির বদলে উপযুক্ত গ্রোথ মিডিয়া
ছাদবাগানের পাত্রে শুধু ভারী এঁটেল মাটি ব্যবহার করলে শিকড়ের বৃদ্ধি ও পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই মাটির সঙ্গে পচা গোবর বা কম্পোস্ট, কোকোপিট এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বালি বা অন্যান্য উপযোগী উপাদান মিশিয়ে ঝুরঝুরে গ্রোথ মিডিয়া তৈরি করা ভালো। উপাদানের অনুপাত নির্ভর করবে মাটির প্রকৃতি, পাত্রের ধরন ও ফসলের চাহিদার ওপর। ভালো গ্রোথ মিডিয়ার তিনটি বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন—পানি ধরে রাখবে, অতিরিক্ত পানি বের করে দেবে এবং শিকড়ের জন্য পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের সুযোগ তৈরি করবে। অপরিপক্ব গোবর, পচা আবর্জনা বা রোগাক্রান্ত উদ্ভিদাংশ ব্যবহার করা উচিত নয়।
৩. উল্লম্ব ও বহুস্তরভিত্তিক বাগান
ছাদের জায়গা সীমিত হলে শুধু মেঝেতে টব সাজিয়ে বাগান করলে জায়গার যথাযথ ব্যবহার হয় না। দেয়ালঘেঁষা তাক, উল্লম্ব স্ট্যান্ড, ঝুলন্ত পাত্র ও মাচা ব্যবহার করে একই জায়গায় একাধিক স্তরে গাছ রাখা যায়। এতে মেঝের জায়গা কম ব্যবহার করেও বেশি গাছের ব্যবস্থা করা সম্ভব। তবে প্রতিটি স্তরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পৌঁছাতে হবে। বড় গাছের ছায়ায় ছোট গাছ যেন আলো থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়েও খেয়াল রাখতে হবে। ছাদের ওপর অতিরিক্ত ভার তৈরি হচ্ছে কি না, তা বিবেচনা করা জরুরি।
৪. ‘শেকড়’ প্রযুক্তির বিশেষ বেড ও চ্যানেল পদ্ধতি
প্রচলিত ছাদবাগানে সাধারণত টব, ড্রাম বা হাফ ড্রামে গাছ লাগানো হয়। কিন্তু কৃষিবিদ ইবাদ আলীর উদ্ভাবিত ‘শেকড়’ প্রযুক্তির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—সবজি চাষে উঁচু বেড এবং ফলদ গাছের জন্য চ্যানেল পদ্ধতির ব্যবহার। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ পদ্ধতিতে সবজি চাষের বেডে প্রায় ৪ ইঞ্চি মাটির স্তর রাখা হয়। উদাহরণ হিসেবে ৬ ফুট × ৩ ফুট বেডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলদ গাছের জন্য প্রায় ১০ ইঞ্চি মাটির গভীরতা এবং চ্যানেল বা প্রশস্ত পাত্রের ব্যবস্থা রাখা হয়। এই পদ্ধতির উদ্দেশ্য হলো গাছের শিকড়ের প্রকৃতি অনুযায়ী মাটি ব্যবহার করা, অপ্রয়োজনীয় মাটির পরিমাণ ও ছাদের ওপর ভার কমানো এবং বেডের পাশাপাশি জায়গা ব্যবহার করে গাছের শিকড় বিস্তারের সুযোগ তৈরি করা। লাউ, শিম, কুমড়া, বরবটি, বাঁধাকপি ও মরিচসহ বিভিন্ন সবজি এবং পেয়ারা, জলপাইয়ের মতো ফলদ গাছ এ প্রযুক্তিতে চাষের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে ৪ ইঞ্চি মাটির স্তর সব ধরনের সবজির জন্য উপযুক্ত—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। ফসলের শিকড়ের গভীরতা, গাছের আকার, ফল ধারণের সময়কাল ও পুষ্টির চাহিদা ভিন্ন। তাই উদ্ভাবকের নির্দিষ্ট নকশা ও নির্দেশনা অনুসরণ করার পাশাপাশি ফসলভিত্তিক পরীক্ষণ এবং কৃষিবিদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৫. শিকড়ের বিস্তার ও গাছের বিন্যাস বুঝে ফসল নির্বাচন
‘শেকড়’ প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—গাছের শিকড়ের গঠন ও বিস্তার বিবেচনা করে একই বেডে ফসলের বিন্যাস করা। যেসব গাছের শিকড় তুলনামূলক অগভীর, তাদের সঙ্গে এমন ফসল নির্বাচন করা যায় যাদের শিকড় ভিন্ন স্তরে বা ভিন্ন দিকে বিস্তার লাভ করে। এতে মাটি, পানি ও পুষ্টির জন্য প্রতিযোগিতা কিছুটা কমানো সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, মাচায় লাউ, শিম বা বরবটি চাষের পাশাপাশি বেডের উপযোগী স্থানে স্বল্পমেয়াদি পাতাজাতীয় সবজি লাগানো যেতে পারে। তবে একই বেডে অতিরিক্ত গাছ লাগানো যাবে না। গাছের পূর্ণবয়স্ক আকার, পাতার বিস্তার, আলো-বাতাসের প্রয়োজন এবং শিকড়ের জায়গা বিবেচনা করে দূরত্ব নির্ধারণ করতে হবে। সঠিক বিন্যাসই কম জায়গায় বেশি উৎপাদনের অন্যতম চাবিকাঠি।
৬. পানি ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা
শিকড় সুস্থ থাকলে গাছ পানি ও পুষ্টি উপাদান ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারে। তাই ‘শেকড়’ প্রযুক্তিতে পরিমিত পানি ও সুষম পুষ্টি সরবরাহের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বেডের মাটিতে অতিরিক্ত পানি জমে থাকলে শিকড়ের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যাহত হয়। আবার পানি কম হলে গাছের বৃদ্ধি ও ফল ধারণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে গাছের বয়স, আবহাওয়া এবং মাটির আর্দ্রতা বুঝে সেচ দিতে হবে। পচা গোবর, মানসম্মত কম্পোস্ট ও ভার্মি কম্পোস্ট মাটিতে জৈব পদার্থ যোগ করে। পাশাপাশি ফসলের চাহিদা অনুযায়ী সুষম রাসায়নিক সার ব্যবহার করা যেতে পারে। শুধু বেশি ফলনের আশায় অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করলে লবণাক্ততা, শিকড়ের ক্ষতি এবং পুষ্টির ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। তাই মাটি বা গ্রোথ মিডিয়ার অবস্থা বুঝে সার প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে হবে।
৭. মাচা, আলো ও বাতাসের সঠিক ব্যবহার
ছাদবাগানে লতানো সবজি চাষের ক্ষেত্রে মাচা অত্যন্ত কার্যকর। লাউ, শিম, করলা, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, শসা ও বরবটির মতো ফসল মাচায় তুলে দিলে মেঝের জায়গা খালি থাকে। ফল ও পাতায় পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পৌঁছায় এবং পরিচর্যা ও ফসল সংগ্রহ সহজ হয়। মাচা এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে বাতাসে ভেঙে না পড়ে এবং ভবনের কোনো অংশের ক্ষতি না করে। ছাদের উত্তর-দক্ষিণ বা পূর্ব-পশ্চিম দিক বিবেচনা করে বেড সাজানো এবং বড় গাছের ছায়া ছোট গাছের ওপর না পড়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। গাছের পাতার ঘনত্ব বেশি হলে প্রয়োজনমতো ছাঁটাই করতে হবে। এতে আলো-বাতাস চলাচল বাড়ে এবং কিছু রোগের ঝুঁকি কমে।
কোন কোন ফসল চাষ করা যাবে?
বাংলাদেশের আবহাওয়া ও ছাদবাগানের পরিবেশ বিবেচনায় ‘শেকড়’ প্রযুক্তিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও ফলদ গাছ চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বেড, চ্যানেল, মাটির গভীরতা ও গাছের দূরত্ব ফসলের প্রয়োজন অনুযায়ী ঠিক করতে হবে। লতানো সবজি: লাউ, মিষ্টিকুমড়া, করলা, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, শসা, বরবটি ও শিম। মাচা ব্যবহার করলে ছাদের জায়গার সর্বোত্তম ব্যবহার করা যায়। ফল ও কাণ্ডজাতীয় সবজি: টমেটো, বেগুন, মরিচ, ঢেঁড়স, ফুলকপি ও বাঁধাকপি। উপযুক্ত বেড ও শিকড়ের জায়গা নিশ্চিত করতে হবে। পাতাজাতীয় ও মূলজাতীয় সবজি: লালশাক, পালংশাক, পুঁইশাক, ধনেপাতা, মুলা ও গাজর। স্বল্প সময়ে ফলন পাওয়া যায়; তবে মূলজাতীয় ফসলের জন্য পর্যাপ্ত গভীরতা প্রয়োজন। ফলদ গাছ: পেয়ারা, লেবু, ডালিম, জলপাই ও উপযোগী খাটো জাতের ফলদ গাছ। এগুলোর জন্য চ্যানেল বা প্রশস্ত পাত্রে পর্যাপ্ত শিকড়ের জায়গা ও শক্ত অবকাঠামো প্রয়োজন।
ছাদে ‘শেকড়’ প্রযুক্তি বাস্তবায়নে সতর্কতা
৮. ভবনের ধারণক্ষমতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
ছাদবাগান করার আগে ভবনের নকশা, ছাদের ধারণক্ষমতা এবং পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। ভেজা মাটি, পানি, বেড, ফলদ গাছ ও মাচার সম্মিলিত ওজন ছাদের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই বেড তৈরির আগে অভিজ্ঞ প্রকৌশলীর পরামর্শ নেওয়া উচিত। ছাদের ওয়াটারপ্রুফিং স্তর যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে। পানি জমে থাকা বা ছাদ চুইয়ে পড়ার সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
৯. রোগবালাই ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনা
ছাদবাগানে জাবপোকা, সাদা মাছি, ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা এবং ছত্রাকজনিত রোগের আক্রমণ হতে পারে। নিয়মিত গাছ পর্যবেক্ষণ, আক্রান্ত পাতা ও ফল অপসারণ, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং হলুদ আঠালো ফাঁদ ব্যবহার প্রাথমিক ব্যবস্থাপনায় সহায়ক। একই বেডে দীর্ঘদিন একই পরিবারের ফসল না রেখে ফসল পরিবর্তন করতে হবে। প্রয়োজন হলে বালাই সঠিকভাবে শনাক্ত করে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে।
১০. উৎপাদন ও খরচের হিসাব রাখা
ছাদবাগানকে শুধু শখের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিকল্পিত উৎপাদনব্যবস্থায় পরিণত করা সম্ভব। এজন্য বেডপ্রতি বীজ, চারা, সার, পানি ও শ্রমের খরচ লিখে রাখতে হবে। কতটুকু সবজি উৎপাদিত হলো, পরিবারের চাহিদা কতটুকু পূরণ হলো এবং অতিরিক্ত উৎপাদন বিক্রি করে কত আয় হলো—এসব তথ্য সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এতে কোন ফসল লাভজনক এবং কোন ব্যবস্থাপনায় ফলন বেশি হচ্ছে, তা সহজে বোঝা যাবে।
‘শেকড়’ প্রযুক্তির সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশের নগরায়ণ, আবাদযোগ্য জমির সংকোচন এবং নিরাপদ খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ‘শেকড়’ প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে। ছাদের অব্যবহৃত জায়গাকে উৎপাদনমুখী করে পরিবারের সবজি ও ফলের চাহিদার একটি অংশ পূরণ করা সম্ভব। এতে বাজারের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমবে, পরিবারের পুষ্টি উন্নত হবে এবং নগরের পরিবেশে সবুজের পরিমাণ বাড়বে। চট্টগ্রাম নগরীর ছাদবাগান নিয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২০১৯ সালে নমুনাভুক্ত বাগানগুলোতে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও ফল উৎপাদনের তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ঢাকায় নগর কৃষি নিয়ে ২০২৬ সালে প্রকাশিত গবেষণায় ছাদবাগানকারীদের সবজি ও ফল গ্রহণে ইতিবাচক প্রভাবের কথা উঠে এসেছে। এসব গবেষণা নগর কৃষির সম্ভাবনাকে সমর্থন করে, যদিও এগুলো সরাসরি ‘শেকড়’ প্রযুক্তির ফলন-পরীক্ষা নয়। তবে এ প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে আরও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা প্রয়োজন। বিভিন্ন ফসলের জন্য বেডের উপযুক্ত গভীরতা, মাটির মিশ্রণ, পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, পানি ব্যবহারের দক্ষতা, উৎপাদন খরচ এবং ছাদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পরীক্ষা করা দরকার। উদ্ভাবকের বর্ণিত ফলন বা উৎপাদন বৃদ্ধির দাবি সব ছাদ, সব ফসল ও সব পরিবেশে একইভাবে পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই ছোট পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করে ফলাফল অনুযায়ী বাগান সম্প্রসারণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
উপসংহার
গাছের প্রাণ তার শিকড়ে, আর কৃষির প্রাণ মাটির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্কে। ‘শেকড়’ প্রযুক্তি সেই চিরন্তন সত্যকে সামনে এনে ছাদবাগানের প্রচলিত ধারণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। অল্প মাটি, পরিকল্পিত বেড, চ্যানেল পদ্ধতি, সঠিক শিকড় ব্যবস্থাপনা এবং পরিমিত পানি-পুষ্টি সরবরাহের মাধ্যমে সীমিত জায়গাকে অধিক উৎপাদনশীল করার যে প্রয়াস, তা নগর কৃষির জন্য আশাব্যঞ্জক। তবে প্রযুক্তির সফলতা নির্ভর করবে সঠিক প্রয়োগ, বৈজ্ঞানিক যাচাই, নিরাপদ অবকাঠামো এবং ফসলভিত্তিক পরিচর্যার ওপর। পরিকল্পিতভাবে এ পদ্ধতি সম্প্রসারিত করা গেলে ছাদ আর কেবল ভবনের ওপরের খালি জায়গা থাকবে না; হয়ে উঠবে পরিবারের পুষ্টির বাগান, পরিবেশের সবুজ আশ্রয় এবং নগরজীবনে স্বনির্ভরতার এক ছোট্ট কৃষিক্ষেত্র।
বিষয়টি জরুরী: ‘শেকড়’ প্রযুক্তির বেডের মাপ, মাটির গভীরতা ও ফলনসংক্রান্ত তথ্য উদ্ভাবকের পদ্ধতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে নেওয়া। এগুলোকে সব ফসল ও সব ভবনের জন্য সর্বজনীন সুপারিশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। বাস্তবায়নের আগে ভবনের নিরাপত্তা এবং ফসলভিত্তিক কৃষি পরামর্শ নিশ্চিত করতে হবে।
তথ্যসূত্র:
১. ঢাকা পোস্ট: “শেকড় প্রযুক্তিতে ছাদবাগান, স্বল্প খরচে দ্বিগুণ ফলন”—কৃষিবিদ ইবাদ আলীর উদ্ভাবিত পদ্ধতির মাঠপর্যায়ের বিবরণ।
২. দৈনিক বাংলা: “শেকড় প্রযুক্তি: নগরায়ণের চাপে নতুন আশার আলো”—প্রযুক্তির বেড, চ্যানেল ও শিকড় ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রতিবেদন।
৩. কৃষি তথ্য সার্ভিস (AIS): “ছাদবাগান স্থাপন কৌশল ও সার ব্যবস্থাপনা”—ছাদবাগানের পাত্র, মাটি ও সার ব্যবস্থাপনা।
লেখক পরিচিতি: নুর উদ্দীন মোঃ জাহাংগীর, BAgEd, MSS in Sociology & Anthropology, প্রধান লেখক ও সম্পাদক, কৃষি ও কৃষক ডট কম (krishiokrishok.com) সাবেক সহকারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, ডিএই, কৃষি মন্ত্রণালয়।