নুর উদ্দীন মোঃ জাহাংগীর, প্রধান লেখক ও সম্পাদক

ভূমিকা:

বাংলাদেশের কৃষি মৌসুমে নভেম্বর মাস এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। মাঠে মাঠে কোথাও আমন ধানের শীষ পাকার অপেক্ষায়, কোথাও চলছে ধান কর্তন ও ঘরে তোলার প্রস্তুতি। অন্যদিকে আগাম আবাদকৃত শীতকালীন শাকসবজির জমিতে শুরু হয়েছে পরিচর্যার ব্যস্ততা। টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, শিম, মুলা, গাজর, লালশাক ও পালংশাকসহ নানা সবজির গাছ এ সময় বাড়তে থাকে; কোনো কোনো ফসলে ফুল, ফল বা কন্দ গঠনের পর্যায়ও শুরু হয়। তাই নভেম্বর মাসে কৃষকের প্রধান দায়িত্ব শুধু নতুন ফসল আবাদ করা নয়; বরং ইতোমধ্যে মাঠে থাকা আমন ধান ও আগাম শীতকালীন সবজির পরিচর্যা, রোগবালাই পর্যবেক্ষণ, সেচ-সার ব্যবস্থাপনা এবং সময়মতো ফসল সংগ্রহের প্রস্তুতি নেওয়া। এ সময়ের সামান্য অবহেলা যেমন ফলন ও গুণগত মান কমাতে পারে, তেমনি সময়োপযোগী পরিচর্যা কৃষকের আয় বাড়াতে পারে। অঞ্চল, জাত ও ফসলের বয়স অনুযায়ী ব্যবস্থাপনায় কিছু পার্থক্য থাকলেও নিচের পরামর্শগুলো নভেম্বর মাসের মাঠপর্যায়ের কৃষিকাজে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

নভেম্বর মাসে আমন ধানের বিশেষ করণীয়

১. ধানের পরিপক্বতা বুঝে কর্তন

নভেম্বর মাসে অনেক এলাকায় রোপা আমন ধান পাকার পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তবে সব জাত ও অঞ্চলের ধান একই সময়ে পাকে না। তাই নির্দিষ্ট তারিখ অনুসরণ না করে ধানের দানা ও শীষের পরিপক্বতা দেখে কর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শীষের অধিকাংশ দানা পেকে গেলে এবং দানার রং পরিপক্বতার লক্ষণ ধারণ করলে কর্তন করা উচিত। অপরিপক্ব অবস্থায় কাটলে ধানের ওজন ও গুণগত মান কমে যায়। আবার অতিরিক্ত দেরি করলে ঝড়ো হাওয়া, বৃষ্টি, পাখি ও পোকামাকড়ের কারণে ধান ঝরে পড়তে পারে।

২. পোকামাকড় ও রোগবালাই পর্যবেক্ষণ

ধানের শেষ পর্যায়ে মাজরা পোকা, বাদামি গাছফড়িং, পাতা মোড়ানো পোকা এবং শীষের ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে বাদামি গাছফড়িং গাছের গোড়ায় জমা হয়ে রস শোষণ করে এবং অনুকূল পরিবেশে দ্রুত বংশবিস্তার করে। জমিতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে পোকার উপস্থিতি ও ক্ষতির মাত্রা নির্ণয় করতে হবে। পাশাপাশি ব্লাস্ট, বাদামি দাগ ও শীষের রোগের লক্ষণ খেয়াল রাখতে হবে। রোগ বা পোকা শনাক্ত না করে নির্বিচারে কীটনাশক কিংবা ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করা উচিত নয়। প্রয়োজন হলে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে অনুমোদিত বালাইনাশক নির্ধারিত মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে।

৩. পানি ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা

ধান পাকার পর্যায়ে জমিতে অপ্রয়োজনীয় পানি ধরে রাখার প্রয়োজন নেই। তবে ধান পুরোপুরি পরিপক্ব হওয়ার আগেই জমি অতিরিক্ত শুকিয়ে ফেলাও ঠিক নয়। ফসলের অবস্থা ও মাটির আর্দ্রতা বিবেচনা করে পানি ব্যবস্থাপনা করতে হবে। জমিতে পানি জমে থাকলে কর্তন ও মাড়াইয়ের কাজে সমস্যা হতে পারে। তাই প্রয়োজনমতো পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

৪. ধান মাড়াই, শুকানো ও সংরক্ষণ

কর্তনের পর ধান পরিষ্কার জায়গায় মাড়াই করতে হবে। মাড়াই করা ধান রোদে ভালোভাবে শুকিয়ে নিরাপদ আর্দ্রতায় আনতে হবে। ভেজা বা আধা শুকনো ধান বস্তাবন্দি করলে ছত্রাক, দুর্গন্ধ ও সংরক্ষণকালীন পোকামাকড়ের সমস্যা দেখা দিতে পারে। শুকনো ধান পরিষ্কার, শুষ্ক ও বায়ু চলাচল উপযোগী গুদামে রাখতে হবে। বস্তা সরাসরি মেঝেতে না রেখে কাঠের পাটাতন বা উঁচু স্থানে রাখলে আর্দ্রতার ঝুঁকি কমে।

আগাম আবাদকৃত শীতকালীন শাকসবজির বিশেষ করণীয়

৫. গাছের বয়স ও বৃদ্ধি অনুযায়ী পরিচর্যা

নভেম্বর মাসে আগাম আবাদকৃত শীতকালীন সবজির জমিতে ফসলভেদে বিভিন্ন বৃদ্ধি পর্যায় দেখা যায়। কোথাও টমেটো, বেগুন ও শিমের গাছে ফুল-ফল আসতে শুরু করেছে; কোথাও ফুলকপি ও বাঁধাকপির পাতা বাড়ছে, আবার মুলা, গাজর ও শালগমের মূল বা কন্দ গঠিত হচ্ছে। তাই সব ফসলে একই ধরনের পরিচর্যা না করে গাছের বয়স ও বৃদ্ধির পর্যায় অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। টমেটো ও বেগুনের ক্ষেত্রে মাটি আলগা রাখা, গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী খুঁটি বা মাচার ব্যবস্থা করা জরুরি। ফুলকপি ও বাঁধাকপির জমিতে গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দিলে গাছ হেলে পড়ার ঝুঁকি কমে। শিম ও অন্যান্য লতানো সবজিতে মাচা ঠিক রাখা এবং অতিরিক্ত ঘন ডালপালা ছাঁটাই করে আলো-বাতাস চলাচলের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

৬. সুষম সার ও জৈব সারের ব্যবহার

আগাম আবাদকৃত সবজিতে এ সময় গাছের বৃদ্ধি, ফুল-ফল ধারণ এবং ফলের আকার বাড়ানোর জন্য পুষ্টির চাহিদা পরিবর্তিত হয়। তাই জমির উর্বরতা ও ফসলের পর্যায় অনুযায়ী সার প্রয়োগ করতে হবে। টমেটো, বেগুন, ফুলকপি ও বাঁধাকপিতে সুপারিশ অনুযায়ী ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি এবং প্রয়োজনীয় অনুখাদ্য প্রয়োগ করা যেতে পারে। তবে সব ফসলে একই মাত্রায় সার দেওয়া যাবে না। ইউরিয়া অতিরিক্ত দিলে গাছের পাতা ও কাণ্ডের বৃদ্ধি বাড়লেও ফুল-ফল ধারণ ব্যাহত হতে পারে এবং রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। সম্ভব হলে মাটি পরীক্ষা করে সার প্রয়োগ করুন। পচা গোবর, কম্পোস্ট ও ভার্মি কম্পোস্ট মাটির গঠন ও পানি ধারণক্ষমতা উন্নত করতে সহায়তা করে।

৭. সেচ ও মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখা

শীতের শুরুতে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমতে পারে। বিশেষ করে ফুল-ফল ধারণ ও ফল বৃদ্ধির সময় গাছের পানির ঘাটতি হলে ফলন ও গুণগত মান কমে যায়। তাই জমির মাটির অবস্থা বুঝে প্রয়োজনমতো সেচ দিতে হবে। সকালে সেচ দেওয়া ভালো; তবে অতিরিক্ত পানি জমতে দেওয়া যাবে না। মুলা, গাজর ও শালগমের জমিতে মাটির আর্দ্রতার ঘাটতি হলে মূলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। খড়, শুকনো পাতা বা উপযোগী জৈব উপাদান দিয়ে মালচিং করলে মাটির রস ধরে রাখা এবং আগাছা নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়।

৮. রোগবালাই দমনে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা

আগাম আবাদকৃত শীতকালীন সবজিতে জাবপোকা, সাদা মাছি, ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা, বাঁধাকপির পাতাখেকো পোকা এবং বিভিন্ন ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ দেখা দিতে পারে। টমেটো ও বেগুনে ঢলে পড়া, পাতায় দাগ, ফল পচা এবং কপি জাতীয় সবজিতে চারা পচা বা পাতার রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। আক্রান্ত পাতা, ফল ও গাছ সংগ্রহ করে জমি থেকে সরিয়ে ফেলুন। হলুদ আঠালো ফাঁদ, ফেরোমন ফাঁদ, নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ এবং ফসল পর্যায় অনুসরণ বালাই ব্যবস্থাপনায় সহায়ক। একই জমিতে বারবার একই পরিবারের সবজি চাষ করলে রোগের উৎস জমিতে থেকে যেতে পারে। তাই ফসল পর্যায় অনুসরণ করা জরুরি। বালাইনাশক প্রয়োগের প্রয়োজন হলে রোগ-পোকা সঠিকভাবে শনাক্ত করে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে অনুমোদিত ওষুধ ব্যবহার করতে হবে। ফসল সংগ্রহের আগে নির্ধারিত অপেক্ষাকাল মেনে চলতে হবে।

৯. আগাম সবজি সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ

যেসব জমিতে আগাম আবাদকৃত শাকসবজি সংগ্রহের উপযোগী হয়েছে, সেখানে পরিপক্বতা অনুযায়ী ধাপে ধাপে ফসল তুলতে হবে। মুলা, লালশাক, পালংশাক ও ধনেপাতার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দেরি করলে গুণগত মান কমতে পারে। টমেটো, বেগুন, শিম ও অন্যান্য ফলজাতীয় সবজি বাজারের চাহিদা ও ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত পরিপক্বতায় সংগ্রহ করা উচিত। সবজি সংগ্রহের সময় আঘাত, চাপ ও ক্ষত এড়িয়ে চলুন। পরিষ্কার করে আকার ও মান অনুযায়ী বাছাই করলে বাজারে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

নভেম্বর মাসে কৃষকের জন্য বিশেষ সতর্কতা

এ মাসে দিনের বেলা রোদ ও রাতে তাপমাত্রা কমে যাওয়ার কারণে গাছের পরিচর্যায় সতর্ক থাকতে হবে। কুয়াশা ও শিশিরের কারণে কিছু রোগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে পারে। তাই ঘন গাছের ডালপালা ছাঁটাই, জমিতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল এবং সকালে জমি পর্যবেক্ষণ করা ভালো। আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে কাটা ধান ও সবজি নিরাপদ স্থানে রাখুন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে স্থানীয় আবহাওয়া ও ফসলের অবস্থা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিন।

উপসংহার

নভেম্বর মাস কৃষকের জন্য একই সঙ্গে আমন ধান ঘরে তোলার এবং শীতকালীন সবজির সম্ভাবনাকে সুরক্ষিত করার সময়। একদিকে সোনালি ধানের শীষে জমে থাকে কয়েক মাসের শ্রম ও প্রত্যাশা, অন্যদিকে আগাম আবাদকৃত সবজির সবুজ পাতায় ফুটে ওঠে বাড়তি আয়ের স্বপ্ন। এ সময় ফসলের প্রতিটি পর্যায়ে প্রয়োজনমতো পরিচর্যা, সুষম পুষ্টি, পরিমিত সেচ এবং সমন্বিত রোগবালাই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, অধিক সার বা অধিক কীটনাশক প্রয়োগই অধিক ফলনের নিশ্চয়তা নয়। বরং ফসলের প্রয়োজন বুঝে সঠিক সময়ে সঠিক পরিচর্যা করাই লাভজনক ও নিরাপদ কৃষির মূল ভিত্তি। কৃষকের অভিজ্ঞতা, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শের সমন্বয় ঘটলে নভেম্বর মাস হতে পারে সমৃদ্ধ ফসল, নিরাপদ খাদ্য ও কৃষকের ন্যায্য আয়ের প্রত্যাশা পূরণের মাস।

 

তথ্যসূত্র:

১. বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI): আমন ধানের উৎপাদন ও কর্তন ব্যবস্থাপনা।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট

২. কৃষি তথ্য সার্ভিস (AIS), কৃষি মন্ত্রণালয়: শীতকালীন সবজি ও ফুল চাষ।

কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস)

৩. কৃষি তথ্য সার্ভিস (AIS): শীতকালীন সবজির রোগ ও প্রতিকার।

কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস)

৪. কৃষি তথ্য সার্ভিস (AIS): ঠান্ডাজনিত অভিঘাত মোকাবিলায় কৃষিতে করণীয়।

কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস)

 

লেখক পরিচিতি: নুর উদ্দীন মোঃ জাহাংগীর, BAgEd, MSS in Sociology & Anthropology, প্রধান লেখক ও সম্পাদক, কৃষি ও কৃষক ডট কম (krishiokrishok.com)  সাবেক সহকারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, ডিএই, কৃষি মন্ত্রণালয়।