নুর উদ্দীন মোঃ জাহাংগীর, প্রধান লেখক ও সম্পাদক
ভূমিকা:
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের মাটি, মানুষ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ দেশের কৃষক ধান, গম, ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের মানুষের খাদ্যের জোগান দিয়ে আসছেন। কৃষিজমির প্রতিটি ইঞ্চি এ দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। অথচ সাম্প্রতিক দশকগুলোতে দেশের কিছু কৃষিপ্রধান অঞ্চলে খাদ্যশস্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ফসলের জমিতে তামাক চাষের বিস্তার একটি গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তামাক এমন একটি অর্থকরী ফসল, যার উৎপাদন থেকে কৃষক সাময়িকভাবে তুলনামূলক বেশি নগদ আয় করতে পারেন। তামাক কোম্পানির আগাম অর্থ, বীজ, সার, কীটনাশক এবং উৎপাদিত পণ্য কেনার নিশ্চয়তা অনেক কৃষককে এ ফসলের প্রতি আকৃষ্ট করে। কিন্তু এই আকর্ষণের আড়ালে লুকিয়ে থাকে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত, কৃষিতাত্ত্বিক, সামাজিক ও জনস্বাস্থ্যগত ঝুঁকি। যে জমিতে ধান, ডাল, শাকসবজি কিংবা তেলবীজ উৎপাদিত হওয়ার কথা, সেই জমি যখন ক্রমাগত তামাক চাষের আওতায় চলে যায়, তখন শুধু একটি ফসলের পরিবর্তন ঘটে না; পরিবর্তিত হয় কৃষির উৎপাদন কাঠামো, মাটির স্বাস্থ্য, পানিসম্পদের ব্যবহার এবং স্থানীয় খাদ্য সরবরাহের ভারসাম্য। প্রশ্ন হলো, সাময়িক আর্থিক লাভের বিনিময়ে আমরা কি দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য উৎপাদনের জমি, পরিবেশের ভারসাম্য এবং কৃষির স্থায়িত্বকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছি? তামাক চাষের বিস্তার কি বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য একটি নীরব হুমকি হয়ে উঠছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে তামাক চাষকে কেবল একটি অর্থকরী ফসলের উৎপাদন হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। বরং কৃষি, পরিবেশ, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য অধিকার—সবকিছুর সম্মিলিত প্রেক্ষাপটে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
১. বাংলাদেশে তামাক চাষের বিস্তার ও কৃষিজমির পরিবর্তিত ব্যবহার
বাংলাদেশে তামাক চাষের ইতিহাস নতুন নয়। দেশের উত্তরাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং পার্বত্য এলাকার কিছু অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে তামাক উৎপাদন হয়ে আসছে। বিশেষ করে রংপুর, লালমনিরহাট, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, মানিকগঞ্জ, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকায় তামাক চাষের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। তবে সব এলাকায় এর বিস্তার বা উৎপাদনের মাত্রা সমান নয়। তামাক চাষের বিস্তারের পেছনে কয়েকটি অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, তামাক কোম্পানিগুলো অনেক ক্ষেত্রে কৃষকদের বীজ, সার, কীটনাশক ও আগাম ঋণ সরবরাহ করে। দ্বিতীয়ত, উৎপাদিত তামাকপাতা কেনার নিশ্চয়তা থাকায় কৃষক বাজারজাতকরণ নিয়ে তুলনামূলক কম অনিশ্চয়তা অনুভব করেন। তৃতীয়ত, প্রচলিত খাদ্যশস্যের বাজারমূল্যের ওঠানামা এবং উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের অসামঞ্জস্য অনেক কৃষককে বিকল্প অর্থকরী ফসলের সন্ধানে উৎসাহিত করে। ২০২১ সালে উত্তর বাংলাদেশের রংপুর অঞ্চলে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, জরিপে অংশগ্রহণকারী তামাকচাষিদের ৫৪.০৫ শতাংশ মনে করেছেন, তামাক চাষের কারণে স্থানীয় খাদ্যশস্যের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। একই গবেষণায় ৬২.১৬ শতাংশ উত্তরদাতা তামাক চাষের জমিতে মাটির উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে ৮৯.১৯ শতাংশ কৃষক তামাক বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সাংগঠনিক সহায়তা পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ তামাক চাষের বিস্তারে বাজারের নিশ্চয়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। কৃষক সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ক্ষতির হিসাব করে ফসল নির্বাচন করেন না; বরং বর্তমান মৌসুমে উৎপাদন খরচ, নগদ অর্থের প্রয়োজন, বাজারের নিশ্চয়তা এবং পরিবারের জীবিকা বিবেচনা করেন। ফলে তামাক চাষের বিস্তারকে শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে সমস্যার প্রকৃত কারণ আড়ালে থেকে যাবে। এর সঙ্গে কৃষিবাজার, ঋণব্যবস্থা, কৃষি সম্প্রসারণ সহায়তা এবং বিকল্প ফসলের বিপণন কাঠামোও জড়িত।
২. খাদ্যনিরাপত্তার জন্য তামাক চাষের হুমকি
খাদ্যনিরাপত্তা বলতে শুধু পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন বোঝায় না। মানুষের জন্য নিরাপদ, পুষ্টিকর ও সাশ্রয়ী খাদ্যের নিয়মিত প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে কৃষিজমির সুষ্ঠু ব্যবহার খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম প্রধান শর্ত। তামাক একটি অর্থকরী ফসল, কিন্তু এটি সরাসরি মানুষের খাদ্য বা পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে না। অথচ তামাক উৎপাদনের জন্য উর্বর কৃষিজমি, পানি, শ্রম, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ ব্যবহার করা হয়। ফলে খাদ্যশস্য উৎপাদনের উপযোগী জমি তামাক চাষে ব্যবহৃত হলে খাদ্য উৎপাদনের সম্ভাব্য সুযোগ সংকুচিত হয়। বিশেষ করে যেসব এলাকায় একই জমিতে বোরো ধান, গম, ভুট্টা, ডাল, আলু কিংবা শীতকালীন সবজি উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে, সেখানে তামাকের বিস্তার ফসলের বৈচিত্র্য ও স্থানীয় খাদ্য সরবরাহের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এর প্রভাব কয়েকটি ক্ষেত্রে বিবেচনা করা যায়। প্রথমত, খাদ্যশস্যের জমি কমে যাওয়া: কৃষক যখন লাভের আশায় খাদ্যশস্যের পরিবর্তে তামাক চাষ করেন, তখন স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমার আশঙ্কা তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, পুষ্টিকর ফসলের বৈচিত্র্য হ্রাস: ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি ও ফলমূলের পরিবর্তে এককভাবে তামাক চাষ বাড়লে স্থানীয় মানুষের পুষ্টিকর খাদ্যের সরবরাহ ও বৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তৃতীয়ত, খাদ্য উৎপাদনের ব্যয় ও ঝুঁকি বৃদ্ধি: মাটির স্বাস্থ্য ও পানিসম্পদের অবনতি ঘটলে ভবিষ্যতে অন্যান্য ফসল উৎপাদনের জন্য বেশি উপকরণ ও পরিচর্যার প্রয়োজন হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের ‘Grow food, not tobacco’ উদ্যোগে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বের ১২৪টিরও বেশি দেশে আনুমানিক ৩২ লাখ হেক্টর উর্বর জমিতে তামাক উৎপাদিত হয়। সংস্থাটি খাদ্য উৎপাদনের উপযোগী জমি তামাক চাষে ব্যবহারের বিষয়টিকে খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। কারণ দেশের জনসংখ্যার তুলনায় কৃষিজমি সীমিত এবং নগরায়ণ, শিল্পায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষিজমি নানা চাপের মধ্যে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে খাদ্য উৎপাদনের উপযোগী জমির ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অপরিহার্য।
৩. মাটির স্বাস্থ্য ও উর্বরতা: তামাক চাষের নীরব অভিঘাত
মাটি শুধু ফসল উৎপাদনের মাধ্যম নয়; এটি একটি জীবন্ত প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। মাটির জৈব পদার্থ, অণুজীব, উপকারী ছত্রাক, কেঁচো, খনিজ উপাদান ও পানি ধারণক্ষমতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে মাটির স্বাস্থ্য। দীর্ঘমেয়াদে কৃষির উৎপাদনশীলতা নির্ভর করে এই স্বাভাবিক ভারসাম্যের ওপর। তামাক একটি তুলনামূলকভাবে বেশি পুষ্টি চাহিদাসম্পন্ন ফসল। এর ভালো ফলন ও গুণগত মান বজায় রাখতে অনেক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ প্রয়োগ করা হয়। জমিতে একই ফসলের পুনরাবৃত্তি, অপরিকল্পিত সার প্রয়োগ, জৈব পদার্থের ঘাটতি এবং অনুপযুক্ত জমি ব্যবস্থাপনা মাটির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে। বিশেষ করে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ভারসাম্যহীন ব্যবস্থাপনা মাটির উর্বরতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। শুধু রাসায়নিক সার প্রয়োগ করে মাটির দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য বজায় রাখা সম্ভব নয়; বরং জৈব সার, ফসলের অবশিষ্টাংশ, সবুজ সার এবং শস্য পর্যায় অনুসরণ করা জরুরি। বাংলাদেশের প্রধান তামাক উৎপাদনকারী এলাকার মাটির উর্বরতা নিয়ে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় তামাক ও তামাকবিহীন জমির জৈব কার্বন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ও জিংকসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের অবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ ধরনের গবেষণা তামাক চাষের জমিতে মাটির স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, উত্তর বাংলাদেশের তামাক চাষের জমিতে টানা দুই বছরের গবেষণায় মাটির গুণগত বৈশিষ্ট্য ও ভারী ধাতুর পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়েছে। অতএব, তামাক চাষের জমিতে মাটির স্বাস্থ্য সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নিয়মিত মাটি পরীক্ষা, জৈব পদার্থের পরিমাণ নির্ণয় এবং জমির পুষ্টি ভারসাম্য পর্যবেক্ষণ অপরিহার্য।
৪. রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার: দূষণের বিস্তৃত ঝুঁকি
তামাক চাষে রোগবালাই ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি ফসলের বৃদ্ধি ও উৎপাদন বজায় রাখতে অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার প্রয়োগের প্রবণতাও রয়েছে। সমস্যা তৈরি হয় যখন এসব উপকরণ প্রয়োজনের অতিরিক্ত, ভুল মাত্রায় অথবা অনুপযুক্ত সময়ে ব্যবহার করা হয়। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার বৃষ্টির পানি বা সেচের পানির সঙ্গে ধুয়ে পুকুর, খাল, নদী ও জলাশয়ে প্রবেশ করতে পারে। এতে পানিতে নাইট্রেট ও ফসফেটের পরিমাণ বেড়ে জলজ পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ মাটি ও পানিতে জমা হতে পারে এবং উপকারী পোকামাকড়, জলজ প্রাণী ও অন্যান্য জীবের ক্ষতি করতে পারে। তামাকের জমিতে কীটনাশক প্রয়োগের সময় কৃষিশ্রমিকদের নিরাপত্তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথ সুরক্ষা পোশাক, গ্লাভস, মাস্ক এবং প্রশিক্ষণ ছাড়া কীটনাশক ব্যবহার করলে কৃষকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। তবে মনে রাখতে হবে, সব তামাকক্ষেত্রে একই ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার বা একই মাত্রার দূষণ ঘটে না। প্রকৃত ঝুঁকি নির্ভর করে ব্যবহৃত রাসায়নিকের ধরন, মাত্রা, প্রয়োগপদ্ধতি, মাটির বৈশিষ্ট্য এবং স্থানীয় পানিপ্রবাহের ওপর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তামাক চাষে অতিরিক্ত কৃষি রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে মাটি ও পানিদূষণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয় সম্পর্কে সতর্ক করেছে।
৫. বন উজাড় ও জ্বালানি সংকট: তামাক পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিবেশগত মূল্য
তামাক চাষের পরিবেশগত ক্ষতি শুধু কৃষিজমির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তামাকপাতা সংগ্রহের পর তা প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণের জন্য বিশেষ পদ্ধতিতে শুকাতে হয়। বিশেষ করে ফ্লু-কিউরিং (Flue-curing) পদ্ধতিতে তামাকপাতা শুকানোর জন্য তাপের প্রয়োজন হয়। অনেক এলাকায় এই তাপ উৎপাদনে কাঠ ও অন্যান্য জৈব জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। ফলে তামাক চাষের পাশাপাশি তামাকপাতা শুকানোর জন্য জ্বালানি কাঠের চাহিদা বাড়তে পারে। এর প্রভাবে স্থানীয় বৃক্ষসম্পদ ও বনাঞ্চলের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। বৃক্ষ নিধন বাড়লে মাটির ক্ষয়, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া এবং কার্বন নিঃসরণের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার Tobacco: Poisoning Our Planet প্রতিবেদনে তামাক উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তামাক চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বিশ্বব্যাপী বন উজাড়ের একটি উল্লেখযোগ্য কারণ। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। পাহাড়ের ঢালে বনভূমি পরিষ্কার করে তামাক চাষ করা হলে ভূমিক্ষয়, পাহাড়ি মাটির স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়া এবং বৃষ্টির পানিতে উপরিভাগের উর্বর মাটি ধুয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। পাহাড়ি এলাকার প্রাকৃতিক বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা তাই শুধু পরিবেশগত দায়িত্ব নয়, স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষারও পূর্বশর্ত।
৬. পানিসম্পদের ওপর চাপ: কৃষির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ
বাংলাদেশের কৃষি অনেকাংশে সেচনির্ভর। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে বোরো ধান, গম, ভুট্টা, আলু ও বিভিন্ন সবজি উৎপাদনে ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। তামাক চাষেও জমির আর্দ্রতা বজায় রাখা এবং ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পানি প্রয়োজন হয়। কোনো এলাকায় ব্যাপকভাবে তামাক চাষ সম্প্রসারিত হলে সেখানে অন্যান্য ফসলের সঙ্গে পানির প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। বিশেষত পানিসংকটাপন্ন এলাকায় এটি কৃষি ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। পাশাপাশি রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ বৃষ্টির পানি ও সেচের পানির মাধ্যমে জলাশয়ে প্রবেশ করলে পানির গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব শুধু কৃষির ওপর নয়; মৎস্যসম্পদ, গবাদিপশু এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও পড়তে পারে। তামাক চাষের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে পরিচালিত ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় ভূমি, পানি ও বায়ুদূষণের পাশাপাশি স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের অবনতির বিষয়টি উঠে এসেছে। গবেষণায় অতিরিক্ত চাষাবাদ ও কীটনাশক ব্যবহারের সঙ্গে মাটি ক্ষয়, পানি দূষণ এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্কও তুলে ধরা হয়েছে।
৭. জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের ওপর প্রভাব
একটি সুস্থ কৃষিব্যবস্থা শুধু ফসলের ওপর নির্ভরশীল নয়। সেখানে মৌমাছি, প্রজাপতি, মাকড়সা, পরাগায়নকারী পোকামাকড়, মাটির অণুজীব, কেঁচো, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এরা কৃষি উৎপাদনের প্রাকৃতিক সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। কিন্তু তামাকের একক ফসলভিত্তিক চাষ সম্প্রসারিত হলে স্থানীয় কৃষিজমিতে ফসলের বৈচিত্র্য কমে যেতে পারে। একক ফসলের বিস্তার এবং অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে উপকারী পোকামাকড় ও অন্যান্য জীবের আবাসস্থল ও খাদ্যপ্রাপ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে প্রাকৃতিক উদ্ভিদ ও বনাঞ্চল পরিষ্কার করে তামাক চাষ করা হলে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হয়। জলাশয়ের পাশে রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে মাছ, ব্যাঙ, জলজ পোকামাকড় এবং অন্যান্য প্রাণীর ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। জীববৈচিত্র্য হ্রাসের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে সব সময় দৃশ্যমান হয় না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পরাগায়ন, প্রাকৃতিকভাবে ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণ এবং মাটির জৈবিক কার্যক্রম ব্যাহত হলে কৃষি উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
৮. কৃষকের স্বাস্থ্য ও সামাজিক জীবনে তামাক চাষের প্রভাব
তামাক চাষের অন্যতম উদ্বেগজনক দিক হলো কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি। তামাকপাতা সংগ্রহ ও পরিচর্যার সময় বিশেষ করে ভেজা পাতার সংস্পর্শে এলে ত্বকের মাধ্যমে নিকোটিন শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এর ফলে গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস (Green Tobacco Sickness) নামে পরিচিত অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। এ রোগের লক্ষণ হিসেবে বমি বমি ভাব, বমি, মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা, দুর্বলতা এবং কখনো কখনো হৃদস্পন্দনের পরিবর্তন দেখা যায়। দীর্ঘ সময় তামাকপাতার সংস্পর্শে থাকা শ্রমিকদের এ ধরনের ঝুঁকি বেশি হতে পারে। এ ছাড়া কীটনাশক প্রয়োগ, তামাকপাতা বাছাই, শুকানো ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলে কৃষক ও শ্রমিকরা বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েন। তামাক চাষে পরিবারের নারী ও শিশুদের শ্রম অংশগ্রহণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরা তামাকপাতা সংগ্রহ, বাছাই, বাঁধাই ও শুকানোর কাজে যুক্ত থাকেন। তাদের জন্য স্বাস্থ্যসুরক্ষা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৪ সালের স্বাস্থ্য ও পরিবেশবিষয়ক সংকলনে তামাকপাতা ব্যবস্থাপনার সময় নিকোটিনের সংস্পর্শ এবং কৃষকদের গ্রিন টোব্যাকো সিকনেসের ঝুঁকি উল্লেখ করা হয়েছে।
৯. তামাক চাষের অর্থনীতি: সাময়িক লাভ, দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি
তামাক চাষের পক্ষে কৃষকদের সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো এর বাজারমূল্য ও বিক্রির নিশ্চয়তা। অনেক কৃষক মনে করেন, ধান বা অন্যান্য প্রচলিত ফসলের তুলনায় তামাক চাষে নগদ অর্থ বেশি পাওয়া যায়। বিশেষ করে কোম্পানির আগাম ঋণ, উপকরণ সরবরাহ এবং উৎপাদিত পাতা কেনার নিশ্চয়তা কৃষকের কাছে আকর্ষণীয়। কিন্তু প্রকৃত লাভ নির্ধারণ করতে হলে শুধু বিক্রয়মূল্য থেকে উৎপাদন ব্যয় বাদ দিলেই চলবে না। এর সঙ্গে পরিবারের নিজস্ব শ্রমের মূল্য, জমির বিকল্প ব্যবহার, জ্বালানি, স্বাস্থ্যঝুঁকি, পরিবেশগত ক্ষতি এবং ভবিষ্যৎ মাটির উৎপাদনক্ষমতার বিষয়গুলোও হিসাব করতে হবে। বাংলাদেশে তামাক চাষের অর্থনৈতিক ব্যয় নিয়ে ২০২০ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, পরিবারের অবৈতনিক শ্রম, নিজস্ব সম্পদের সুযোগব্যয় এবং স্বাস্থ্যগত ক্ষতি বিবেচনায় নিলে তামাক চাষের অর্থনৈতিক লাভের চিত্র উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়। গবেষণাটি আরও দেখায়, কোম্পানির অগ্রিম ঋণ ও উৎপাদিত পণ্য কেনার নিশ্চয়তা কৃষকদের তামাক চাষে আকৃষ্ট করার গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অর্থাৎ তামাক চাষের অর্থনৈতিক মূল্যায়নে ব্যক্তিগত নগদ আয় এবং সামগ্রিক সামাজিক-পরিবেশগত লাভ-ক্ষতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। একজন কৃষক হয়তো একটি মৌসুমে ভালো আয় করলেন, কিন্তু পরবর্তী সময়ে জমির উর্বরতা রক্ষায় অতিরিক্ত ব্যয় করতে হলো, পরিবারের সদস্যরা অসুস্থ হলেন কিংবা স্থানীয় পানিসম্পদ দূষিত হলো—তাহলে সেই আয়কে নিঃশর্ত অর্থনৈতিক সাফল্য বলা যায় না।
১০. তামাক চাষের বিকল্প হিসেবে লাভজনক খাদ্য ও অর্থকরী ফসল
তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণের অর্থ কৃষকের আয় কমিয়ে দেওয়া নয়। বরং কৃষকের আয়, জীবিকা ও বাজারের নিশ্চয়তা অক্ষুণ্ণ রেখে পরিবেশবান্ধব ও খাদ্যনিরাপত্তায় সহায়ক ফসল উৎপাদনে উৎসাহিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশের কৃষি-জলবায়ু অঞ্চলভেদে তামাকের পরিবর্তে বিভিন্ন লাভজনক ফসল উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। ডালজাতীয় ফসল: মসুর, মুগ, খেসারি, মাসকলাই ও ছোলা চাষের মাধ্যমে খাদ্য ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের সরবরাহ বাড়ানো যায়। ডালজাতীয় ফসলের শিকড়ের গুটিতে থাকা রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়া বায়ুমণ্ডলীয় নাইট্রোজেন আবদ্ধ করে মাটির উর্বরতা ব্যবস্থাপনাতেও সহায়তা করে। তেলবীজ: সরিষা, সূর্যমুখী, তিল ও চিনাবাদাম চাষের মাধ্যমে ভোজ্যতেলের দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। ভুট্টা ও গম: উপযুক্ত জমি ও বাজারব্যবস্থা থাকলে ভুট্টা ও গম উৎপাদন খাদ্য এবং পশুখাদ্যের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে। শাকসবজি: ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, মরিচ, মিষ্টিকুমড়া, লাউ, শিম ও অন্যান্য শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন সবজি উৎপাদন কৃষকের আয় বাড়াতে পারে। মসলা ও উচ্চমূল্যের ফসল: পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, ধনিয়া ও মরিচের মতো ফসল স্থানীয় বাজারের চাহিদা বিবেচনায় চাষ করা যেতে পারে। ফল ও বহুমুখী কৃষি: জমির প্রকৃতি অনুযায়ী পেঁপে, কলা, পেয়ারা, লেবু এবং অন্যান্য ফলের সঙ্গে শাকসবজি বা ডালজাতীয় ফসলের সমন্বিত উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে কোনো ফসলকে তামাকের সর্বজনীন বিকল্প হিসেবে ঘোষণা করা বাস্তবসম্মত নয়। স্থানীয় মাটি, পানি, আবহাওয়া, উৎপাদন ব্যয়, শ্রমের প্রাপ্যতা, বাজারদর ও সংরক্ষণ সুবিধা বিবেচনা করে বিকল্প ফসল নির্বাচন করতে হবে।
১১. তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণে সরকারের নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব
তামাক চাষের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে শুধু সচেতনতামূলক প্রচারণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত কৃষিনীতি, কার্যকর আইন প্রয়োগ, বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা এবং কৃষকের জন্য লাভজনক বাজারব্যবস্থা। বাংলাদেশ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার Framework Convention on Tobacco Control (WHO FCTC)-এর সদস্য। এই আন্তর্জাতিক কাঠামোর ১৭ অনুচ্ছেদে তামাক চাষের বিকল্প অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা এবং ১৮ অনুচ্ছেদে তামাক উৎপাদন ও ব্যবহারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।
১. তামাক চাষের জমির সঠিক তথ্যভান্ডার তৈরি: উপজেলা ও ইউনিয়নভিত্তিক তামাক চাষের জমি, উৎপাদন, ফসল বিন্যাস এবং পরিবেশগত প্রভাবের তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কোথায় খাদ্যশস্যের জমি তামাক চাষে রূপান্তরিত হচ্ছে, তা চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
২. বিকল্প ফসলের জন্য বিশেষ প্রণোদনা: তামাক চাষ থেকে খাদ্যশস্য ও পুষ্টিকর ফসল উৎপাদনে ফিরে আসা কৃষকদের উন্নত বীজ, সার, সেচ সুবিধা, কৃষিঋণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।
৩. বিকল্প ফসলের বাজার নিশ্চিত করা: কৃষক তামাক ছেড়ে অন্য ফসল উৎপাদন করতে চাইলে তার প্রধান উদ্বেগ থাকে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি নিয়ে। তাই সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সংগ্রহকেন্দ্র, কৃষক বাজার, চুক্তিভিত্তিক বিপণন এবং কৃষক সমবায় গড়ে তোলা প্রয়োজন।
৪. কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করা: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে তামাক চাষপ্রবণ এলাকায় কৃষকদের প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী, মাঠদিবস এবং কৃষক মাঠ স্কুলের আয়োজন করা যেতে পারে। এসব কার্যক্রমে বিকল্প ফসলের উৎপাদন প্রযুক্তি, লাভ-ক্ষতির হিসাব এবং বাজার ব্যবস্থাপনা তুলে ধরতে হবে।
৫. পরিবেশগত নজরদারি বৃদ্ধি: তামাক চাষের জমিতে মাটি পরীক্ষা, পানির গুণগত মান নির্ণয়, কীটনাশকের ব্যবহার এবং তামাকপাতা শুকানোর জন্য জ্বালানি কাঠ ব্যবহারের ওপর নজরদারি প্রয়োজন।
৬. কোম্পানির দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা: তামাক বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের কৃষি উপকরণ সরবরাহ, চুক্তি, কৃষকের ঋণ এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতার বিষয়ে কার্যকর নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। কৃষকের স্বার্থ যেন কোনোভাবেই একতরফা বাণিজ্যিক ব্যবস্থার কাছে জিম্মি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
১২. কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভূমিকা: তামাক থেকে খাদ্যশস্যে প্রত্যাবর্তন
বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রদর্শনী স্থাপন, প্রশিক্ষণ এবং কৃষকের সমস্যা চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তামাক চাষপ্রবণ এলাকায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। শুধু তামাক চাষের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরলেই কৃষক বিকল্প ফসল উৎপাদনে আগ্রহী হবেন না। বরং বিকল্প ফসলের অর্থনৈতিক সুবিধা হাতে-কলমে দেখাতে হবে।
এক্ষেত্রে কয়েকটি কার্যক্রম বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
- তামাক চাষপ্রবণ এলাকায় বিকল্প ফসলের প্রদর্শনী প্লট স্থাপন।
- একই জমিতে তামাক ও বিকল্প ফসলের উৎপাদন ব্যয় এবং নিট মুনাফার তুলনামূলক বিশ্লেষণ।
- ডাল, তেলবীজ, ভুট্টা ও শাকসবজির উন্নত জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি সম্প্রসারণ।
- কৃষক মাঠ স্কুলের মাধ্যমে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM), জৈব সার এবং মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ।
- স্থানীয় কৃষি উদ্যোক্তা, কৃষক সংগঠন, সমবায় ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সংযোগ স্থাপন।
- তামাক চাষ থেকে বিকল্প ফসলে ফিরে আসা কৃষকদের উৎপাদন ও আয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ।
বিশেষ করে অংশগ্রহণমূলক কৃষি সম্প্রসারণ পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। কৃষকের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, স্থানীয় সম্পদ, বাজারের চাহিদা এবং পারিবারিক শ্রমের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে বিকল্প ফসলের পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।
১৩. জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তামাক চাষ ও টেকসই কৃষির ভবিষ্যৎ
জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের কৃষির জন্য বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা, লবণাক্ততা, বন্যা, জলাবদ্ধতা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফসল উৎপাদনের ঝুঁকি বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে কৃষিজমির সর্বোত্তম ব্যবহার এবং মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। তামাকের একক ফসলভিত্তিক চাষ যদি মাটির জৈব পদার্থ হ্রাস, রাসায়নিক দূষণ, বন উজাড় ও পানিসম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে তা জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে শস্য পর্যায়, মিশ্র চাষ, ডালজাতীয় ফসলের অন্তর্ভুক্তি, জৈব পদার্থের ব্যবহার, মালচিং, পানি সাশ্রয়ী সেচ এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা কৃষির স্থায়িত্ব বাড়াতে পারে। তাই বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় শুধু উৎপাদনের পরিমাণ নয়, উৎপাদনের পরিবেশগত মূল্যও বিবেচনায় নিতে হবে। আজকের কৃষিজমি যেন আগামী প্রজন্মের জন্যও উর্বর ও উৎপাদনক্ষম থাকে, সেটিই হওয়া উচিত কৃষি উন্নয়নের মূল দর্শন।
১৪. কৃষককে দায়ী নয়, বিকল্পের নিশ্চয়তা দিতে হবে
তামাক চাষের বিস্তার নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কৃষককে এককভাবে দায়ী করা উচিত নয়। একজন কৃষক মূলত তাঁর পরিবারের জীবিকা, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা এবং দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহের জন্য লাভজনক ফসল নির্বাচন করেন। যখন কোনো ফসলের বাজার নিশ্চিত থাকে, আগাম ঋণ পাওয়া যায় এবং উৎপাদিত পণ্য বিক্রির নিশ্চয়তা থাকে, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই সেই ফসলের প্রতি আকৃষ্ট হন। অন্যদিকে খাদ্যশস্য বা সবজি উৎপাদন করে ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, সংরক্ষণের অভাব, পরিবহন ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য এবং বাজারের অনিশ্চয়তা কৃষককে নিরুৎসাহিত করে। তাই তামাক চাষ কমাতে হলে প্রথমে কৃষকের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিকল্প ফসল উৎপাদনে সহজ ঋণ, মানসম্মত বীজ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, কৃষিবিমা, ন্যায্যমূল্য এবং নিশ্চিত বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এখানে কৃষক সংগঠন, স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং দায়িত্বশীল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কৃষককে শুধু তামাক চাষ ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানালে হবে না; বরং তাঁকে এমন একটি উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা দিতে হবে, যেখানে খাদ্যশস্য উৎপাদন করেও তিনি সম্মানজনক আয় করতে পারেন।
উপসংহার:
কৃষিজমি কোনো সাধারণ সম্পদ নয়; এটি একটি জাতির খাদ্য, অর্থনীতি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার ভিত্তি। এই জমিতে কোন ফসল উৎপাদিত হবে, তার প্রভাব শুধু একজন কৃষকের আয় কিংবা একটি মৌসুমের উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি, মাটির স্বাস্থ্য, পানিসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং গ্রামীণ সমাজের সামগ্রিক কল্যাণ। তামাক চাষ থেকে কৃষক সাময়িক আর্থিক সুবিধা পেতে পারেন—এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সেই সুবিধার বিপরীতে যদি মাটির উৎপাদনক্ষমতা হ্রাস, পানিদূষণ, বনসম্পদের ক্ষয়, কৃষকের স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং খাদ্যশস্যের জমি সংকুচিত হওয়ার মতো সমস্যা তৈরি হয়, তাহলে বিষয়টি জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে, তামাকের বাজারমূল্য থাকতে পারে, কিন্তু তার মাধ্যমে মানুষের ক্ষুধা নিবারণ হয় না। অন্যদিকে ধান, ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি ও ফলমূল শুধু কৃষকের আয়ই বাড়ায় না; এগুলো মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে, কৃষির বৈচিত্র্য রক্ষা করে এবং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি শক্তিশালী করে। অতএব, তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ হতে হবে কৃষকবান্ধব, বিজ্ঞানসম্মত এবং অর্থনৈতিকভাবে বাস্তবসম্মত। তামাক চাষের বিকল্প হিসেবে লাভজনক খাদ্য ও অর্থকরী ফসলের উৎপাদন, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি। আমরা এমন একটি কৃষিব্যবস্থা চাই, যেখানে কৃষকের ঘাম ঝরবে খাদ্যের মাঠে, উর্বর জমি সমৃদ্ধ করবে মানুষের জীবন, আর প্রকৃতি ফিরে পাবে তার স্বাভাবিক প্রাণচাঞ্চল্য। কারণ কৃষির সার্থকতা শুধু অর্থ উপার্জনে নয়; কৃষির প্রকৃত সার্থকতা মানুষের খাদ্য, পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যে। তামাকের পেটে ফসলি জমি নয়, খাদ্যশস্যের সবুজে ভরে উঠুক বাংলার মাঠ। কৃষক বাঁচুক, মাটি বাঁচুক, পরিবেশ বাঁচুক—নিশ্চিত হোক আগামী প্রজন্মের খাদ্যনিরাপত্তা।
তথ্যসূত্র:
1. World Health Organization (WHO). (2023). World No Tobacco Day 2023: Grow food, not tobacco.
2. World Health Organization (WHO). (2022). Tobacco: Poisoning Our Planet.
3. Salam, M. T. B., et al. (2021). Environmental Degradation due to Tobacco Cultivation in Northern Bangladesh. Khulna University.
4. The Economic Cost of Tobacco Farming in Bangladesh. (2020). International Journal of Environmental Research and Public Health.
5. Environmental Impact Assessment of Tobacco Farming in Northern Bangladesh. (2023). Heliyon, 9(3), e14505.
6. Dristy, S. U. A., et al. (2023). Soil Fertility Status of Major Tobacco Growing Lands of Bangladesh. Journal of Bangladesh Agricultural University, 21(4), 509–515.
7. World Health Organization (WHO). (2017). Tobacco and its Environmental Impact: An Overview.
লেখক পরিচিতি: নুর উদ্দীন মোঃ জাহাংগীর, BAgEd, MSS in Sociology & Anthropology, প্রধান লেখক ও সম্পাদক, কৃষি ও কৃষক ডট কম (krishiokrishok.com) সাবেক সহকারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, ডিএই, কৃষি মন্ত্রণালয়।