নুর উদ্দীন মোঃ জাহাংগীর, প্রধান লেখক ও সম্পাদক

ভূমিকা: 

মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে কৃষির অবদান অপরিসীম। যে দিন মানুষ প্রকৃতির কাছ থেকে খাদ্য সংগ্রহের পাশাপাশি মাটিতে বীজ বপন করে ফসল ফলাতে শিখেছিল, সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল স্থায়ী বসতি, গ্রামীণ সমাজ, অর্থনৈতিক বিনিময় এবং সভ্যতার নতুন অভিযাত্রা। কৃষি মানুষের ক্ষুধা মিটিয়েছে, সমাজকে স্থিতিশীল করেছে, সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে এবং অর্থনীতির ভিত নির্মাণ করেছে। তাই কৃষি কেবল একটি উৎপাদনব্যবস্থা নয়; এটি মানবজীবনের অস্তিত্ব, মর্যাদা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। কিন্তু একুশ শতকের পৃথিবীতে কৃষি এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে জনসংখ্যা, নগরায়ণ ও খাদ্যচাহিদার পরিবর্তন; অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমির সংকোচন, পানিসম্পদের ওপর চাপ, উৎপাদন ব্যয়ের বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা। প্রযুক্তি কৃষিকে অভাবনীয় সম্ভাবনা দিয়েছে, আবার সেই প্রযুক্তির অসম প্রাপ্যতা ও অপরিকল্পিত ব্যবহারে নতুন সংকটও সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। এ দেশের কৃষক প্রতিদিন প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে ধান, গম, ভুট্টা, ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি ও ফল উৎপাদন করেন। মাছ, দুধ, ডিম ও মাংসের জোগানেও কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান রয়েছে। অথচ কৃষকের উৎপাদন ব্যয়, ন্যায্যমূল্য, জলবায়ুজনিত ঝুঁকি এবং কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। অন্যদিকে, খাদ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও সবার পক্ষে সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য কেনা সম্ভব হয় না। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) অনুসারে, খাদ্যনিরাপত্তা বলতে এমন পরিস্থিতিকে বোঝায়, যখন সব মানুষ সব সময় পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য পাওয়ার বাস্তব ও অর্থনৈতিক সুযোগ লাভ করে, যা তাদের খাদ্যচাহিদা ও পছন্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সুস্থ, সক্রিয় জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয়। খাদ্যের প্রাপ্যতা, খাদ্যে প্রবেশাধিকার, খাদ্যের যথাযথ ব্যবহার এবং সময়ের সঙ্গে সেই সুযোগের স্থিতিশীলতা—এই চারটি মাত্রা খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি। অতএব, খাদ্যনিরাপত্তা মানে শুধু গুদামভর্তি চাল কিংবা বাজারে খাদ্যের উপস্থিতি নয়। এর অর্থ হলো, প্রতিটি পরিবার যেন সাধ্যের মধ্যে প্রয়োজনীয় খাদ্য কিনতে পারে; প্রতিটি শিশু যেন পুষ্টিকর খাবার পায়; প্রতিটি কৃষক যেন উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পান; এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অর্থনৈতিক সংকটেও যেন মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তি ভেঙে না পড়ে। এই বাস্তবতায় একুশ শতকের কৃষিকে নতুন দৃষ্টিতে দেখা জরুরি। কৃষির লক্ষ্য হতে হবে উৎপাদন বৃদ্ধি, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ, কৃষকের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্থিতিশীল খাদ্যব্যবস্থা নির্মাণ। বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা এবং আমাদের করণীয় নিয়েই এই প্রবন্ধের আলোচনা।

১. খাদ্যনিরাপত্তা: উৎপাদন থেকে পুষ্টির পূর্ণাঙ্গ ধারণা

খাদ্যনিরাপত্তার ধারণা সময়ের সঙ্গে বিস্তৃত হয়েছে। একসময় খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ানো এবং দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধকেই প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বর্তমানে খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, খাদ্যের পুষ্টিমান, নিরাপদ উৎপাদন, পরিবেশগত স্থায়িত্ব এবং সংকটের মধ্যেও খাদ্য সরবরাহ বজায় রাখার সক্ষমতা। খাদ্যনিরাপত্তার চারটি পরস্পরসম্পর্কিত স্তম্ভ রয়েছে। খাদ্যের প্রাপ্যতা: দেশের নিজস্ব উৎপাদন, আমদানি, মজুত এবং সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে পর্যাপ্ত খাদ্য নিশ্চিত করা। খাদ্যে প্রবেশাধিকার: মানুষের আয়, ক্রয়ক্ষমতা, কর্মসংস্থান এবং বাজারে পৌঁছানোর সুযোগের মাধ্যমে খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা। খাদ্যের যথাযথ ব্যবহার: নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য প্রস্তুতি, পুষ্টিবিষয়ক জ্ঞান এবং বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে খাদ্যের পুষ্টিগুণ কাজে লাগানো। স্থিতিশীলতা: বন্যা, খরা, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব কিংবা সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্নের মধ্যেও নিয়মিত খাদ্যপ্রাপ্তি বজায় রাখা। এই চারটি স্তম্ভের কোনো একটি দুর্বল হলে সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তা ব্যাহত হতে পারে। দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদিত হলেও দরিদ্র পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কম থাকলে তারা খাদ্যসংকটে পড়তে পারে। আবার খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ যথেষ্ট হলেও খাদ্যে প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি থাকলে পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। বাংলাদেশের জন্য তাই খাদ্যনিরাপত্তার পরবর্তী ধাপ হলো পর্যাপ্ত খাদ্য থেকে সবার জন্য সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা।

২. বাংলাদেশের কৃষির অর্জন ও বর্তমান বাস্তবতা

বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের ইতিহাস সংগ্রাম ও সাফল্যের ইতিহাস। সীমিত কৃষিজমি এবং উচ্চ জনঘনত্বের মধ্যেও কৃষকের পরিশ্রম, উন্নত বীজ, সেচব্যবস্থা, সার ব্যবস্থাপনা, গবেষণা এবং কৃষি সম্প্রসারণের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য। পাশাপাশি মাছ, আলু, শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, ভুট্টা, দুধ, ডিম ও মাংসের উৎপাদন দেশের খাদ্যব্যবস্থাকে বৈচিত্র্যময় করছে। গ্রামীণ কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য হ্রাস এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বিকাশেও কৃষির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের বাংলাদেশবিষয়ক কৃষি-খাদ্যব্যবস্থা উন্নয়ন প্রতিবেদনে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণ, খাদ্যনিরাপত্তা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং জলবায়ু সহনশীলতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে অর্জনের পাশাপাশি কয়েকটি মৌলিক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। কৃষিজমির ওপর আবাসন, শিল্প ও অবকাঠামো নির্মাণের চাপ রয়েছে। অনেক এলাকায় উৎপাদন উপকরণের ব্যয় বাড়ছে। কৃষক ফসল উৎপাদন করলেও বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়ার নিশ্চয়তা সব সময় থাকে না। ফসল কাটার পর সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সীমাবদ্ধতাও কৃষকের লাভ কমাতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর সঙ্গে পুষ্টিকর খাদ্যের প্রাপ্যতা সব সময় একই গতিতে বাড়ে না। চালের পাশাপাশি ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি, ফল, মাছ, ডিম ও দুধের সাশ্রয়ী সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সুতরাং বাংলাদেশের কৃষির সাফল্যকে আরও অর্থবহ করতে উৎপাদনের পরিমাণের পাশাপাশি কৃষকের আয়, খাদ্যের পুষ্টিমান, ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা এবং পরিবেশের স্বাস্থ্যকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

৩. আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি: খাদ্যনিরাপত্তার নতুন সম্ভাবনা

একুশ শতকের কৃষি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার জমির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে, উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং কৃষকের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।

কৃষিযান্ত্রিকীকরণ

জমি প্রস্তুত, বীজ বপন, চারা রোপণ, ফসল কাটা ও মাড়াইয়ের জন্য উপযোগী যন্ত্র ব্যবহারে সময় ও শ্রম সাশ্রয় হয়। বিশেষ করে ধান কাটার মৌসুমি শ্রমিকসংকট মোকাবিলায় কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ক্ষুদ্র কৃষকের পক্ষে সব যন্ত্র কেনা সম্ভব নয়। তাই যন্ত্রভাড়া কেন্দ্র, সমবায়ভিত্তিক ব্যবহার এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে কৃষিযন্ত্র সেবা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।

স্মার্ট কৃষি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

সেন্সর, আবহাওয়ার তথ্য, উপগ্রহচিত্র, ড্রোন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ফসলের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, সেচের প্রয়োজন নিরূপণ এবং রোগবালাই শনাক্তকরণে সহায়তা পাওয়া যায়। মাটির পরীক্ষার ভিত্তিতে সার প্রয়োগ এবং জমির প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দিলে উৎপাদন উপকরণের অপচয় কমানো সম্ভব। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বাজারদর এবং কৃষি পরামর্শ পৌঁছে দেওয়াও খাদ্য উৎপাদনকে আরও তথ্যনির্ভর করতে পারে। তবে প্রযুক্তি যেন শুধু বড় কৃষকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। স্থানীয় ভাষায় সহজ ব্যবহারযোগ্য সেবা, প্রশিক্ষণ এবং সাশ্রয়ী প্রযুক্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

উন্নত বীজ ও গবেষণা

লবণাক্ততা, খরা, জলাবদ্ধতা ও রোগপ্রতিরোধী জাত কৃষির ঝুঁকি কমাতে পারে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য উপযোগী ফসলের জাত নির্বাচন এবং মানসম্মত বীজের সরবরাহ বাড়ানো খাদ্যনিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সমন্বয় প্রয়োজন। গবেষণার ফল মাঠপর্যায়ে প্রয়োগের উপযোগী না হলে তার সুফল কৃষকের কাছে পৌঁছাবে না।

৪. জলবায়ু পরিবর্তন: কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার বড় পরীক্ষা

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তাপপ্রবাহ, খরা, লবণাক্ততা ও নদীভাঙন কৃষি উৎপাদনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এসব দুর্যোগ শুধু ফসল নষ্ট করে না; কৃষকের আয়, খাদ্যের দাম, কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ পরিবারের খাদ্যপ্রাপ্তিকেও প্রভাবিত করে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে কৃষিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

  • উপকূলীয় অঞ্চলে উপযোগী লবণাক্ততা-সহনশীল ফসলের জাত নির্বাচন।
  • খরাপ্রবণ এলাকায় পানি সাশ্রয়ী সেচ এবং মাটির আর্দ্রতা সংরক্ষণ।
  • হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যার ঝুঁকি বিবেচনায় ফসলের জাত ও সময় নির্বাচন।
  • বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ।
  • আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
  • ফসলের বৈচিত্র্য বাড়িয়ে একটি ফসলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো।

এ ধরনের উদ্যোগ জলবায়ু-সহনশীল কৃষি গড়ে তুলতে পারে। তবে কৃষককে শুধু প্রযুক্তি দিলেই চলবে না; প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন, বীমা এবং দুর্যোগের পর পুনরুদ্ধার সহায়তাও নিশ্চিত করতে হবে।

৫. টেকসই কৃষি: মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করে খাদ্য উৎপাদন

মাটি কৃষির প্রাণ। কিন্তু দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত চাষ, ভারসাম্যহীন সার প্রয়োগ, জৈব পদার্থের ঘাটতি এবং কিছু ক্ষেত্রে দূষণের কারণে মাটির স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ এবং বালাইনাশকের অনুপযুক্ত ব্যবহার পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়াতে পারে। খাদ্যনিরাপত্তা দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে মাটি ও পানির উৎপাদনক্ষমতা সংরক্ষণ করতে হবে। মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে সুষম সার প্রয়োগ, কম্পোস্ট ও জৈব পদার্থের ব্যবহার, ফসল পর্যায়ক্রম, ডালজাতীয় ফসল অন্তর্ভুক্ত করা এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে টেকসই কৃষি মানে সব রাসায়নিক উপকরণ পরিত্যাগ করা নয়। বরং প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় উপকরণ ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় প্রয়োগ কমানো এবং পরিবেশের ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করাই মূল লক্ষ্য। প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করে উৎপাদন বাড়াতে পারলেই বর্তমান প্রজন্মের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্যপ্রাপ্তিও সুরক্ষিত হবে।

৬. কৃষকের ন্যায্যমূল্য ও খাদ্যের ক্রয়ক্ষমতা

খাদ্যনিরাপত্তার একটি মৌলিক শর্ত হলো খাদ্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকা। বাজারে পর্যাপ্ত খাদ্য থাকলেও আয় কমে গেলে কিংবা খাদ্যের দাম বেড়ে গেলে দরিদ্র পরিবার প্রয়োজনীয় খাবার কিনতে সমস্যায় পড়ে। একই সঙ্গে কৃষকও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে চাপে পড়েন। বীজ, সার, শ্রম, সেচ, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের তুলনায় বিক্রয়মূল্য কম হলে পরবর্তী মৌসুমে বিনিয়োগ করার সক্ষমতা কমে যায়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন— উৎপাদন খরচের নির্ভরযোগ্য হিসাব: ফসলভিত্তিক উৎপাদন ব্যয় সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। বাজারের স্বচ্ছ তথ্য: কৃষককে স্থানীয় ও জাতীয় বাজারদর এবং সম্ভাব্য চাহিদা সম্পর্কে সময়মতো জানাতে হবে। সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ: আলু, পেঁয়াজ, টমেটো, আম ও অন্যান্য পচনশীল পণ্যের উপযোগী সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কৃষক সংগঠন ও সরাসরি বিপণন: উৎপাদক সংগঠন, সমবায় এবং ক্রেতার সঙ্গে সরাসরি সংযোগের মাধ্যমে বিপণন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। সামাজিক সুরক্ষা: নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য কার্যকর খাদ্যসহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিশ্চিত করতে হবে। এখানে ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষককে ন্যায্যমূল্য দিতে হবে, আবার ভোক্তাকেও সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য পেতে হবে। দক্ষ সরবরাহব্যবস্থা, অপচয় হ্রাস এবং বাজারে স্বচ্ছতা এই দুই লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে পারে।

৭. পুষ্টিনিরাপত্তা: শুধু পেট ভরানো নয়, সুস্থ জাতি গঠন

একটি জাতির উন্নয়ন নির্ভর করে তার মানুষের স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা ও মেধার ওপর। তাই খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে পুষ্টিনিরাপত্তার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। চাল মানুষের ক্যালরির চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু ভাতনির্ভর খাদ্যতালিকা দিয়ে সব পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। ডাল, মাছ, ডিম, দুধ, শাকসবজি, ফল এবং অন্যান্য পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য নিয়মিত গ্রহণের সুযোগ থাকতে হবে।

বাংলাদেশের কৃষিতে পুষ্টিসংবেদনশীল পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে—

  • ডাল ও তেলবীজের উৎপাদন বাড়ানো।
  • নিরাপদ শাকসবজি ও ফলের সরবরাহ নিশ্চিত করা।
  • জিংক ও আয়রনের মতো পুষ্টি উপাদানসমৃদ্ধ ফসলের উন্নয়ন ও ব্যবহার উৎসাহিত করা।
  • বসতবাড়িতে পুষ্টিবাগান গড়ে তোলা।
  • মাছ, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর উৎপাদনব্যবস্থার উন্নয়ন।
  • খাদ্য সংরক্ষণ, প্রস্তুতি ও পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো।

খাদ্যের পুষ্টিমান বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপদ উৎপাদনও নিশ্চিত করতে হবে। দূষিত পানি, অনিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার, খাদ্যে ভেজাল এবং অনুপযুক্ত সংরক্ষণ মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। পুষ্টিনিরাপত্তা তাই কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি ও স্যানিটেশন এবং সামাজিক সুরক্ষার সমন্বিত দায়িত্ব।

৮. কৃষি সম্প্রসারণ ও জ্ঞান স্থানান্তর: মাঠ থেকে নীতিনির্ধারণে

কৃষি গবেষণার ফল কৃষকের কাছে পৌঁছানো খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনের অন্যতম শর্ত। উন্নত জাত, সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ কিংবা জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হলেও কৃষক যদি সঠিক তথ্য না পান, তবে তার সুফল সীমিত থাকবে। কৃষি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকের প্রয়োজন নিরূপণ, মাঠ জরিপ, প্রদর্শনী, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি গ্রহণের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণার সঙ্গে মাঠের অভিজ্ঞতার সংযোগ স্থাপন করা যায়। এ ক্ষেত্রে কৃষক মাঠবিদ্যালয়, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, স্থানীয় ভাষায় ডিজিটাল পরামর্শ এবং কৃষক-থেকে-কৃষক জ্ঞান বিনিময় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। নারী কৃষক, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সহায়তা প্রয়োজন। কারণ কৃষির রূপান্তর তখনই অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, যখন নতুন প্রযুক্তির সুফল সমাজের সব স্তরে পৌঁছাবে।

৯. খাদ্যনিরাপত্তায় আমাদের ভাবনা: ভবিষ্যতের জন্য আটটি অগ্রাধিকার

বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা সুদৃঢ় করতে শুধু উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা।

১. কৃষিজমি সংরক্ষণ: পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার এবং কৃষিজমির অপ্রয়োজনীয় রূপান্তর নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

২. কৃষি গবেষণা জোরদার: স্থানীয় পরিবেশ উপযোগী জাত, পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং রোগবালাই ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

৩. কৃষকের আয় বৃদ্ধি: ন্যায্যমূল্য, সহজলভ্য অর্থায়ন, কৃষিবীমা ও বাজারসংযোগ উন্নত করতে হবে।

৪. খাদ্যব্যবস্থার বৈচিত্র্য: ধানের পাশাপাশি ডাল, তেলবীজ, ফল, শাকসবজি ও প্রাণিজ খাদ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়াতে হবে।

৫. জলবায়ু সহনশীলতা: দুর্যোগের পূর্বাভাস, সহনশীল জাত, পানি ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত পুনরুদ্ধার সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

৬. ফসল-পরবর্তী ক্ষতি হ্রাস: সংরক্ষণ, শীতল পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিংয়ের উন্নয়ন ঘটাতে হবে।

৭. ডিজিটাল কৃষিসেবা: আবহাওয়া, বাজারদর, রোগবালাই এবং কৃষি পরামর্শ সহজে পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

৮. জবাবদিহিমূলক মূল্যায়ন: উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষকের আয়, খাদ্যের দাম, পুষ্টিমান, মাটির স্বাস্থ্য এবং দুর্যোগ সহনশীলতার অগ্রগতি নিয়মিত পরিমাপ করতে হবে।

 

এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে সরকার, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত, স্থানীয় প্রশাসন, কৃষক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন

 

তথ্যসূত্র:

1. FAO. (2008). An Introduction to the Basic Concepts of Food Security. খাদ্যনিরাপত্তার চারটি মূল মাত্রা সম্পর্কে প্রাথমিক নির্দেশিকা।

2. World Bank. (2023). What Is Food Security? খাদ্যের প্রাপ্যতা, প্রবেশাধিকার, ব্যবহার ও স্থিতিশীলতা বিষয়ে ব্যাখ্যা।

3. World Bank. (2024). Bangladesh: Promoting Diversification, Food Safety, Entrepreneurship, and Climate Resilience Across Agri-food Systems.

4. FAO. (2024). Ensuring Food Security: Why Agency and Sustainability Matter.

5. FAO ও বাংলাদেশ সরকার। (2025). বাংলাদেশের কৃষি রূপান্তর, খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি ও জলবায়ু সহনশীলতা বিষয়ে সহযোগিতামূলক উদ্যোগ।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

লেখক পরিচিতি: নুর উদ্দীন মোঃ জাহাংগীর, বিএজিএড, এমএসএস, প্রধান লেখক ও সম্পাদক, কৃষি ও কৃষক ডট কম (krishiokrishok.com) সাবেক সহকারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, ডিএই, কৃষি মন্ত্রণালয়।