ভূমিকা

নগরজীবনের ব্যস্ততা, কংক্রিটের ভবন, সীমিত খোলা জায়গা এবং কর্মব্যস্ততার কারণে শহরের মানুষের প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে শহুরে নারীদের জন্য বারান্দা কৃষি হতে পারে বিনোদন, মানসিক প্রশান্তি, পুষ্টি, পরিবেশ সচেতনতা এবং পারিবারিক সম্পৃক্ততার একটি চমৎকার মাধ্যম। বড় জমি প্রয়োজন হয় নাকয়েকটি টব, পুরোনো বালতি, প্লাস্টিকের পাত্র, গ্রো ব্যাগ বা কাঠের বাক্স ব্যবহার করেই ছোট পরিসরে বারান্দা বাগান তৈরি করা সম্ভব। বাংলাদেশের শহরগুলোতে নগর কৃষির সম্ভাবনা নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাতেও ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। ঢাকার চারটি সিটি করপোরেশন এলাকায় পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শহুরে বাগান করার প্রশিক্ষণ উপকরণ পাওয়ার পর অংশগ্রহণকারী পরিবারগুলোতে উৎপাদিত ফল সবজির বৈচিত্র্য, ফসল সংগ্রহের হার এবং নারীদের খাদ্যবৈচিত্র্য বেড়েছে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ৮৫ শতাংশই ছিলেন নারী। অতএব, বারান্দা কৃষিকে শুধু সবজি উৎপাদনের পদ্ধতি হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব ধরা পড়ে না। এটি হতে পারে শহুরে নারীদের একটি সৃজনশীল বিনোদন, আত্মনির্ভরতার অনুশীলন এবং প্রকৃতির সঙ্গে দৈনন্দিন যোগাযোগের মাধ্যম।

বারান্দা কৃষি কী

বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দায় টব, গ্রো ব্যাগ, বাক্স, ঝুলন্ত পাত্র, বোতল কিংবা অন্যান্য নিরাপদ পাত্রে শাকসবজি, মসলা, ফল, ফুল ভেষজ উদ্ভিদ চাষ করাকে সাধারণভাবে বারান্দা কৃষি বলা যায়। এটি মূলত নগর কৃষি বা Urban Agriculture-এর ক্ষুদ্রতম পারিবারিক রূপ FAO-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী নগর উপনগর কৃষির আওতায় শহরের ভেতরে আশপাশে খাদ্য অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদনের বিভিন্ন পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত হয়। বারান্দা কৃষির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলোএখানে কৃষিকাজের জন্য আলাদা জমির প্রয়োজন নেই। একটি ছোট বারান্দাও পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করলে সেখানে কয়েক ধরনের সবজি, মসলা, ফুল ভেষজ গাছ রাখা যায়।

শহুরে নারীদের জন্য বারান্দা কৃষি কেন গুরুত্বপূর্ণ

শহরের একজন নারী একই সঙ্গে পরিবার, কর্মক্ষেত্র, সন্তান, রান্নাবান্না সামাজিক জীবনের নানা দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এই ব্যস্ততার মধ্যে নিজের জন্য নিরিবিলি সময় বের করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। বারান্দা কৃষি সেই জায়গায় একটি সহজ স্বাভাবিক বিনোদনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। সকালে কয়েক মিনিট গাছে পানি দেওয়া, নতুন পাতা দেখা, ফুল ফোটা পর্যবেক্ষণ করা, শুকনো পাতা পরিষ্কার করা কিংবা পাকা মরিচ তুলে রান্নায় ব্যবহার করাএসব ছোট কাজও দৈনন্দিন জীবনে আনন্দ তৈরি করতে পারে। FAO-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাড়ির বাগানের সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি, পারিবারিক কল্যাণ এবং নারীর সময় শ্রমের ব্যবস্থাপনার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।

বারান্দা কৃষি কেন একটি চমৎকার বিনোদন

বিনোদন বলতে আমরা সাধারণত টেলিভিশন দেখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, গান শোনা বা বাইরে ঘুরতে যাওয়াকে বুঝি। কিন্তু গাছের পরিচর্যাও হতে পারে একটি স্বাস্থ্যকর সৃজনশীল বিনোদন। একটি বীজ থেকে চারা তৈরি হওয়া, চারায় নতুন পাতা আসা, ফুল ফোটা এবং শেষে নিজের হাতে উৎপাদিত সবজি রান্নাঘরে ব্যবহার করাপুরো প্রক্রিয়াটিই আনন্দদায়ক। বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত নারী, গৃহিণী, কর্মজীবী নারী কিংবা দীর্ঘ সময় ঘরে অবস্থানকারী নারীদের জন্য এটি দৈনন্দিন রুটিনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। ঢাকার ছাদবাগান নিয়ে একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় নিরাপদ পুষ্টিকর খাবার, বায়ুর মান এবং পারিবারিক মানসিক সুস্থতাকে ছাদবাগানের উল্লেখযোগ্য সুবিধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বারান্দায় কী কী চাষ করা যায়

বারান্দার আকার, আলো, বাতাস এবং ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ নির্বাচন করা যায়। শাকসবজি সহজে শুরু করার জন্য লালশাক, পুঁইশাক, পালংশাক, কলমিশাক, ধনেপাতা, পুদিনা, মরিচ, বেগুন, ঢেঁড়স টমেটো ভালো বিকল্প। অল্প জায়গায় দ্রুত ফলন পেতে শাকজাতীয় ফসল বিশেষ উপযোগী। একই পাত্রে পর্যায়ক্রমে শাক উৎপাদন করা যায়।

মসলা জাতীয় উদ্ভিদ

ধনেপাতা, পুদিনা, কাঁচামরিচ, আদা হলুদ সীমিত পরিসরে চাষ করা যায়। রান্নাঘরের পাশে এগুলো থাকলে প্রয়োজনের সময় তাজা পাতা বা মসলা সংগ্রহ করা সহজ হয়।

ফলজাতীয় গাছ

বারান্দা তুলনামূলক বড় হলে টবে লেবু, পেয়ারা, ডালিম, স্ট্রবেরি বা উপযোগী জাতের ছোট আকারের ফলগাছ রাখা যেতে পারে। তবে বড় গাছের ক্ষেত্রে টবের আকার, ওজন এবং ভবনের নিরাপত্তা অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে।

ফুল

গাঁদা, জিনিয়া, পিটুনিয়া, নয়নতারা, জবা, বেলি বিভিন্ন মৌসুমি ফুল বারান্দাকে নান্দনিক করে তুলতে পারে।অনেক নারীর কাছে ফুলের বাগান খাদ্য উৎপাদনের চেয়েও বেশি আনন্দদায়ক হতে পারে। তাই বারান্দা কৃষিতে শুধু সবজি নয়, ফুল শোভাবর্ধক উদ্ভিদেরও স্থান থাকা উচিত।

বারান্দা বাগান তৈরির আগে কী বিবেচনা করবেন

প্রথমেই বারান্দায় কত ঘণ্টা সূর্যালোক আসে তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। অধিকাংশ সবজি ফলধারী উদ্ভিদের জন্য পর্যাপ্ত আলো গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, বারান্দায় অতিরিক্ত ভার দেওয়া যাবে না। মাটি, পানি, টব গাছ মিলিয়ে ওজন অনেক বেড়ে যেতে পারে। তাই ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা এবং ভবন কর্তৃপক্ষের নিয়ম বিবেচনা করা জরুরি। তৃতীয়ত, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। টবের নিচে পানি জমে থাকলে শিকড় পচে যেতে পারে এবং বারান্দার মেঝেতেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। চতুর্থত, এমনভাবে টব সাজাতে হবে যাতে চলাচলের জায়গা বন্ধ না হয় এবং নিচে বা পাশের ফ্ল্যাটে পানি পড়ে প্রতিবেশীর অসুবিধা না হয়।

বারান্দা কৃষিতে পাত্র নির্বাচন

বারান্দা কৃষির জন্য নতুন দামি টব কেনা বাধ্যতামূলক নয়। পুরোনো বালতি, নিরাপদ প্লাস্টিকের পাত্র, কাঠের বাক্স, মাটির টব, গ্রো ব্যাগ কিংবা পুনর্ব্যবহারযোগ্য পাত্র ব্যবহার করা যায়। তবে ব্যবহৃত পাত্র অবশ্যই পরিষ্কার হতে হবে এবং তাতে পর্যাপ্ত নিষ্কাশন ছিদ্র থাকতে হবে। গাছের আকার অনুযায়ী পাত্র নির্বাচন করা উচিত। শাকের জন্য অপেক্ষাকৃত অগভীর পাত্র যথেষ্ট হলেও টমেটো, বেগুন, মরিচ বা লেবুর মতো গাছের জন্য তুলনামূলক গভীর প্রশস্ত পাত্র প্রয়োজন।

ভালো মাটির মিশ্রণ তৈরি

বারান্দা কৃষির সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি হলো ভালো growing medium বা চাষের মাধ্যম।শুধু ভারী বাগানের মাটি ব্যবহার না করে ঝুরঝুরে, পানি নিষ্কাশনক্ষম জৈব পদার্থসমৃদ্ধ মিশ্রণ ব্যবহার করা ভালো। মাটির সঙ্গে পচা জৈবসার বা কম্পোস্ট এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য উপাদান মিশিয়ে হালকা মাধ্যম তৈরি করা যায়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি মাধ্যম তৈরি করা, যেখানেশিকড় সহজে বৃদ্ধি পাবে, পানি জমে থাকবে না, আবার দ্রুত শুকিয়েও যাবে না।

রান্নাঘরের বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট

বারান্দা কৃষির সঙ্গে গৃহস্থালি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে যুক্ত করা যায়। সবজির খোসা, ফলের অবশিষ্টাংশ এবং অন্যান্য উপযুক্ত জৈব বর্জ্য কম্পোস্টে পরিণত করে গাছের জন্য জৈব উপাদান তৈরি করা সম্ভব। তবে দুর্গন্ধ, মাছি পোকামাকড় এড়াতে সঠিক কম্পোস্টিং পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। কাঁচা রান্নাঘরের বর্জ্য সরাসরি টবে পুঁতে দেওয়া উচিত নয়। FAO-এর তথ্য অনুযায়ী, বাড়ির বাগান জৈব বর্জ্য পুনর্ব্যবহার কম্পোস্ট তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

পানি ব্যবস্থাপনা

বারান্দা বাগানে অতিরিক্ত পানি যেমন ক্ষতিকর, তেমনি পানির অভাবও ক্ষতিকর। সকালে বা বিকেলে গাছের প্রয়োজন অনুযায়ী পানি দেওয়া ভালো। তবে প্রতিদিন একই পরিমাণ পানি দেওয়ার নিয়ম নেই। মাটির আর্দ্রতা, গাছের বয়স, পাত্রের আকার, আবহাওয়া এবং ঋতু বিবেচনা করতে হবে। গাছের গোড়ায় পানি দেওয়াই উত্তম। পাতায় অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত পানি দিলে কিছু রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

জৈব সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা

বারান্দার গাছেও জাবপোকা, সাদা মাছি, থ্রিপস, মিলিবাগ, লিফ মাইনার এবং বিভিন্ন ছত্রাকজনিত রোগ দেখা দিতে পারে। প্রথমে নিয়মিত গাছ পর্যবেক্ষণ করতে হবে। আক্রান্ত পাতা দ্রুত অপসারণ, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস নিশ্চিত করা এবং অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার ব্যবহার না করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে হলুদ আঠালো ফাঁদসহ নিরাপদ যান্ত্রিক জৈবিক পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। কোনো রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহারের আগে সেটি গৃহস্থালি পরিবেশে ব্যবহারের উপযোগী কি না, লেবেলের নির্দেশনা এবং নিরাপত্তা বিধি অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে।

বারান্দা কৃষি নারীর মানসিক প্রশান্তি

বারান্দার গাছের সঙ্গে প্রতিদিন কিছু সময় কাটানো একজন নারীর জন্য ব্যক্তিগত অবকাশের মতো কাজ করতে পারে। গাছের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ, নতুন ফুলের অপেক্ষা কিংবা নিজের হাতে উৎপাদিত মরিচ দিয়ে রান্না করাএসব কাজ দৈনন্দিন জীবনে সাফল্যের ছোট ছোট অনুভূতি তৈরি করে। এখানে অবশ্য একটি বিষয় মনে রাখা জরুরিবাগান করা মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসার বিকল্প নয়। তবে এটি একটি আনন্দদায়ক, সক্রিয় প্রকৃতিনির্ভর অবসর কার্যক্রম হিসেবে জীবনযাত্রায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

পরিবারকে যুক্ত করলে আনন্দ আরও বাড়ে

বারান্দা কৃষি শুধু নারীর একার কাজ হওয়া উচিত নয়। সন্তান, স্বামী এবং পরিবারের অন্য সদস্যদেরও যুক্ত করা যায়। শিশুকে একটি টবের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। কেউ পানি দেবে, কেউ শুকনো পাতা পরিষ্কার করবে, কেউ গাছের ছবি তুলবে। এতে শিশু প্রকৃতি, খাদ্য কৃষি সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করে। পরিবারের সবাই মিলে একটি ছোট বাগান পরিচালনা করলে এটি ঘরোয়া বিনোদনেরও অংশ হয়ে উঠতে পারে।

বারান্দা কৃষি থেকে নিরাপদ খাদ্যের সম্ভাবনা

নিজের বারান্দায় উৎপাদিত সবজি বাজারের সবজির বিকল্প নয়, কিন্তু পরিবারের খাদ্যতালিকায় তাজা সবজি মসলা যোগ করার একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। ঢাকায় পরিচালিত সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শহুরে পরিবারগুলোতে উৎপাদিত ফল সবজির প্রজাতিগত বৈচিত্র্য এবং নারীদের খাদ্যবৈচিত্র্য বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গেছে। FAO- নগর কৃষিকে তাজা পুষ্টিকর খাদ্যে সরাসরি প্রবেশাধিকার এবং নগর খাদ্যব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতার সঙ্গে যুক্ত করেছে।

বারান্দা কৃষি কি আয় করার সুযোগ তৈরি করতে পারে

প্রথম উদ্দেশ্য বিনোদন পারিবারিক ব্যবহার হলেও দক্ষতা বাড়লে বারান্দা কৃষি থেকে ক্ষুদ্র আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। উদাহরণ হিসেবেনিজের উৎপাদিত অতিরিক্ত মরিচ, ধনেপাতা বা শাক প্রতিবেশীর কাছে দেওয়া বা বিক্রি করা যেতে পারে। চারা উৎপাদন করে বিক্রি করা যায়। ফুলের চারা, ভেষজ উদ্ভিদ, জৈব সার কিংবা ছোট আকারের পটেড প্ল্যান্টও বিক্রির উপযোগী হতে পারে। FAO-এর তথ্য অনুযায়ী, নগর গৃহভিত্তিক বাগান খাদ্য সরবরাহের পাশাপাশি অতিরিক্ত আয় স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখতে পারে। তবে বারান্দা কৃষিকে শুরুতেই ব্যবসা হিসেবে না দেখে শখদক্ষতাউদ্বৃত্ত উৎপাদনক্ষুদ্র উদ্যোগএই ধাপে এগোনো বেশি বাস্তবসম্মত।

শহুরে নারীদের জন্য একটি আদর্শ বারান্দা কৃষি রুটিন

প্রতিদিন মাত্র ১০১৫ মিনিট দিয়েও শুরু করা যায়। সকালে গাছ পর্যবেক্ষণ করা, মাটির আর্দ্রতা দেখা, প্রয়োজন হলে পানি দেওয়া এবং রোগ-পোকা আছে কি না পরীক্ষা করা যেতে পারে। সপ্তাহে একদিন শুকনো পাতা পরিষ্কার, আগাছা অপসারণ, গাছের ডাল ছাঁটাই এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জৈবসার প্রয়োগ করা যায়। মাসে একবার গাছের বৃদ্ধি, উৎপাদন সমস্যার ছবি তুলে রাখা যেতে পারে। এতে নিজের বাগানের উন্নতি বোঝা সহজ হয়।

নতুনদের সাধারণ ভুল

বারান্দা কৃষিতে নতুনরা সাধারণত কয়েকটি ভুল করেন। যেমনঅতিরিক্ত গাছ লাগানো, ছোট টবে বড় গাছ রাখা, অতিরিক্ত পানি দেওয়া, অপর্যাপ্ত আলোতে সবজি উৎপাদনের চেষ্টা করা, একসঙ্গে বেশি সার প্রয়োগ করা এবং রোগাক্রান্ত গাছকে অন্য গাছের কাছাকাছি রাখা। আরেকটি বড় ভুল হলো শুরুতেই অনেক টাকা খরচ করা। বরং প্রথমে ১০টি গাছ দিয়ে শুরু করা উচিত। অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাগান সম্প্রসারণ করা ভালো।

বারান্দা কৃষিকে নারীদের সামাজিক বিনোদনে পরিণত করা

একই ভবন বা এলাকার কয়েকজন নারী মিলেবারান্দা বাগান ক্লাবতৈরি করতে পারেন। প্রত্যেকে নিজের বাগানের ছবি শেয়ার করতে পারেন, বীজ চারা বিনিময় করতে পারেন এবং উৎপাদিত অতিরিক্ত সবজি ভাগাভাগি করতে পারেন। মাসে একদিন ছোট আয়োজন করেসেরা বারান্দা বাগান”, “সেরা সবজি চাষিবাসেরা ফুলের টবনির্বাচন করা যেতে পারে। এতে বাগান শুধু ব্যক্তিগত শখ না থেকে সামাজিক যোগাযোগ পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

পরিবেশের জন্য বারান্দা কৃষির গুরুত্ব

শহরে সবুজের পরিমাণ বৃদ্ধি করা নগর পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যদিও একটি ছোট বারান্দার বাগনাকে বড় পরিবেশগত সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়, তবুও অসংখ্য বাসার ছোট ছোট সবুজ উদ্যোগ সম্মিলিতভাবে শহরের জীববৈচিত্র্য নান্দনিকতা বাড়াতে পারে। ফুলের গাছ মৌমাছি অন্যান্য উপকারী পরাগায়নকারী পতঙ্গকে আকর্ষণ করতে পারে। উদ্ভিদ শহুরে বসবাসের পরিবেশকে আরও সবুজ প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে।

বাংলাদেশে বারান্দা কৃষির ভবিষ্যৎ

ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে কৃষিজমির সুযোগ সীমিত। তাই ছাদ, বারান্দা, জানালার গ্রিল, দেয়াল এবং অন্যান্য নিরাপদ ক্ষুদ্র স্থানকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো নগর কৃষির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। ঢাকার নগর বাগান নিয়ে গবেষণায় খাদ্য পুষ্টি নিরাপত্তার পাশাপাশি সামাজিক ব্যক্তিগত উপকারের সম্ভাবনা উঠে এসেছে। অন্যদিকে নগর ছাদবাগান নিয়ে বাংলাদেশের গবেষণাগুলোতে খাদ্য, পরিবেশ পারিবারিক কল্যাণের বিভিন্ন সম্ভাবনা চিহ্নিত হয়েছে। অতএব, নগর কৃষিকে শুধু শখ হিসেবে না দেখে খাদ্য, পরিবেশ, বিনোদন সামাজিক সুস্থতার সমন্বিত উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

শেষ কথা

বারান্দা কৃষির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলোএখানে কৃষি করার জন্য কৃষিজমির মালিক হওয়া লাগে না। প্রয়োজন শুধু একটু জায়গা, কিছু পাত্র, উপযুক্ত মাটি, কয়েকটি ভালো চারা এবং নিয়মিত যত্ন। একজন শহুরে নারী সকালে বারান্দায় গিয়ে যখন নিজের লাগানো গাছে নতুন ফুল দেখতে পান, অথবা নিজের হাতে উৎপাদিত মরিচ রান্নায় ব্যবহার করেন, তখন সেটি শুধু কৃষি উৎপাদন নয়এটি প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার একটি আনন্দময় অভিজ্ঞতা। তাই শহরের প্রতিটি সম্ভাব্য বারান্দাকে বড় বাগানে পরিণত করার প্রয়োজন নেই। একটি টব দিয়েই শুরু করা যায়। আজ একটি মরিচের চারা, আগামীকাল একটি টমেটোর গাছ, তারপর কয়েকটি ফুলএভাবেই ছোট্ট বারান্দা হয়ে উঠতে পারে শহুরে নারীর নিজের সবুজ পৃথিবী। বারান্দা কৃষি তাই কেবলসবজি চাষনয়; এটি বিনোদন, সৃজনশীলতা, পারিবারিক পুষ্টি, প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ এবং নগরজীবনে সবুজ ফিরিয়ে আনার একটি সহজ পথ।

তথ্যসূত্র

. Food and Agriculture Organization (FAO) — Urban and Peri-urban Agriculture; নগর কৃষির খাদ্য, পুষ্টি, পরিবেশ জীবিকার সম্ভাবনা।

. FAO — Home Gardens and Family Nutrition; বাড়ির বাগানের খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি, পরিবেশ পারিবারিক কল্যাণে ভূমিকা।

. Schreinemachers, P., Kumar, S. S. & Uddin, N. M. (2025)Impact of home gardens promoted among urban residents in Dhaka, Bangladesh, Food Security.

. Nahar, N., Ahmed, A. & Hossain, M. S.Rooftop Gardening as a Supplement to Urban Household Food and Nutrition Resilience of Dhaka City in Bangladesh, Dhaka University Journal of Earth and Environmental Sciences.

. Hoque, M. Z. et al.Perceived benefits and challenges of urban rooftop gardening in Dhaka city, Annals of Bangladesh Agriculture.

. FAOFood, Nutrition and Agriculture: Home Gardening and Urban Gardening; নগর বাগান, খাদ্যবৈচিত্র্য নারীর অংশগ্রহণ বিষয়ে তথ্য।