বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধান। দেশের কৃষি অর্থনীতির সঙ্গেও ধানের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। আমন, বোরো কিংবা আউশ—প্রতিটি মৌসুমেই ধান চাষের সময় কৃষকদের নানা ধরনের পোকামাকড়ের আক্রমণের মুখে পড়তে হয়। এসব পোকার আক্রমণ সময়মতো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ধানের ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
ধানের পোকা দমনে অনেক কৃষক সাধারণত রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর বেশি নির্ভর করেন। কিন্তু অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার যেমন উৎপাদন খরচ বাড়ায়, তেমনি পরিবেশ ও কৃষিজমির জীববৈচিত্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এ কারণে শুধু কীটনাশকের ওপর নির্ভর না করে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা Integrated Pest Management (IPM) অনুসরণ করা বেশি কার্যকর। সঠিকভাবে IPM প্রয়োগ করতে পারলে কম খরচে ধানখেতকে ক্ষতিকর পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
ধানের প্রধান ক্ষতিকর পোকা ও ক্ষতির লক্ষণ
ধানের জমিতে বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় আক্রমণ করে। এর মধ্যে বাদামী গাছফড়িং, মাজরা পোকা, গান্ধি পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা এবং ধানের পামরি পোকা অন্যতম।
বাদামী গাছফড়িং বা Brown Planthopper (BPH) সাধারণত ধানের গোড়ায় বসে গাছের রস চুষে খায়। আক্রমণ বেশি হলে ধানের গাছ গোল হয়ে পুড়ে যাওয়ার মতো শুকিয়ে যায়। এই অবস্থাকে বলা হয় ‘হপার বার্ন’।
মাজরা পোকা বা Stem Borer ধানের কাণ্ডে ছিদ্র করে ভেতরের অংশ খেয়ে ফেলে। গাছের কচি অবস্থায় আক্রমণ হলে মূল ডগা শুকিয়ে যায়, যাকে ‘মরা ডগা’ বা Dead Heart বলা হয়। আবার শীষ বের হওয়ার পর আক্রমণ করলে শীষ সাদা হয়ে যায়। একে White Head বা ‘সাদা শীষ’ বলা হয়।
গান্ধি পোকা সাধারণত ধানের দুধ আসার সময় কচি ধানের রস চুষে খায়। এতে ধান চিটা হয়ে যেতে পারে এবং খেতে এক ধরনের দুর্গন্ধও তৈরি হয়।
পাতা মোড়ানো পোকা ধানের পাতা লম্বালম্বিভাবে মুড়িয়ে ভেতরের সবুজ অংশ খেয়ে ফেলে। ফলে আক্রান্ত পাতাগুলো ধীরে ধীরে সাদাটে হয়ে যায়।
ধানের পামরি পোকা বা Rice Hispa-এর পোকা ও কীড়া পাতার ভেতরে গর্ত করে সবুজ অংশ খেয়ে নেয়। এতে দূর থেকে আক্রান্ত ধানের পাতা সাদা বা তামাটে দেখাতে পারে।
ধানের পোকা দমনে IPM কেন গুরুত্বপূর্ণ
সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রয়োজন ছাড়া কীটনাশক ব্যবহার না করে বিভিন্ন কার্যকর পদ্ধতির সমন্বয়ে পোকা নিয়ন্ত্রণ করা।
এর মধ্যে রয়েছে সঠিক জাত নির্বাচন, সুষম সার ব্যবহার, পানি ব্যবস্থাপনা, পাখির সাহায্যে পোকা দমন, হাতজাল ও আলোক ফাঁদ ব্যবহার, উপকারী পোকা সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট মাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগ।
চাষাবাদ পদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তন
ধানের পোকা দমনের শুরুটা হওয়া উচিত জমি প্রস্তুত এবং জাত নির্বাচনের সময় থেকেই। বাদামী গাছফড়িংসহ বিভিন্ন পোকার আক্রমণ সহনশীল জাত নির্বাচন করা যেতে পারে। যেমন বিআর২৬, ব্রি ধান৩১ এবং ব্রি ধান৫২-এর মতো জাত অনেক ক্ষেত্রে উপযোগী হতে পারে।
সার ব্যবস্থাপনাতেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। অতিরিক্ত ইউরিয়া ব্যবহার করলে ধানের গাছ বেশি রসালো হয়ে ওঠে, ফলে কিছু ক্ষতিকর পোকার আক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই ইউরিয়া অতিরিক্ত না দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী কিস্তিতে প্রয়োগ করা এবং পটাশসহ অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
ধানখেতে পাখির বসার ব্যবস্থা করাও একটি সহজ ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি। প্রতি বিঘায় কয়েকটি বাঁশের কঞ্চি বা গাছের ডাল পুঁতে দিলে শালিক, ফিঙে ও অন্যান্য পোকা খাওয়া পাখি সেখানে বসতে পারে। এসব পাখি ধানের ক্ষতিকর পোকা খেয়ে প্রাকৃতিকভাবে পোকার সংখ্যা কমাতে সাহায্য করে।
বাদামী গাছফড়িংয়ের আক্রমণ কমাতেও পানি ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। জমি সবসময় পানিতে ডুবিয়ে না রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী পানি বের করে কিছু সময় শুকিয়ে নেওয়া যেতে পারে। এই পদ্ধতিকে Alternate Wetting and Drying বা AWD বলা হয়।
হাতজাল ও আলোক ফাঁদের ব্যবহার
ধানের কচি অবস্থায় হাতজাল ব্যবহার করে পামরি বা পাতা মোড়ানো পোকার মতো কিছু পোকা সংগ্রহ করে ধ্বংস করা যায়। এতে কোনো রাসায়নিকের প্রয়োজন হয় না।
আলোক ফাঁদও ধানের পোকার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে কার্যকর একটি পদ্ধতি। বিশেষ করে রাতে খেতের পাশে আলোক ফাঁদ বসালে মাজরা পোকা, বাদামী গাছফড়িং এবং পাতা মোড়ানো পোকার পূর্ণবয়স্ক পোকা বা মথ আকৃষ্ট করা যায়।
মাজরা পোকার ডিমের গাদাও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা উচিত। পাতায় থাকা ডিমের গাদা হাতে সংগ্রহ করে নষ্ট করে দিলে পরবর্তী সময়ে পোকার আক্রমণ কমানো সম্ভব।
উপকারী পোকাকে রক্ষা করা জরুরি
ধানখেতে সব পোকাই ক্ষতিকর নয়। অনেক উপকারী পোকা প্রাকৃতিকভাবে ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মাকড়সা, লেডি বার্ড বিটল, ক্যারাবিড বিটল এবং ড্যামসেল ফ্লাইয়ের মতো উপকারী প্রাণী ও পোকা ধানের ক্ষতিকর পোকা খেয়ে থাকে। তাই প্রয়োজন ছাড়া কীটনাশক ব্যবহার না করলে এসব ‘বন্ধু পোকা’ জমিতে টিকে থাকে এবং প্রাকৃতিকভাবেই ক্ষতিকর পোকার সংখ্যা কমিয়ে দেয়।
জমি তৈরির সময় বা ফসল কাটার পর খেতে হাঁস-মুরগি ছেড়ে দেওয়াও একটি সহজ পদ্ধতি। তারা মাটির ভেতরে থাকা কিছু পোকা ও পুত্তলি খেয়ে ফেলতে পারে।
কখন কীটনাশক ব্যবহার করবেন
IPM-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পোকা দেখা গেলেই কীটনাশক ব্যবহার না করা। পোকার সংখ্যা যখন অর্থনৈতিক ক্ষতিসীমা বা Economic Threshold Level (ETL) অতিক্রম করে এবং ফসলের উল্লেখযোগ্য ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়, তখনই প্রয়োজন অনুযায়ী কীটনাশক ব্যবহার করা উচিত।
বাদামী গাছফড়িংয়ের ক্ষেত্রে পাইমেট্রোজিন বা নির্দিষ্ট অনুমোদিত উপাদানসমৃদ্ধ কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। মাজরা ও পাতা মোড়ানো পোকার ক্ষেত্রে ক্লোরানট্রানিলিপ্রোল বা কার্টাপ জাতীয় অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। গান্ধি পোকার ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী পাইরেথ্রয়েড জাতীয় অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে কীটনাশকের ক্ষেত্রে পণ্যের লেবেলে দেওয়া অনুমোদিত মাত্রা, প্রয়োগের সময় এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে। একই কীটনাশক বারবার ব্যবহার না করে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত বালাইনাশক নির্বাচন করাও গুরুত্বপূর্ণ।
ধান চাষে IPM অনুসরণের সহজ ধারাবাহিকতা
ধান চাষের শুরুতেই সুস্থ বীজ ও উপযোগী জাত নির্বাচন করতে হবে। চারা রোপণের সময় সারি থেকে সারির দূরত্ব প্রায় ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার এবং গোছা থেকে গোছার দূরত্ব ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার রাখা যেতে পারে। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের সুযোগ থাকলে পোকার আক্রমণ ও রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।
চারা রোপণের প্রায় ২০ থেকে ২৫ দিন পর জমিতে পার্চিং বা পাখি বসার ডাল স্থাপন করা যেতে পারে। একই সময়ে আলোক ফাঁদ ব্যবহার করে নিয়মিত পোকার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা ভালো।
ফসলের মাঝামাঝি সময়ে ইউরিয়া কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে এবং জমিতে প্রয়োজন অনুযায়ী পানি দেওয়া ও বের করার ব্যবস্থা করতে হবে। বাদামী গাছফড়িংয়ের আক্রমণ দেখা দিলে জমির পানি বের করে কয়েক দিন শুকনো রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
এরপরও যদি পোকার আক্রমণ বাড়তে থাকে এবং তা অর্থনৈতিক ক্ষতিসীমা অতিক্রম করে, তখনই প্রয়োজন অনুযায়ী কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে। স্প্রে করার সময় কীটনাশক যেন ধানের গোড়াসহ আক্রান্ত স্থানে যথাযথভাবে পৌঁছায়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
IPM ব্যবহারের সুবিধা
ধানের জমিতে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমতে পারে। অপ্রয়োজনীয় কীটনাশক ব্যবহার কম হওয়ায় একদিকে যেমন অর্থ সাশ্রয় হয়, অন্যদিকে জমির পরিবেশও তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকে।
অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে খেতের মাছ, ব্যাঙ, মাকড়সা ও অন্যান্য উপকারী প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। IPM অনুসরণ করলে এসব উপকারী প্রাণী সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।
এ ছাড়া বারবার একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করলে পোকার মধ্যে কীটনাশক প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিভিন্ন পদ্ধতির সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে এই ঝুঁকিও কমানো যায়।
শেষ কথা
ধানের পোকা দমনে সবসময় কীটনাশকের ওপর নির্ভর করা প্রয়োজন নেই। বরং সঠিক জাত নির্বাচন, সুষম সার ব্যবহার, পানি ব্যবস্থাপনা, পার্চিং, আলোক ফাঁদ, হাতজাল এবং উপকারী পোকা সংরক্ষণের মতো সহজ পদ্ধতিগুলো নিয়মিত অনুসরণ করলেই অনেক ক্ষেত্রে পোকার আক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
আর যখন এসব পদ্ধতির পরও পোকার আক্রমণ অর্থনৈতিক ক্ষতিসীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন সঠিক কীটনাশক সঠিক মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে।
অর্থাৎ ধানের পোকা দমনের সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো শুধু পোকা মারার চেষ্টা না করে পুরো কৃষিব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা। এতে কৃষকের খরচ কমবে, পরিবেশ সুরক্ষিত থাকবে এবং ধানের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা সহজ হবে।