আজকাল নগরজীবনে ছাদ বাগান শুধু শখ নয়, বরং তাজা বিষমুক্ত ফল পাওয়ার এক চমৎকার উপায়। আর ছাদ বাগানের জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে ড্রাগন ফল। দেখতে আকর্ষণীয়, খেতে সুস্বাদু এবং পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ক্যাকটাসজাতীয় ফলটি তুলনামূলক কম পরিচর্যাতেই ছাদে ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে। আপনি যদি নিজের ছাদে ড্রাগন ফল চাষ করতে চান কিংবা গাছের ফলন আরও বাড়াতে চান, তাহলে শুরু থেকেই সঠিক জাত, মাটি, টব, সার, পানি, ছাঁটাই এবং পরাগায়নের বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে ড্রাগন ফলের ক্ষেত্রে সঠিক ছাঁটাই হাত পরাগায়ন ফলন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

জাত নির্বাচন কাটিং প্রস্তুত

ড্রাগন ফল সাধারণত তিন ধরনের হয়ে থাকেলাল খোসা লাল শাঁস, লাল খোসা সাদা শাঁস এবং হলুদ খোসা সাদা শাঁস। ছাদে চাষের ক্ষেত্রে লাল খোসা লাল শাঁসের ড্রাগন ফলকে উপযোগী ধরা হয়, কারণ এটি মিষ্টি এবং ভালো ফলন দিতে পারে। চারা তৈরির জন্য সবসময় সুস্থ, বয়স্ক রোগমুক্ত মাদার গাছ থেকে থেকে . ফুট লম্বা পরিপক্ব কাটিং সংগ্রহ করা ভালো। কাটিং সংগ্রহের পর সরাসরি মাটিতে না লাগিয়ে থেকে দিন ছায়াযুক্ত স্থানে রেখে কাটা অংশ শুকিয়ে নিতে হবে। এতে কাটা অংশে ছত্রাকের সংক্রমণের ঝুঁকি কমে।

সঠিক মাটি টব নির্বাচন

ড্রাগন ফল ক্যাকটাসজাতীয় উদ্ভিদ হওয়ায় মাটিতে পানি জমে থাকা একেবারেই সহ্য করতে পারে না। তাই ছাদে ড্রাগন ফল চাষের জন্য বেলে-দোআঁশ পানি নিষ্কাশন উপযোগী মাটি ব্যবহার করা জরুরি। ড্রাগন গাছের শিকড় খুব বেশি গভীরে না গেলেও গাছটি পরবর্তীতে বেশ ঝোপালো হয়ে ওঠে। তাই ২০ থেকে ২৫ লিটারের ড্রাম, প্রায় ২০ ইঞ্চির টব অথবা হাফ ড্রাম ব্যবহার করা যেতে পারে। ড্রাম বা টবের নিচে অবশ্যই থেকে ৪টি নিষ্কাশন ছিদ্র রাখতে হবে, যাতে অতিরিক্ত পানি সহজে বের হয়ে যেতে পারে। মাটি তৈরির সময় প্রায় ৫০ শতাংশ দোআঁশ বা বেলে-দোআঁশ মাটি, ৩০ শতাংশ জৈব সার বা পচা গোবর কিংবা কম্পোস্ট, ১০ শতাংশ বালু বা কোকোপিট এবং বাকি ১০ শতাংশ হাড়ের গুঁড়ো, শিং কুচি ছাই ব্যবহার করা যেতে পারে। মাটি প্রস্তুত করার পর অন্তত ১০ থেকে ১২ দিন পানি দিয়ে ভিজিয়ে রেখে রোদ খাইয়ে নেওয়া ভালো। এতে বিভিন্ন উপাদান মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশে যায়।

রোপণ খুঁটি স্থাপন

ড্রাগন ফল একটি লতানো ক্যাকটাসজাতীয় উদ্ভিদ। তাই গাছকে সোজা শক্তভাবে বেড়ে ওঠার জন্য শুরু থেকেই একটি মজবুত সহায়তা বা ট্রেলিস ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। টবের ঠিক মাঝখানে থেকে ফুট লম্বা একটি শক্ত পিলার বা জিআই পাইপ বসাতে পারেন। পিলারের মাথায় একটি পুরোনো মোটরসাইকেলের টায়ার বা উপযুক্ত প্লাস্টিকের রিং বসিয়ে দিলে গাছের ডালপালা পরবর্তীতে চারদিকে ছড়িয়ে ঝুলে পড়ার সুযোগ পাবে। প্রতিটি টবে খুঁটির চারপাশে চারটি কাটিং মাটির প্রায় থেকে ইঞ্চি গভীরে রোপণ করা যায়। এরপর সুতলি দিয়ে কাটিংগুলোকে খুঁটির সঙ্গে আলতোভাবে বেঁধে দিতে হবে।

আলো-বাতাস সেচ ব্যবস্থাপনা

ড্রাগন ফল প্রচুর রোদ পছন্দ করে। তাই ছাদের এমন জায়গায় টব রাখতে হবে, যেখানে প্রতিদিন অন্তত থেকে ঘণ্টা সরাসরি সূর্যের আলো পাওয়া যায়। পর্যাপ্ত আলো না পেলে গাছে ফুল ফল আসার ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে। সেচ দেওয়ার সময় নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাটির আর্দ্রতা দেখে পানি দিতে হবে এবং মাটি পুরোপুরি শুকিয়ে গেলে সেচ দেওয়া উচিত। অতিরিক্ত পানি দিলে ড্রাগন গাছের শিকড় ডাল পচে যেতে পারে। বর্ষাকালে সাধারণত অতিরিক্ত সেচের প্রয়োজন হয় না। সময় টবের নিচে বা গোড়ায় পানি জমে আছে কি না, সেদিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে।

ফলন বাড়াতে ছাঁটাই সার ব্যবস্থাপনা

ড্রাগন গাছে প্রচুর ফুল ফল পেতে নিয়মিত ছাঁটাই বা প্রুনিং করা প্রয়োজন। গাছ রোপণের পর প্রধান কাণ্ডটিকে টায়ারের রিং পর্যন্ত সোজা উঠতে দিতে হবে এবং পাশের ছোট ছোট ডাল প্রয়োজন অনুযায়ী কেটে ফেলতে হবে। গাছ যখন টায়ারের রিংয়ের ওপরে উঠে যাবে, তখন প্রধান কাণ্ডের মাথা কেটে দিলে চারদিকে অনেক নতুন শাখা বের হবে। এতে গাছের ছাতার মতো আকৃতি তৈরি হবে এবং ফল ধরার উপযোগী ডালের সংখ্যা বাড়বে। যে ডালে একবার ফল হয়েছে, মৌসুম শেষে সেই ডাল ছেঁটে দিলে নতুন শক্ত ডাল বের হওয়ার সুযোগ পায়, যা পরবর্তী সময়ে ফলন বাড়াতে সহায়তা করে। সার ব্যবস্থাপনাতেও নিয়মিত যত্ন প্রয়োজন। গাছ বৃদ্ধির পর্যায়ে প্রতি মাসে অন্তত একবার এক মুঠো সরিষার খৈল পচা পানি এবং সামান্য ইউরিয়া সার দেওয়া যেতে পারে। ফুল আসার আগে, বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে, ফলন বাড়ানোর জন্য টবপ্রতি প্রায় ২০০ গ্রাম হাড়ের গুঁড়ো, ১০০ গ্রাম পটাশ বা এমওপি এবং ৫০ গ্রাম টিএসপি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

ড্রাগন ফুলের হাত পরাগায়ন

ড্রাগন ফলের ফলন বাড়ানোর ক্ষেত্রে হাত পরাগায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ড্রাগন ফুল উভলিঙ্গ বা হার্মাফ্রোডাইট ফুল। অর্থাৎ একই ফুলের মধ্যে পুরুষ অঙ্গ বা পুংকেশর এবং স্ত্রী অঙ্গ বা গর্ভমুণ্ড দুটোই থাকে। ফুলের মাঝখানের চারপাশে অসংখ্য সূক্ষ্ম সুতার মতো অংশ থাকে, যেগুলোর মাথায় হলুদ বা হালকা রঙের পরাগরেণু থাকে। এগুলো হলো পুংকেশর বা পুরুষ অংশ। আর ফুলের ঠিক কেন্দ্রস্থলে তারার মতো বা বহুধাবিভক্ত সামান্য উঁচু অংশটি হলো গর্ভমুণ্ড বা স্ত্রী অংশ।

বেশিরভাগ ড্রাগন ফুল স্ব-পরাগায়িত হতে পারে। তবে কৃত্রিম বা হাত পরাগায়নের মাধ্যমে ফল ধরার সম্ভাবনা বাড়ানো এবং ফলের আকার গুণমান উন্নত করার চেষ্টা করা যায়। হাত পরাগায়নের জন্য একটি নরম তুলি, মেকআপ ব্রাশ বা তুলোর কাঠি, পরাগরেণু রাখার জন্য একটি ছোট পাত্র এবং রাতে কাজের সুবিধার জন্য একটি টর্চলাইট রাখা যেতে পারে। ড্রাগন ফুল সাধারণত রাতে ফোটে। রাত ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে ফুল ফোটা শুরু করে এবং পরদিন সকালে রোদের তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, সাধারণত সকাল ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে, ফুলটি বুজে যায়। তাই হাত পরাগায়নের উপযুক্ত সময় হলো রাত ৮টা থেকে ১২টার মধ্যে অথবা ভোরবেলা সূর্য ওঠার ঠিক আগে।ফুল পুরোপুরি ফোটার পর, সাধারণত রাত ৯টার পর, টর্চলাইট নিয়ে ফুলটি পরীক্ষা করুন। ফুলের মাঝখানের হলদেটে পরাগরেণুগুলো শুকনো ঝরঝরে আছে কি না তা দেখে নিন। এরপর নরম একটি তুলি দিয়ে ফুলের চারপাশে থাকা পুংকেশরের ওপর আলতো করে ঘষুন। এতে তুলির মাথায় পরাগরেণু লেগে যাবে। চাইলে ফুলের নিচে একটি ছোট বাটি ধরে পুংকেশরগুলো আঙুল দিয়ে আলতোভাবে নাড়া বা ঝাঁকি দিয়ে পরাগরেণু সংগ্রহ করা যায়।

পরাগরেণু সংগ্রহের পর ফুলের কেন্দ্রস্থলে থাকা তারার মতো প্রসারিত গর্ভমুণ্ডটি খুঁজে বের করতে হবে। পরাগরেণুযুক্ত তুলিটি গর্ভমুণ্ডের ওপর আলতোভাবে বুলিয়ে দিতে হবে, যাতে পরাগরেণু সেখানে ভালোভাবে লেগে যায়। বাটিতে পরাগরেণু সংগ্রহ করা থাকলে আঙুলের ডগায় নিয়েও গর্ভমুণ্ডে লাগানো যায়। আপনার ছাদে যদি একাধিক জাতের ড্রাগন ফল থাকে, যেমন লাল শাঁস সাদা শাঁসের জাত, তাহলে এক জাতের ফুল থেকে পরাগরেণু সংগ্রহ করে অন্য জাতের ফুলের গর্ভমুণ্ডে প্রয়োগ করা যেতে পারে। এই ক্রস-পলিনেশন বা পর-পরাগায়ন ফলের আকার মান উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে।পরাগায়নের সময় বৃষ্টি হলে বা বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে পরাগায়নের পর ফুলটি প্লাস্টিক বা কাগজের ক্যাপ দিয়ে আলতোভাবে ঢেকে দেওয়া যায়, যাতে পরাগরেণু বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে না যায়।

রোগবালাই প্রতিকার

ড্রাগন ফল গাছে সাধারণত রোগবালাই তুলনামূলক কম হলেও ছত্রাকজনিত পচন বা রটিং একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হতে পারে। গাছে হলুদ বা বাদামি দাগ দেখা দিলে আক্রান্ত ডাল কেটে ফেলে দিতে হবে। প্রয়োজনে ম্যানকোজেব জাতীয় ছত্রাকনাশক লেবেলে উল্লেখিত অনুমোদিত মাত্রা অনুযায়ী ব্যবহার করা যেতে পারে। আপনার ব্যবহৃত পণ্যের লেবেল স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুসরণ করাই নিরাপদ।

প্রথম ফলন কখন আসবে?

সুস্থ পরিপক্ব ডালের কাটিং থেকে চারা তৈরি করে রোপণ করলে সাধারণত ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে প্রথম ফুল ফল আসতে শুরু করতে পারে। মে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে দফায় দফায় ফল সংগ্রহ করা সম্ভব। অন্যদিকে বীজ থেকে চারা তৈরি করলে প্রথম ফল পেতে প্রায় থেকে বছর সময় লাগতে পারে। তাই দ্রুত ফলন পাওয়ার জন্য পরিপক্ব সুস্থ কাটিং থেকে চাষ করাকে বেশি সুবিধাজনক ধরা হয়। সঠিক রোদ, পরিমিত পানি এবং সুষম সার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে ছাদের ছোট্ট ড্রাগন বাগানটিও ধীরে ধীরে ভালো ফলনের উৎস হয়ে উঠতে পারে।

ড্রাগন গাছের আয়ুষ্কাল

একটি ড্রাগন গাছ সাধারণত ২০ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে এবং নিয়মিত ফল দিতে পারে। চারা রোপণের প্রায় থেকে বছরের মধ্যে গাছ সর্বোচ্চ পরিমাণে ভালো মানের ফল দিতে পারে। এরপরও নিয়মিত ছাঁটাই, প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন ডাল তৈরি এবং সঠিক সার পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে গাছের ফলন ধরে রাখা সম্ভব। উল্লেখ্য, লেখাটিতে প্রথম ফলন আসার সময়ের তথ্য দুইবার এসেছে; একই তথ্য পুনরাবৃত্তি না করে এক জায়গায় রাখা হয়েছে। বীজ থেকে চাষ করলে ফলন পেতে বেশি সময় লাগেএই তথ্যটিও একইভাবে একবার স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

শেষ কথা

ছাদে ড্রাগন ফল চাষ করতে খুব বড় জায়গার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন সঠিক জাতের সুস্থ কাটিং, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত রোদ, মজবুত খুঁটি, নিয়মিত ছাঁটাই এবং সুষম সার ব্যবস্থাপনা। এর সঙ্গে ফুল ফোটার সময় হাত পরাগায়নে একটু বাড়তি যত্ন নিলে ফলন ফলের মান আরও ভালো করার সুযোগ থাকে। অল্প জায়গায় পরিকল্পিতভাবে ড্রাগন ফলের গাছ লাগিয়ে নিয়মিত পরিচর্যা করলে একটি সাধারণ ছাদও হয়ে উঠতে পারে সবুজ, সুন্দর এবং ফলনশীল একটি ছোট্ট বাগান।