বাংলাদেশে ধান উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি রোগবালাই প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবনে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এবং বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BINA) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের তিনটি প্রধান ধান মৌসুম—আউশ, আমন ও বোরো—প্রতিটির জন্যই বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধী ও সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। বিশেষ করে ব্লাস্ট (Blast), বাদামী গাছফড়িং (BPH), ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা পোড়া (BLB), টুংরো, শীথ ব্লাইট ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রোগ প্রতিরোধে এসব জাত কৃষকের জন্য অধিক লাভজনক ও নিরাপদ।
রোগ প্রতিরোধী জাত ব্যবহার করলে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশকের ব্যবহার কমে, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পায়, পরিবেশ দূষণ কম হয় এবং টেকসই ধান উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব।
কেন রোগ প্রতিরোধী ধানের জাত গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ধানের রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ব্লাস্ট রোগ অনেক সময় ৩০–৮০ শতাংশ পর্যন্ত ফলনহানি ঘটাতে পারে। একইভাবে বাদামী গাছফড়িং বা ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের কারণে কৃষককে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়। তাই গবেষণাগারে উদ্ভাবিত রোগ প্রতিরোধী জাত চাষ করলে—
- ফলন স্থিতিশীল থাকে
- রোগের প্রকোপ কমে
- উৎপাদন ব্যয় কম হয়
- পরিবেশবান্ধব কৃষি সম্ভব হয়
- জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা সহজ হয়
আউশ মৌসুমের রোগ প্রতিরোধী ধানের জাত
আউশ মৌসুমে সাধারণত ব্লাস্ট, বাদামী গাছফড়িং ও খরা-সম্পর্কিত সমস্যার ঝুঁকি বেশি থাকে।
ব্রি ধান ৪২
- উদ্ভাবনকারী প্রতিষ্ঠান: BRRI
- মৌসুম: আউশ
- বিশেষ বৈশিষ্ট্য: খরা সহনশীল, মধ্যম ফলনশীল
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: ব্লাস্ট রোগের প্রতি তুলনামূলক সহনশীল
- চাষের উপযোগিতা: উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খরা প্রবণ এলাকায় উপযোগী
ব্রি ধান ৪৩
- উদ্ভাবনকারী প্রতিষ্ঠান: BRRI
- মৌসুম: আউশ
- বিশেষ বৈশিষ্ট্য: খরা সহনশীল, স্বল্প ও মধ্যম মেয়াদি
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: ব্লাস্ট ও কিছু পাতাজনিত রোগের প্রতি সহনশীল
- উপযোগিতা: কম সেচ সুবিধাসম্পন্ন এলাকায় ভালো ফলন দেয়
ব্রি ধান ৪৮
- উদ্ভাবনকারী প্রতিষ্ঠান: BRRI
- মৌসুম: আউশ
- বিশেষ বৈশিষ্ট্য: উচ্চ ফলনশীল, মধ্যম মেয়াদি
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: ব্লাস্ট রোগের প্রতি তুলনামূলক সহনশীল
- উপযোগিতা: দেশের অধিকাংশ আউশ চাষ এলাকায় উপযোগী
আমন মৌসুমের রোগ প্রতিরোধী ধানের জাত
আমন মৌসুমে ব্লাস্ট, ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা পোড়া (BLB), শীথ ব্লাইট, টুংরো এবং বাদামী গাছফড়িংয়ের আক্রমণ বেশি দেখা যায়।
ব্রি ধান ৩৯
- উদ্ভাবনকারী প্রতিষ্ঠান: BRRI
- মৌসুম: ট্রান্সপ্লান্টেড আমন
- বিশেষ বৈশিষ্ট্য: স্বল্পমেয়াদি (প্রায় ১০৫–১১০ দিন)
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: ব্লাস্ট রোগের প্রতি সহনশীল
- উপযোগিতা: দেরিতে রোপণ করা আমন জমির জন্য উপযোগী
ব্রি ধান ৪৯
- উদ্ভাবনকারী প্রতিষ্ঠান: BRRI
- মৌসুম: আমন
- বিশেষ বৈশিষ্ট্য: উচ্চ ফলনশীল, মাঝারি মেয়াদি
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: ব্লাস্ট রোগের প্রতি তুলনামূলক সহনশীল
- উপযোগিতা: দেশের বিস্তীর্ণ আমন এলাকায় চাষযোগ্য
ব্রি ধান ৫৬
- উদ্ভাবনকারী প্রতিষ্ঠান: BRRI
- মৌসুম: আমন
- বিশেষ বৈশিষ্ট্য: স্বল্পমেয়াদি ও খরা সহনশীল
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: ব্লাস্ট রোগের প্রতি সহনশীল
- উপযোগিতা: উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খরা প্রবণ আমন এলাকায়
ব্রি ধান ৫৭
- উদ্ভাবনকারী প্রতিষ্ঠান: BRRI
- মৌসুম: আমন
- বিশেষ বৈশিষ্ট্য: স্বল্পমেয়াদি, খরা সহনশীল
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: ব্লাস্ট রোগের প্রতি সহনশীল
- উপযোগিতা: দেরিতে রোপণ ও সীমিত পানির এলাকায়
ব্রি ধান ৭১
- উদ্ভাবনকারী প্রতিষ্ঠান: BRRI
- মৌসুম: আমন
- বিশেষ বৈশিষ্ট্য: খরা সহনশীল ও স্থিতিশীল ফলন
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: ব্লাস্ট রোগের প্রতি উন্নত সহনশীলতা
- উপযোগিতা: বরেন্দ্র ও খরা প্রবণ এলাকায় বিশেষভাবে উপযোগী
ব্রি ধান ৭৫
- উদ্ভাবনকারী প্রতিষ্ঠান: BRRI
- মৌসুম: আমন
- বিশেষ বৈশিষ্ট্য: উচ্চ ফলনশীল
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: ব্লাস্ট রোগের প্রতি ভালো সহনশীলতা
- উপযোগিতা: মধ্য ও উত্তরাঞ্চলের আমন এলাকায়
বোরো মৌসুমের রোগ প্রতিরোধী ধানের জাত
বোরো মৌসুমে বিশেষ করে ব্লাস্ট রোগ সবচেয়ে বড় সমস্যা। এ কারণে BRRI সাম্প্রতিক সময়ে ব্লাস্ট প্রতিরোধী একাধিক জাত উদ্ভাবন করেছে।
ব্রি ধান ৩৫
- উদ্ভাবনকারী প্রতিষ্ঠান: BRRI
- মৌসুম: বোরো
- বিশেষ বৈশিষ্ট্য: স্বল্পমেয়াদি
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: বাদামী গাছফড়িং (BPH) প্রতিরোধী
- উপযোগিতা: বোরো মৌসুমে BPH প্রবণ এলাকায়
ব্রি ধান ৫৮
- উদ্ভাবনকারী প্রতিষ্ঠান: BRRI
- মৌসুম: বোরো
- বিশেষ বৈশিষ্ট্য: উচ্চ ফলনশীল
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: ব্লাস্ট রোগের প্রতি উন্নত সহনশীলতা
- উপযোগিতা: উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বোরো এলাকায়
ব্রি ধান ৮৯
- উদ্ভাবনকারী প্রতিষ্ঠান: BRRI
- মৌসুম: বোরো
- বিশেষ বৈশিষ্ট্য: উচ্চ ফলনশীল
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: ব্লাস্ট রোগের প্রতি তুলনামূলক সহনশীল
- উপযোগিতা: উচ্চ ফলনের বোরো এলাকায়
ব্রি ধান ১১৪ (ব্লাস্ট প্রতিরোধী)
- উদ্ভাবনকারী প্রতিষ্ঠান: BRRI
- মৌসুম: বোরো
- বিশেষ বৈশিষ্ট্য: দীর্ঘমেয়াদি (প্রায় ১৪৯ দিন), উচ্চ ফলনশীল
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী
- গড় ফলন: প্রায় ৭.৭৬ টন/হেক্টর
- উপযোগিতা: উত্তর, উত্তর-পশ্চিম ও ব্লাস্ট প্রবণ বোরো এলাকায় বিশেষভাবে উপযোগী
BINA উদ্ভাবিত রোগ প্রতিরোধী ধানের জাত
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BINA) বিভিন্ন মৌসুমে রোগ ও প্রতিকূল পরিবেশ সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে।
বিনাধান-১০
- মৌসুম: আমন
- বিশেষ বৈশিষ্ট্য: লবণাক্ততা সহনশীল
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: ব্লাস্ট রোগের প্রতি তুলনামূলক সহনশীল
- উপযোগিতা: উপকূলীয় এলাকায়
বিনাধান-১৭
- মৌসুম: আমন
- বিশেষ বৈশিষ্ট্য: স্বল্পমেয়াদি
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: ব্লাস্ট ও কিছু পাতাজনিত রোগের প্রতি সহনশীল
- উপযোগিতা: বন্যা-পরবর্তী দ্রুত চাষে উপযোগী
বিনাধান-২৫
- মৌসুম: বোরো
- বিশেষ বৈশিষ্ট্য: উচ্চ ফলনশীল
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: ব্লাস্ট রোগের প্রতি উন্নত সহনশীলতা
- উপযোগিতা: উত্তরাঞ্চল ও বোরো এলাকায়
- মৌসুমভিত্তিক রোগ প্রতিরোধী ধানের জাত
আউশ - ব্রি ধান ৪২ - ব্লাস্ট সহনশীল
আউশ - ব্রি ধান ৪৩ - ব্লাস্ট সহনশীল
আউশ - ব্রি ধান ৪৮ - ব্লাস্ট সহনশীল
আমন - ব্রি ধান ৩৯ - ব্লাস্ট সহনশীল
আমন - ব্রি ধান ৪৯ - ব্লাস্ট সহনশীল
আমন - ব্রি ধান ৫৬ - ব্লাস্ট সহনশীল
আমন - ব্রি ধান ৫৭ - ব্লাস্ট সহনশীল
আমন - ব্রি ধান ৭১ - ব্লাস্ট সহনশীল
আমন - ব্রি ধান ৭৫ - ব্লাস্ট সহনশীল
বোরো - ব্রি ধান ৩৫ - বাদামী গাছফড়িং (BPH) প্রতিরোধী
বোরো - ব্রি ধান ৫৮ - ব্লাস্ট সহনশীল
বোরো - ব্রি ধান ৮৯ - ব্লাস্ট সহনশীল
বোরো - ব্রি ধান ১১৪ - ব্লাস্ট প্রতিরোধী
আমন- বিনাধান ১০ - ব্লাস্ট সহনশীল
আমন -বিনাধান ১৭ - ব্লাস্ট সহনশীল
বোরো -বিনাধান ২৫ - ব্লাস্ট সহনশীল
কৃষকদের জন্য জাত নির্বাচন পরামর্শ
- ব্লাস্ট প্রবণ বোরো এলাকায়: ব্রি ধান ১১৪, ব্রি ধান ৫৮
- খরা প্রবণ আমন এলাকায়: ব্রি ধান ৫৬, ব্রি ধান ৫৭, ব্রি ধান ৭১
- বাদামী গাছফড়িং প্রবণ এলাকায়: ব্রি ধান ৩৫
- উপকূলীয় এলাকায়: বিনাধান-১০
- স্বল্পমেয়াদি আমনের ব্রি ধান ৩৯, ব্রি ধান ৫৬
উপসংহার
বাংলাদেশের বিভিন্ন গবেষণাগারে উদ্ভাবিত রোগ প্রতিরোধী ধানের জাত কৃষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। বিশেষ করে BRRI dhan114-এর মতো ব্লাস্ট প্রতিরোধী জাত এবং BRRI dhan35-এর মতো BPH প্রতিরোধী জাত রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। স্থানীয় পরিবেশ, রোগের প্রকোপ এবং মৌসুম অনুযায়ী উপযুক্ত জাত নির্বাচন করলে উৎপাদন ব্যয় কমে, কীটনাশক ও ছত্রাকনাশকের ব্যবহার হ্রাস পায় এবং ধানের ফলন ও লাভজনকতা বৃদ্ধি পায়। তাই কৃষকদের উচিত স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী রোগ প্রতিরোধী ও প্রত্যয়িত ধানের জাত নির্বাচন করে চাষ করা।
তথ্যসূত্র :
১.বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) – Salient Features of BRRI Rice Varieties
২. BRRI Rice Knowledge Bank
৩. বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BINA) – উদ্ভাবিত ধানের জাতসমূহ
৪. বাংলাদেশ কৃষি মন্ত্রণালয় ও BRRI-এর জাত অনুমোদন সংক্রান্ত প্রকাশনা