নুর উদ্দীন মোঃ জাহাংগীর, প্রধান লেখক ও সম্পাদক

ভূমিকা:

একটি শিশু যখন প্রথম পৃথিবীকে চিনতে শেখে, তখন তার সামনে থাকে প্রকৃতির এক বিস্ময়কর পাঠশালা। সকালের শিশিরভেজা ঘাস, বৃষ্টির পর মাটির সোঁদা গন্ধ, মাঠের সবুজ ধানগাছ, গাছের ডালে পাখির ডাক কিংবা মায়ের হাতে বেড়ে ওঠা ছোট্ট সবজিবাগান—এসবই তার জীবনের প্রথম পাঠ। প্রকৃতি তাকে শেখায় জীবন, সৃষ্টি, ধৈর্য, পরিচর্যা ও সহাবস্থানের অর্থ। অথচ সময়ের পরিবর্তনে আমাদের নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ যেন সেই চিরচেনা পাঠশালা থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। আজকের শিশুরা স্মার্টফোনের পর্দায় ভার্চুয়াল বাগান তৈরি করতে পারে, ভিডিও গেমে ফসল উৎপাদন করতে পারে, পৃথিবীর নানা দেশের কৃষিপ্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে পারে; কিন্তু বাস্তবে একটি বীজ মাটিতে বপন করে কীভাবে চারা জন্মায়, গাছের শিকড় কীভাবে খাদ্য সংগ্রহ করে, ধানগাছের কুশি থেকে কীভাবে শীষ আসে, কিংবা কৃষকের শ্রমে কীভাবে আমাদের প্রতিদিনের খাবার টেবিলে পৌঁছায়—এসব বিষয়ে অনেকেরই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই। যে দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও জীবনযাত্রার গভীরে কৃষির শিকড় প্রোথিত, সেই দেশের নতুন প্রজন্ম যদি কৃষির মৌলিক পরিচয় থেকেই দূরে সরে যায়, তবে তা শুধু শিক্ষাগত ঘাটতি নয়; এটি জাতির আত্মপরিচয় ও ভবিষ্যৎ জীবনব্যবস্থার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশের জন্ম, বিকাশ ও সংগ্রামের ইতিহাসে কৃষকের অবদান অনস্বীকার্য। কৃষকের ঘামে উৎপাদিত ধান, পাট, গম, শাকসবজি, ফলমূল ও অন্যান্য ফসল আমাদের খাদ্য, অর্থনীতি ও সমাজজীবনের ভিত্তি নির্মাণ করেছে। অথচ আধুনিক শিক্ষার প্রতিযোগিতায় কৃষি ও কৃষকের জীবন যেন পাঠ্যবইয়ের প্রান্তিক কোনো প্রসঙ্গ হয়ে পড়ছে। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে কৃষি মানে কেবল একটি পেশা, গ্রাম মানে অনুন্নত জীবন, আর মাটি মানে নির্মাণকাজের উপকরণ। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। আমরা এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা চাই, যেখানে শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য পড়বে না; বরং নিজের দেশ, প্রকৃতি, খাদ্য, কৃষক, পরিবেশ এবং জীবনের মৌলিক সম্পর্কও বুঝতে শিখবে। এ লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম কার্যকর পথ হতে পারে মাধ্যমিক স্তরে কৃষিশিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ও জীবনঘনিষ্ঠ একটি বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা। কৃষিশিক্ষা মানে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে কৃষক বানানো নয়। বরং কৃষি সম্পর্কে বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান, খাদ্যের উৎস সম্পর্কে সচেতনতা, প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ববোধ, পরিবেশ সংরক্ষণ, পুষ্টি, প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা হওয়ার সক্ষমতা গড়ে তোলা। অর্থাৎ কৃষিশিক্ষা হবে জীবনকে জানার শিক্ষা, শেকড়কে চেনার শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করার শিক্ষা।

১. কৃষিপ্রধান দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কৃষিশিক্ষার অবস্থান

বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক এতটাই গভীর যে কৃষিকে বাদ দিয়ে এ দেশের ইতিহাস, অর্থনীতি কিংবা সামাজিক বিবর্তনকে পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। আমাদের জাতীয় সংগীতের প্রকৃতির বর্ণনা, লোকসংগীতের মাঠ-ঘাট, পল্লিকবির কবিতার ধানক্ষেত কিংবা গ্রামীণ উৎসবের কৃষিনির্ভর ঐতিহ্য—সবকিছুর মধ্যেই কৃষির উপস্থিতি। অথচ শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন শিক্ষাজীবনে কৃষি এখনো প্রত্যাশিত গুরুত্ব পায়নি। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (NCTB) মাধ্যমিক স্তরে কৃষিশিক্ষার পাঠ্যবই ও বিষয়বস্তু রয়েছে। কিন্তু বিষয়টি সব শিক্ষার্থীর জন্য সমানভাবে বাধ্যতামূলক নয়। ফলে কৃষি সম্পর্কে প্রাথমিক বিজ্ঞানভিত্তিক ধারণা অর্জনের সুযোগ সবার জন্য নিশ্চিত হচ্ছে না।  জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ২০২৬ সালের জন্য প্রকাশিত এনসিটিবির বিষয়-কাঠামো ও মূল্যায়ন নির্দেশনাতেও মাধ্যমিক শিক্ষার বিষয় বিন্যাস এবং পাঠদানের কাঠামো নির্ধারণের বিষয়টি রয়েছে। এ কাঠামো পুনর্বিবেচনার সময় কৃষিশিক্ষাকে সর্বজনীন জীবনদক্ষতার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ রয়েছে। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—যে দেশের অর্থনীতি ও খাদ্যব্যবস্থার সঙ্গে কৃষি গভীরভাবে জড়িত, সেই দেশের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কি কৃষি সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান থাকা উচিত নয়? আমার বিবেচনায়, অবশ্যই উচিত। কারণ একজন ভবিষ্যৎ চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, প্রশাসক, ব্যবসায়ী কিংবা তথ্যপ্রযুক্তিবিদ—যে পেশাতেই যুক্ত হোন না কেন, খাদ্য, কৃষি ও পরিবেশ সম্পর্কে তাঁর বাস্তব জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।

২. কৃষিশিক্ষার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: বাধ্যতামূলক থেকে ঐচ্ছিক—একটি নীতিগত পশ্চাদপসরণ

কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কৃষির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এ দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ জীবনযাত্রা এবং জাতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে কৃষি নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। তাই কৃষি সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান ছাড়া একটি কৃষিপ্রধান দেশের টেকসই উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রা কল্পনা করা কঠিন।এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের শিক্ষানীতিতে জীবনমুখী ও কর্মমুখী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পেয়েছিল। তৎকালীন সরকারও অনুধাবন করেছিল যে, কেবল সনদ অর্জননির্ভর শিক্ষা দিয়ে জাতীয় উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের এমন জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে, যা তাদের বাস্তব জীবনে কাজে লাগবে এবং দেশের উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করবে। এই চিন্তা ও প্রয়োজনীয়তার আলোকে ১৯৯৩ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে কৃষিশিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অন্তর্নিহিত দর্শন ছিল অত্যন্ত বাস্তবসম্মত—দেশের প্রত্যেক শিক্ষার্থী কৃষির মৌলিক জ্ঞান অর্জন করবে, খাদ্যের উৎস সম্পর্কে জানবে, কৃষকের শ্রম ও অবদান উপলব্ধি করবে এবং কৃষিকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে চিনতে শিখবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমে কৃষিশিক্ষাকে ঐচ্ছিক বিষয়ে পরিণত করা হয়। এর ফলে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ কৃষিশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যারা বিষয়টি নির্বাচন করে না, তাদের জন্য কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, মাটির স্বাস্থ্য, কৃষিপ্রযুক্তি ও কৃষি অর্থনীতি সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন দেখা দেয়—যে দেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান ভিত্তি কৃষি, সেই দেশের মাধ্যমিক স্তরের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য কৃষির প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন কি ঐচ্ছিক থাকা উচিত? আমাদের বিবেচনায়, কৃষিশিক্ষাকে ঐচ্ছিক করে রাখার পরিবর্তে পুনরায় বাধ্যতামূলক করা সময়ের দাবি। কারণ কৃষি কেবল একটি পেশা নয়; এটি একটি দেশের জীবনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। একজন শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে যে পেশাতেই যুক্ত হোক না কেন, খাদ্য, কৃষি, পরিবেশ ও প্রকৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পর্কে তার মৌলিক জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। অতএব, ১৯৯৩ সালে গৃহীত কৃষিশিক্ষার বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগকে বর্তমান সময়ের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিকায়ন করে পুনঃপ্রবর্তন করা প্রয়োজন। তবে এবারের কৃষিশিক্ষা হতে হবে আরও বিজ্ঞানভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর, ব্যবহারিক ও কর্মমুখী। এতে যুক্ত হবে স্মার্ট কৃষি, জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, কৃষি উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মতো সমকালীন বিষয়। কৃষিনির্ভর এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কৃষিশিক্ষা ঐচ্ছিক নয়, বরং প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জীবনঘনিষ্ঠ মৌলিক শিক্ষা হওয়া উচিত।

 

৩. কৃষিশিক্ষা কেন মাধ্যমিক স্তর থেকেই বাধ্যতামূলক হওয়া প্রয়োজন?

মাধ্যমিক স্তর একজন শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তি, মূল্যবোধ, ব্যক্তিত্ব ও পেশাগত আগ্রহ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ বয়সে শিক্ষার্থীরা প্রকৃতি, সমাজ, বিজ্ঞান ও অর্থনীতি সম্পর্কে যুক্তিনির্ভর ধারণা গড়ে তুলতে শুরু করে। তাই এই পর্যায়ে কৃষিশিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হলে তা শুধু কৃষি সম্পর্কে জ্ঞান দেবে না; বরং বাস্তব জীবন বোঝার সক্ষমতাও বাড়াবে। এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যৌক্তিকতা রয়েছে। প্রথমত, খাদ্যের উৎস সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি। আমরা প্রতিদিন ভাত, মাছ, ডাল, শাকসবজি ও ফলমূল খাই। কিন্তু এসব খাদ্য উৎপাদনের পেছনে মাটি, পানি, বীজ, কৃষকের শ্রম এবং প্রকৃতির কী অসামান্য ভূমিকা রয়েছে, তা অনেক শিক্ষার্থীর অজানা। কৃষিশিক্ষা তাদের খাদ্যের প্রকৃত উৎস সম্পর্কে সচেতন করবে। দ্বিতীয়ত, কৃষকের প্রতি সম্মান ও সামাজিক মর্যাদাবোধ সৃষ্টি। কৃষক শুধু একজন উৎপাদক নন; তিনি জাতির খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম প্রধান রক্ষক। কৃষিশিক্ষা শিক্ষার্থীদের কৃষকের শ্রম, জ্ঞান ও অবদান উপলব্ধি করতে সাহায্য করবে। তৃতীয়ত, বিজ্ঞানকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা। উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ, মাটির পুষ্টি, পানির চক্র, জীববৈচিত্র্য, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো কৃষির মাধ্যমে হাতে-কলমে শেখানো যায়। চতুর্থত, আত্মকর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা তৈরি। কৃষিশিক্ষা শিক্ষার্থীদের ছাদবাগান, নার্সারি, মাশরুম চাষ, মৌমাছি পালন, মাছ চাষ, হাইড্রোপনিকস এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো সম্ভাবনাময় উদ্যোগ সম্পর্কে আগ্রহী করে তুলতে পারে। পঞ্চমত, পরিবেশবান্ধব জীবনদর্শন গড়ে তোলা। মাটির স্বাস্থ্য, পানি সংরক্ষণ, জৈব সার, নিরাপদ খাদ্য ও বৃক্ষরোপণের শিক্ষা শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে।

৪. শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক হারানোর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকট

একটি জাতির শেকড় শুধু তার ভৌগোলিক অবস্থানে নয়; তার খাদ্যাভ্যাস, ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষি ঐতিহ্য, লোকজ জ্ঞান এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যেও নিহিত থাকে। বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে একসময় কৃষিকাজ ছিল পরিবারের সম্মিলিত অভিজ্ঞতা। বীজ বপন, চারা রোপণ, ধান কাটা, নবান্ন, ফসল ঘরে তোলা—এসব ছিল পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শিশুরা পরিবারের বড়দের কাছ থেকে কৃষির নানা অভিজ্ঞতা অর্জন করত। বর্তমানে নগরায়ণ, একক পরিবার, আবাসন সংকট, প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদন এবং প্রকৃতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের অভাবে অনেক শিশুর জীবন থেকে এসব অভিজ্ঞতা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। শহরের একটি শিশু হয়তো সুপারশপ থেকে কেনা চালের প্যাকেট চেনে, কিন্তু ধানের শীষ চেনে না। সে ফলের স্বাদ জানে, কিন্তু ফলের ফুল থেকে ফল হওয়ার প্রক্রিয়া জানে না। খাদ্যের অপচয় করে, অথচ একটি ফসল উৎপাদনে কৃষকের কত মাসের শ্রম ও যত্ন প্রয়োজন, তা উপলব্ধি করে না। এটি শুধু জ্ঞানের ঘাটতি নয়; প্রকৃতি ও মানুষের শ্রমের প্রতি সংবেদনশীলতারও ঘাটতি। কৃষিশিক্ষা এই বিচ্ছিন্নতা কমাতে পারে। বিদ্যালয়ের ছোট্ট একটি সবজিবাগান, শিক্ষার্থীদের হাতে বীজ বপন, গাছের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ কিংবা ফসল সংগ্রহের অভিজ্ঞতা তাদের মাটির সঙ্গে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে।

৫. কৃষিশিক্ষা হবে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর

মাধ্যমিক স্তরে কৃষিশিক্ষা বাধ্যতামূলক করার অর্থ পুরোনো দিনের কৃষিকাজের বিবরণ মুখস্থ করানো নয়। বরং আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও পরিবেশ সচেতনতার সমন্বয়ে একটি যুগোপযোগী পাঠক্রম তৈরি করা। বর্তমান কৃষি আর শুধু লাঙল, গরু ও প্রচলিত সেচব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কৃষিতে যুক্ত হয়েছে ড্রোন, সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইট তথ্য, স্মার্ট সেচ, হাইড্রোপনিকস, টিস্যু কালচার এবং নির্ভুল কৃষি প্রযুক্তি (Precision Agriculture)।

তাই কৃষিশিক্ষার পাঠ্যক্রমে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

  • মাটি ও মাটির স্বাস্থ্য: মাটির গঠন, অম্লত্ব, জৈব পদার্থ, পুষ্টি উপাদান ও মাটি পরীক্ষার ধারণা।
  • বীজ ও ফসল উৎপাদন: উন্নত বীজ, বীজ সংরক্ষণ, অঙ্কুরোদ্গম, চারা উৎপাদন ও ফসলের জীবনচক্র।
  • আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি: ড্রিপ সেচ, স্প্রিংকলার, হাইড্রোপনিকস, ভার্টিক্যাল ফার্মিং ও স্মার্ট কৃষি।
  • জলবায়ু সহনশীল কৃষি: খরা, বন্যা, লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা সহনশীল ফসল ব্যবস্থাপনা।
  • নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন: জৈব কৃষি, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা এবং কীটনাশকের নিরাপদ ব্যবহার।
  • প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য: হাঁস-মুরগি, গবাদিপশু, মাছ চাষ ও সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক ধারণা।
  • কৃষি অর্থনীতি ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন: উৎপাদন ব্যয়, বাজারজাতকরণ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজন।
  • কৃষি ও পুষ্টি: সুষম খাদ্য, খাদ্য বৈচিত্র্য, শাকসবজি ও ফলমূলের পুষ্টিগুণ।

এভাবে কৃষিশিক্ষা হয়ে উঠবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও পরিবেশের একটি সমন্বিত পাঠ।

৬. বিদ্যালয়ে কৃষি বাগান: বইয়ের বাইরের জীবন্ত পাঠশালা

কৃষিশিক্ষার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো হাতে-কলমে শেখা। একটি শিক্ষার্থী যখন নিজের হাতে একটি বীজ বপন করে, প্রতিদিন চারার বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করে এবং শেষ পর্যন্ত সেই গাছ থেকে ফসল সংগ্রহ করে, তখন সে যে জ্ঞান অর্জন করে তা কেবল বই পড়ে অর্জন করা সম্ভব নয়। এ কারণে প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে জায়গার প্রাপ্যতা অনুযায়ী একটি শিক্ষামূলক কৃষিবাগান বা School Learning Garden গড়ে তোলা যেতে পারে। বিদ্যালয়ের কৃষিবাগানে শিক্ষার্থীরা দলগতভাবে মৌসুমি শাকসবজি, ডালজাতীয় ফসল, মসলা, ফলের চারা ও ঔষধি গাছ লাগাতে পারে। জমি না থাকলে ছাদ, বারান্দা, টব, বস্তা কিংবা উল্লম্ব বাগান ব্যবহার করা যায়।

এখানে শিক্ষার্থীরা বাস্তবে শিখবে—

  • কীভাবে মাটি তৈরি করতে হয়।
  • বীজ বপন ও চারা রোপণ করতে হয়।
  • জৈব সার ও কম্পোস্ট তৈরি করতে হয়।
  • গাছের রোগবালাই শনাক্ত করতে হয়।
  • পানি সাশ্রয়ী সেচ দিতে হয়।
  • ফসল সংগ্রহ ও উৎপাদন হিসাব করতে হয়।

বিদ্যালয়ের এই বাগান শুধু কৃষি শেখানোর স্থান হবে না; এটি হবে দায়িত্ববোধ, সহযোগিতা, নেতৃত্ব, ধৈর্য ও শ্রমের মর্যাদা শেখার একটি অনন্য ক্ষেত্র।

৭. কৃষিশিক্ষা ও খাদ্যনিরাপত্তা: ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়িত্ব

বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা এখন বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। জনসংখ্যার চাপ, কৃষিজমি হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তন, মাটির স্বাস্থ্যহানি, কৃষিশ্রমিকের সংকট এবং উৎপাদন ব্যয়ের বৃদ্ধি কৃষির ভবিষ্যৎকে জটিল করে তুলছে। এই বাস্তবতায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কৃষি সম্পর্কে সচেতন করে তোলা জাতীয় প্রয়োজন। কৃষিশিক্ষা শিক্ষার্থীদের শেখাবে খাদ্য কোথা থেকে আসে, খাদ্য উৎপাদনে কী কী সম্পদ প্রয়োজন এবং কীভাবে সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করা যায়। একজন শিক্ষার্থী যদি বুঝতে পারে যে এক মুঠো চালের পেছনে রয়েছে কৃষকের শ্রম, মাটির উর্বরতা, পানির ব্যবহার, বীজের গুণগত মান এবং প্রকৃতির অনুকূল পরিবেশ, তাহলে খাদ্যের অপচয় রোধেও তার দায়িত্ববোধ তৈরি হবে। পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস এবং স্থানীয় কৃষিপণ্য ব্যবহারের গুরুত্বও সে উপলব্ধি করতে পারবে।

৮. কৃষিশিক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন: পরিবেশ সচেতন নাগরিক গড়ে তোলা

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, নদীভাঙন ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষির উৎপাদন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের জলবায়ু সহনশীল কৃষি সম্পর্কে জ্ঞান দেওয়া প্রয়োজন। তাদের বোঝাতে হবে, বৃক্ষরোপণ, পানি সংরক্ষণ, মাটির জৈব পদার্থ বৃদ্ধি, ফসলের বৈচিত্র্য এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতি কীভাবে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়তা করে। UNESCO-এর Education for Sustainable Development (ESD) ধারণায় শিক্ষার মাধ্যমে পরিবেশ, অর্থনীতি ও সমাজের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝা এবং দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের UNESCO-এর ‘Greening Every Curriculum’ নির্দেশনাতেও প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষাক্রমে জলবায়ু শিক্ষা ও বাস্তবমুখী পরিবেশ সচেতনতা সংযুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। অতএব, মাধ্যমিক কৃষিশিক্ষা শুধু ফসল উৎপাদনের পাঠ নয়; এটি জলবায়ু সচেতন ও পরিবেশবান্ধব নাগরিক তৈরিরও একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।

৯. কৃষিশিক্ষা ও কর্মসংস্থান: কৃষিকে সম্ভাবনাময় পেশা হিসেবে পরিচিত করা

আমাদের সমাজে এখনো একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে—ভালো শিক্ষার্থী মানেই চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রশাসক কিংবা করপোরেট চাকরিজীবী হওয়ার স্বপ্ন দেখবে। কৃষিকে অনেক সময় তুলনামূলক কম মর্যাদার পেশা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই মানসিকতা পরিবর্তন করা জরুরি। আধুনিক কৃষি এখন একটি বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষেত্র। কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে বীজ প্রযুক্তি, কৃষিযন্ত্র, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিপণন, কৃষি পরামর্শ, ডিজিটাল সেবা ও রপ্তানি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ।

কৃষিশিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নতুন কিছু পেশাগত সম্ভাবনার সঙ্গে পরিচিত হতে পারে।

  • আধুনিক কৃষি উদ্যোক্তা ও স্মার্ট ফার্ম ব্যবস্থাপক।
  • বীজ উৎপাদন ও নার্সারি উদ্যোক্তা।
  • হাইড্রোপনিকস ও ছাদবাগান উদ্যোক্তা।
  • মাশরুম ও নিরাপদ সবজি উৎপাদনকারী।
  • কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ উদ্যোক্তা।
  • কৃষিযন্ত্র ও কৃষি প্রযুক্তি সেবাদাতা।
  • কৃষিভিত্তিক ই-কমার্স ও ডিজিটাল কৃষি উদ্যোক্তা।
  • মাছ, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর সমন্বিত খামার উদ্যোক্তা।

এভাবে কৃষিশিক্ষা শিক্ষার্থীদের শুধু চাকরির সন্ধানী নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হিসেবেও গড়ে উঠতে উৎসাহিত করবে।

১০. কৃষিশিক্ষার আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিদ্যালয় পর্যায়ে কৃষি, খাদ্য ও পরিবেশ শিক্ষা বাস্তবমুখী শিক্ষার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে School Garden এবং Agricultural Education কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কৃষি, বিজ্ঞান ও খাদ্যব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত করা হয়। জাপানে বিদ্যালয়ভিত্তিক কৃষিকাজ ও খাদ্যশিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের খাদ্যের উৎস এবং কৃষকের শ্রম সম্পর্কে সচেতন করার উদ্যোগ রয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—কৃষিশিক্ষাকে শুধু বইয়ের একটি অধ্যায় হিসেবে নয়, বরং বিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষাকার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশেও এ ধরনের উদ্যোগের ভিত্তি রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য কৃষি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিদ্যালয় পর্যায়ে কাজে লাগানো যেতে পারে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে কৃষিবিজ্ঞান শিক্ষা নিয়ে একটি গবেষণায় কৃষিজ্ঞান, পারিবারিক কৃষি, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিতে কৃষিশিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণাটিতে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, আধুনিক পাঠ্যক্রম এবং কৃষিশিল্পের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে স্থানীয় কৃষি, সংস্কৃতি ও পরিবেশের সমন্বয় ঘটিয়ে একটি নিজস্ব কৃষিশিক্ষা মডেল তৈরি করা সম্ভব।

১১. মাধ্যমিক শিক্ষায় কৃষিশিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা

কৃষিশিক্ষাকে মাধ্যমিক স্তরে বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব বাস্তবায়নে পরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। শুধু নতুন একটি বিষয় যুক্ত করলেই প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাবে না। এর জন্য পাঠ্যক্রম, শিক্ষক, প্রশিক্ষণ, ব্যবহারিক উপকরণ, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও মূল্যায়ন পদ্ধতির সমন্বিত উন্নয়ন দরকার। আমার প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনা নিম্নরূপ।

১. ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত কৃষিশিক্ষা বাধ্যতামূলক করা

মাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষার্থীর জন্য কৃষিশিক্ষাকে আবশ্যিক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তবে শ্রেণিভেদে বিষয়বস্তুর গভীরতা ও ব্যবহারিক কাজের ধরন নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

২. বয়স ও শ্রেণিভিত্তিক পাঠ্যক্রম তৈরি

ষষ্ঠ শ্রেণিতে মাটি, বীজ, উদ্ভিদ ও কৃষির পরিচিতি; সপ্তম শ্রেণিতে ফসল উৎপাদন, সার ও পানি ব্যবস্থাপনা; অষ্টম শ্রেণিতে কৃষিপ্রযুক্তি ও পরিবেশ; নবম শ্রেণিতে আধুনিক কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য; দশম শ্রেণিতে কৃষি অর্থনীতি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও জলবায়ু সহনশীল কৃষির বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

৩. ব্যবহারিক নম্বর ও প্রকল্পভিত্তিক মূল্যায়ন

শুধু লিখিত পরীক্ষার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের কৃষিবাগান তৈরি, বীজ অঙ্কুরোদ্গম পরীক্ষা, কম্পোস্ট তৈরি, গাছের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ এবং ক্ষুদ্র কৃষি প্রকল্পের মাধ্যমে মূল্যায়ন করতে হবে।

৪. কৃষিশিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ

প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষিত কৃষিশিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিদ্যমান বিজ্ঞান ও অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষকদের জন্য কৃষির মৌলিক ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সুযোগ রাখা যেতে পারে।

৫. কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ

বিদ্যালয়গুলোকে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য কৃষি পরিচিতি কর্মসূচি আয়োজন করা যেতে পারে।

৬. শহর ও গ্রামের বিদ্যালয়ের জন্য পৃথক বাস্তবায়ন পদ্ধতি

গ্রামীণ বিদ্যালয়ে জমিভিত্তিক কৃষিবাগান এবং শহরের বিদ্যালয়ে ছাদবাগান, টব, বস্তা, হাইড্রোপনিকস ও ভার্টিক্যাল গার্ডেনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে জায়গার সীমাবদ্ধতা কৃষিশিক্ষার বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।

৭. ডিজিটাল কৃষিশিক্ষা চালু করা

ভিডিও, অ্যানিমেশন, ভার্চুয়াল ফার্ম, কৃষি অ্যাপ, আবহাওয়ার তথ্য এবং ডিজিটাল ফসল পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কৃষিশিক্ষাকে আরও আকর্ষণীয় করা সম্ভব।

১২. কৃষিশিক্ষা বাস্তবায়নে অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজের দায়িত্ব

শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন শুধু সরকারের একক দায়িত্ব নয়। পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজের সম্মিলিত সহযোগিতা ছাড়া কৃষিশিক্ষার প্রকৃত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া। ছুটির দিনে গ্রামে বেড়াতে গেলে কৃষকের মাঠ, সবজিবাগান, ফলের বাগান কিংবা খামার দেখানোর সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। শিক্ষকদের উচিত পাঠ্যবইয়ের তথ্যের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটানো। একটি বীজের অঙ্কুরোদ্গম, গাছের খাদ্য তৈরি কিংবা মাটির পানি ধারণক্ষমতা শ্রেণিকক্ষের আলোচনার পাশাপাশি বাস্তব পরীক্ষার মাধ্যমে শেখানো যায়। স্থানীয় কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তাদেরও বিদ্যালয়ের শিক্ষাকার্যক্রমে যুক্ত করা যেতে পারে। একজন অভিজ্ঞ কৃষক যখন শিক্ষার্থীদের নিজের হাতে বীজ বপন, চারা তৈরি কিংবা ফসল সংগ্রহের অভিজ্ঞতা তুলে ধরবেন, তখন সেই শিক্ষা অনেক বেশি জীবন্ত হয়ে উঠবে। এভাবে বিদ্যালয় ও কৃষকের মাঠের মধ্যে একটি জ্ঞানভিত্তিক সেতুবন্ধন তৈরি হতে পারে।

১৩. কৃষিশিক্ষা: শুধু কৃষির নয়, মানবিক মূল্যবোধেরও শিক্ষা

কৃষিশিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর মানবিক ও নৈতিক তাৎপর্য। কৃষিকাজ মানুষকে অপেক্ষা করতে শেখায়, পরিচর্যা করতে শেখায় এবং প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলতে শেখায়। একটি বীজ বপনের পরপরই ফল পাওয়া যায় না। তাকে সময় দিতে হয়, পানি দিতে হয়, আগাছা পরিষ্কার করতে হয়, রোগবালাই থেকে রক্ষা করতে হয়। এই প্রক্রিয়া শিক্ষার্থীদের ধৈর্য, দায়িত্বশীলতা ও পরিশ্রমের মূল্য শেখায়। কৃষিবাগানে দলগত কাজের মাধ্যমে সহযোগিতা, নেতৃত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়। উৎপাদিত সবজি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বা স্থানীয় সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার উদ্যোগ থেকে মানবিকতার শিক্ষাও পাওয়া যায়। কৃষিশিক্ষা ছেলে-মেয়ে সবার জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মেয়েদের কৃষি উদ্যোক্তা, নার্সারি ব্যবস্থাপক, কৃষি প্রযুক্তিবিদ কিংবা খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনাও এতে উন্মুক্ত হবে। সবচেয়ে বড় কথা, কৃষিশিক্ষা শিক্ষার্থীকে বুঝতে শেখাবে—মানুষ প্রকৃতির মালিক নয়, বরং প্রকৃতির একটি অংশ। প্রকৃতিকে রক্ষা করেই মানুষের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।

১৪. আমাদের প্রত্যাশা: পাঠ্যবইয়ে ফিরুক মাটির গন্ধ ও ফসলের গল্প

একটি জাতির শিক্ষাব্যবস্থার সার্থকতা শুধু কতজন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করল কিংবা কতজন ভালো চাকরি পেল, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে নিজের সমাজ, দেশ, প্রকৃতি ও জীবন সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি নিজের কৃষি ঐতিহ্য সম্পর্কেও সচেতন থাকে। তারা যেন জানে, একটি ধানের শীষের পেছনে রয়েছে কৃষকের দীর্ঘ পরিশ্রম; একটি ফলের পেছনে রয়েছে প্রকৃতির বিস্ময়কর প্রক্রিয়া; আর একটি উর্বর জমির পেছনে রয়েছে অসংখ্য জীবের সম্মিলিত অবদান। আমরা চাই, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষার খাতায় ফসলের সংজ্ঞা লিখবে না; সে নিজের হাতে একটি বীজ বপন করবে। শুধু মাটির উপাদানের নাম মুখস্থ করবে না; মাটি পরীক্ষা করে তার গুণাগুণ জানবে। শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের সংজ্ঞা জানবে না; বৃক্ষরোপণ, পানি সংরক্ষণ ও পরিবেশবান্ধব কৃষির মাধ্যমে এর মোকাবিলায় অংশ নেবে। এমন শিক্ষা বাস্তবায়িত হলে কৃষি আর কেবল গ্রামীণ জীবনের বিষয় হয়ে থাকবে না; বরং তা হয়ে উঠবে প্রত্যেক নাগরিকের জীবনদক্ষতা ও জাতীয় দায়িত্ববোধের অংশ।

উপসংহার:

আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই খাদ্যব্যবস্থাকে শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ করছে, কিন্তু প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্নতা মানুষের অস্তিত্বকেই নতুন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশের জন্য এ বাস্তবতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিকে বাদ দিয়ে আমাদের জাতীয় উন্নয়ন, খাদ্যনিরাপত্তা কিংবা পরিবেশ সুরক্ষার স্বপ্ন পূরণ সম্ভব নয়। তাই মাধ্যমিক স্তরে কৃষিশিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা এখন সময়ের দাবি। এই দাবি কোনো নির্দিষ্ট পেশার প্রসারের দাবি নয়; এটি একটি বিজ্ঞানমনস্ক, প্রকৃতিবান্ধব, খাদ্যসচেতন ও দায়িত্বশীল প্রজন্ম গড়ে তোলার দাবি। আমরা চাই, নতুন প্রজন্ম জানুক—ধানের শীষ কীভাবে দোলে, মাটির নিচে শিকড় কীভাবে খাদ্য সংগ্রহ করে, একটি বীজ কীভাবে জীবনের সূচনা করে এবং কৃষকের ঘামে কীভাবে একটি জাতির খাদ্যভান্ডার সমৃদ্ধ হয়। পাঠ্যবইয়ের পাতায় ফিরে আসুক মাটির সোঁদা গন্ধ, কৃষকের জীবন, ফসলের গল্প এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের চিরন্তন সম্পর্ক। বিদ্যালয়ের আঙিনায় গড়ে উঠুক ছোট ছোট কৃষিবাগান। শিক্ষার্থীদের হাতে উঠুক বইয়ের পাশাপাশি বীজ, চারা ও মাটির স্পর্শ। কারণ যে প্রজন্ম নিজের মাটিকে চিনবে, সে নিজের দেশকেও গভীরভাবে চিনতে শিখবে। যে প্রজন্ম কৃষকের শ্রমকে সম্মান করতে শিখবে, সে খাদ্যের মূল্য বুঝবে। আর যে প্রজন্ম প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শিখবে, তার হাতেই নিরাপদ থাকবে ভবিষ্যৎ পৃথিবী। আসুন, শিক্ষার সঙ্গে কৃষির, প্রযুক্তির সঙ্গে প্রকৃতির এবং আধুনিকতার সঙ্গে শেকড়ের সেতুবন্ধন তৈরি করি। মাধ্যমিক শিক্ষায় কৃষিশিক্ষা বাধ্যতামূলক করার মধ্য দিয়ে শুরু হোক সেই নতুন যাত্রা।

তথ্যসূত্র:

1. National Curriculum and Textbook Board (NCTB), Bangladesh. ২০২৬ সালের মাধ্যমিক শিক্ষাক্রম, বিষয়-কাঠামো ও পাঠ্যপুস্তক।

2. National Curriculum and Textbook Board (NCTB). Secondary Level Agriculture Studies Textbook.

3. UNESCO. (2026). Greening Every Curriculum: Guidance to Teach and Learn for Climate Action.

4. UNESCO. (2026). Education for Sustainable Development: What You Need to Know.

5. Wakiluzzaman, S. M. (2025). The Impact of Agricultural Science Studies on Family Farming and the Need for Compulsory Inclusion in Higher Secondary Education in Bangladesh. International Journal of Research and Innovation in Social Science, 9(3s), 1690–1695.

6. UNESCO. (2017). Education for Sustainable Development Goals: Learning Objectives.

 

লেখক পরিচিতি: নুর উদ্দীন মোঃ জাহাংগীর, BAgEd, MSS in Sociology & Anthropology, প্রধান লেখক ও সম্পাদক, কৃষি ও কৃষক ডট কম (krishiokrishok.com)  সাবেক সহকারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, ডিএই, কৃষি মন্ত্রণালয়।