ভূমিকা
বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। ফলে শুধু ধানের উৎপাদন বাড়ানো নয়, ধানের মাধ্যমে মানুষের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করাও এখন কৃষি গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। বিশেষ করে জিংক, প্রোটিন, আয়রণ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মতো পুষ্টি উপাদানসমৃদ্ধ ধানের জাত অপুষ্টি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) দীর্ঘদিন ধরে উচ্চফলনশীল ও পুষ্টিসমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবনে কাজ করছে। বর্তমানে ব্রির উদ্ভাবিত জাতগুলোর মধ্যে জিংকসমৃদ্ধ ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৬৪, ব্রি ধান৭২, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান১০০ ও ব্রি ধান১০২; উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৮৬ ও ব্রি ধান৯৬; এবং ভিটামিন-ই ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ ব্রি ধান১১৫ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব জাতের বৈশিষ্ট্য, মৌসুম ও অঞ্চলভেদে চাষাবাদ পদ্ধতি জানা থাকলে কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তারা উপযুক্ত জাত নির্বাচন করতে পারবেন।
জিংকসমৃদ্ধ ধানের জাত
জিংক মানবদেহের বৃদ্ধি, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজে গুরুত্বপূর্ণ একটি খনিজ উপাদান। বাংলাদেশের খাদ্যভিত্তিক পুষ্টি নিরাপত্তায় জিংকসমৃদ্ধ ধান বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ব্রি’র সরকারি তথ্য অনুযায়ী জিংকসমৃদ্ধ ধানের জাতগুলো হলো—ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৬৪, ব্রি ধান৭২, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান১০০ ও ব্রি ধান১০২।
ব্রি ধান৬২
ব্রি ধান৬২ একটি রোপা আমন মৌসুমের জিংকসমৃদ্ধ জাত। এতে প্রায় ২০ পিপিএম জিংক রয়েছে। স্বল্প জীবনকাল ও জিংকসমৃদ্ধ হওয়ায় এটি আমন মৌসুমে পুষ্টিসমৃদ্ধ ধান উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ব্রি’র তথ্য অনুযায়ী জাতটি বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় চাষের উপযোগী।
ব্রি ধান৭২
ব্রি ধান৭২-ও রোপা আমন মৌসুমের জিংকসমৃদ্ধ জাত। এতে প্রায় ২২.৮ পিপিএম জিংক রয়েছে। আমন মৌসুমে স্বল্প জীবনকালের জিংকসমৃদ্ধ ধান হিসেবে এটি কৃষকের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প।
ব্রি ধান৬৪
ব্রি ধান৬৪ একটি বোরো মৌসুমের জিংকসমৃদ্ধ জাত। এতে প্রায় ২৫.৫ পিপিএম জিংক রয়েছে। বোরো মৌসুমে সেচনির্ভর এলাকায় এ জাত চাষ করা যায়।
ব্রি ধান৭৪
ব্রি ধান৭৪ বোরো মৌসুমের জিংকসমৃদ্ধ জাত। এতে প্রায় ২৪.২ পিপিএম জিংক রয়েছে।
ব্রি ধান৮৪
ব্রি ধান৮৪ উচ্চফলনশীল জিংকসমৃদ্ধ বোরো জাত। এতে প্রায় ২৭.৬ পিপিএম জিংক রয়েছে এবং চাল লম্বা ও চিকন।
ব্রি ধান১০০
ব্রি ধান১০০ বোরো মৌসুমের জিংকসমৃদ্ধ জাত। এতে প্রায় ২৫.৭ পিপিএম জিংক রয়েছে।
ব্রি ধান১০২
ব্রি ধান১০২ বর্তমানে উল্লেখযোগ্য জিংকসমৃদ্ধ বোরো জাত। এতে প্রায় ২৫.৫ পিপিএম জিংক রয়েছে। ব্রি’র তথ্য অনুযায়ী এর গড় ফলন প্রায় ৮.১ টন/হেক্টর এবং অনুকূল পরিবেশ ও উপযুক্ত পরিচর্যায় প্রায় ৯.৬ টন/হেক্টর পর্যন্ত ফলন পাওয়া যেতে পারে। ব্রির হিসাবে এ জাতটি দৈনিক জিংকের চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণে সহায়ক হতে পারে।
উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ ধানের জাত
প্রোটিন শরীরের বৃদ্ধি, কোষ গঠন ও বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজে অপরিহার্য। সাধারণ চালের তুলনায় অধিক প্রোটিনসমৃদ্ধ ধান খাদ্যতালিকায় পুষ্টির মান বাড়াতে পারে।
ব্রি ধান৬৬
ব্রি ধান৬৬ একটি রোপা আমন মৌসুমের উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ জাত। একই সঙ্গে এটি খরাপ্রবণ এলাকার জন্য উপযোগী জাতগুলোর একটি।
ব্রি ধান৮৬
ব্রি ধান৮৬ একটি বোরো মৌসুমের স্বল্পমেয়াদি ও উচ্চফলনশীল উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ জাত। এতে প্রায় ১০.১ শতাংশ প্রোটিন রয়েছে। এর গড় ফলন প্রায় ৬.৫ টন/হেক্টর এবং জীবনকাল প্রায় ১৪০–১৪৫ দিন। জাতটি সারা দেশে চাষের উপযোগী বলে ব্রি উল্লেখ করেছে।
ব্রি ধান৯৬
ব্রি ধান৯৬ একটি বোরো মৌসুমের উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ জাত। এতে প্রায় ১০.৮ শতাংশ প্রোটিন রয়েছে। এর গড় ফলন প্রায় ৭ টন/হেক্টর এবং জীবনকাল ১৪০–১৪৫ দিন। ব্রি ধান২৮-এর পরিপূরক হিসেবে জাতটি গুরুত্বপূর্ণ এবং সারা দেশে চাষ করা যায়।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিন-ই সমৃদ্ধ ব্রি ধান১১৫
পুষ্টিসমৃদ্ধ ধানের নতুন সংযোজন হলো ব্রি ধান১১৫। ২০২৬ সালে জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদন পাওয়া এই জাতটি বাংলাদেশের প্রথম ভিটামিন-ই ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ উচ্চফলনশীল কালো চালের বোরো ধান হিসেবে ব্রি উল্লেখ করেছে। ব্রি ধান১১৫-এর ধানের দানা কালো এবং এতে ভিটামিন-ই-এর পরিমাণ প্রায় ১৪.৯৮ মিলিগ্রাম/কেজি। জাতটির গড় ফলন প্রায় ৭.৪ টন/হেক্টর এবং জীবনকাল প্রায় ১৪০–১৪২ দিন। ভিটামিন-ই একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এটি শরীরে অক্সিডেটিভ ক্ষতি মোকাবিলায় ভূমিকা রাখে। তবে কোনো একটি খাদ্যশস্যকে রোগ প্রতিরোধ বা চিকিৎসার একমাত্র উপায় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়; বরং সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে গ্রহণ করাই যুক্তিযুক্ত।
কোন মৌসুমে কোন জাত
বাংলাদেশের কৃষি পরিবেশ বিবেচনায় পুষ্টিসমৃদ্ধ জাত নির্বাচন করা যায় এভাবে—
রোপা আমন মৌসুম: ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৬৬ ও ব্রি ধান৭২।
বোরো মৌসুম: ব্রি ধান৬৪, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৬, ব্রি ধান৯৬, ব্রি ধান১০০, ব্রি ধান১০২ ও ব্রি ধান১১৫।
এখানে জাত নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু পুষ্টিগুণ নয়; জমির ধরন, সেচের সুবিধা, লবণাক্ততা, খরা, বন্যা, রোগবালাই এবং স্থানীয় বাজারের চাহিদাও বিবেচনা করা উচিত। ব্রি’র বর্তমান জাততালিকাতেও এসব জাতের মৌসুমভিত্তিক বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে।
পুষ্টিসমৃদ্ধ ধানের চাষাবাদ পদ্ধতি
জমি নির্বাচন
ধানের জমি নির্বাচন জাত ও মৌসুম অনুযায়ী করতে হবে। বোরো মৌসুমের জন্য সেচের সুবিধাযুক্ত মাঝারি নিচু থেকে মাঝারি উঁচু জমি উপযোগী। আমন মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ও পানি নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত জমি নির্বাচন করা উচিত। জমিতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে শিকড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
বীজ নির্বাচন
পুষ্টিসমৃদ্ধ জাতের ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ ও মানসম্মত বীজ ব্যবহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুমোদিত উৎস, ব্রি, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন বা বিশ্বস্ত বীজ উৎপাদন ও বিপণন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করা উচিত। এক জাতের সঙ্গে অন্য জাতের বীজ মিশে গেলে উৎপাদনের মান ও জাতের বিশুদ্ধতা নষ্ট হতে পারে।
বীজতলা তৈরি
বোরো মৌসুমে সাধারণত শীতকালীন পরিবেশে সুস্থ ও সবল চারা তৈরির জন্য উর্বর, উঁচু এবং সেচ-নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত জমিতে বীজতলা তৈরি করতে হয়। আমন মৌসুমে বৃষ্টিপাত ও স্থানীয় পরিবেশ অনুযায়ী বীজতলা তৈরি করতে হবে। বীজতলায় অতিরিক্ত পানি জমে থাকা এড়িয়ে চলতে হবে।
চারা রোপণ
সুস্থ ও সবল চারা নির্বাচন করে মূল জমিতে রোপণ করা উচিত। অতিরিক্ত বয়স্ক চারা রোপণ করলে কুশি উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জাতভেদে সুপারিশকৃত চারা বয়স ও রোপণ দূরত্ব অনুসরণ করা সবচেয়ে ভালো। পুষ্টিসমৃদ্ধ জাত হলেও সাধারণ ধানের মতোই সঠিক চারা ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
সার ব্যবস্থাপনা
পুষ্টিসমৃদ্ধ ধান চাষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শুধু জিংক বা প্রোটিনের জন্য অতিরিক্ত কোনো একটি সার প্রয়োগ না করে মাটি পরীক্ষাভিত্তিক সুষম সার ব্যবস্থাপনা করা। ইউরিয়া, টিএসপি/ডিএপি, এমওপি, জিপসাম ও প্রয়োজন অনুযায়ী জিংক সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। তবে সারের মাত্রা জমির উর্বরতা, জাত, মৌসুম ও সরকারি সার সুপারিশ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত। বিশেষ করে জিংকসমৃদ্ধ জাত চাষ করলেও অতিরিক্ত জিংক সার প্রয়োগ করে চালের জিংক বহুগুণ বাড়ানো যাবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। জাতগত বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি মাটি ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ।
সেচ ব্যবস্থাপনা
বোরো মৌসুমে পানি ব্যবস্থাপনা ফলনের অন্যতম প্রধান নিয়ামক। জমিতে সবসময় গভীর পানি ধরে রাখার পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দেওয়া এবং পানি শুকিয়ে যাওয়ার আগে পুনরায় সেচ দেওয়ার পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়। মাটির ধরন, আবহাওয়া ও গাছের বৃদ্ধির পর্যায় অনুযায়ী সেচের ব্যবধান নির্ধারণ করা উচিত। আমন মৌসুমে বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভর করে সেচের প্রয়োজন কম হতে পারে। তবে দীর্ঘস্থায়ী অনাবৃষ্টি হলে সম্পূরক সেচ প্রয়োজন হতে পারে।
আগাছা দমন
রোপণের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ আগাছার সঙ্গে ধানের প্রতিযোগিতা বেশি হয়। তাই সময়মতো আগাছা দমন করতে হবে। হাত দিয়ে নিড়ানি, যান্ত্রিক উইডার অথবা অনুমোদিত আগাছানাশক ব্যবহার করা যায়। রাসায়নিক আগাছানাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই অনুমোদিত মাত্রা ও সঠিক প্রয়োগকাল অনুসরণ করতে হবে।
রোগ ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা
পুষ্টিসমৃদ্ধ জাতকে রোগ-পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে মুক্ত রাখতে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM) অনুসরণ করা উচিত। নিয়মিত জমি পরিদর্শন করে মাজরা পোকা, বাদামি গাছফড়িং, পাতা মোড়ানো পোকা, রোগবালাই ইত্যাদির উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। অপ্রয়োজনে কীটনাশক ব্যবহার না করে প্রথমে সাংস্কৃতিক, যান্ত্রিক ও জৈবিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা উচিত। আক্রমণ অর্থনৈতিক ক্ষতির মাত্রা অতিক্রম করলে অনুমোদিত বালাইনাশক কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করা নিরাপদ।
ধান কাটার সময়
ধানের অধিকাংশ শিষের দানা পাকা ও হলুদ হলে এবং ধানের আর্দ্রতা উপযুক্ত পর্যায়ে এলে ফসল কাটতে হবে। অতিরিক্ত দেরি করলে ঝরে পড়া, পাখির ক্ষতি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ে। কালো চালের জাত ব্রি ধান১১৫-এর ক্ষেত্রে ধানের স্বাভাবিক কালো রং ও পরিপক্বতার লক্ষণ দেখে কাটার সময় নির্ধারণ করা উচিত।
মাড়াই, শুকানো ও সংরক্ষণ
পুষ্টিসমৃদ্ধ ধানের গুণগত মান ধরে রাখতে কাটার পর দ্রুত মাড়াই, পরিষ্কার ও যথাযথভাবে শুকানো জরুরি। অতিরিক্ত আর্দ্রতায় সংরক্ষণ করলে ছত্রাক ও মানহ্রাসের ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে কালো চালের জাতের ক্ষেত্রে শস্যের রং ও গুণগত বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে পরিচ্ছন্ন ও শুষ্ক পরিবেশে সংরক্ষণ করা উচিত।
অঞ্চলভিত্তিক জাত নির্বাচন
বাংলাদেশে একেক অঞ্চলের কৃষি পরিবেশ একেক রকম। তাই একই জাত সব এলাকায় সমান ফলন দেবে—এমন ধারণা করা ঠিক নয়। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল: বোরো মৌসুমে সেচনির্ভর এলাকায় ব্রি ধান৬৪, ৭৪, ৮৪, ১০০ ও ১০২ চাষ করা যেতে পারে। খরা ও সেচসংকটের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। মধ্যাঞ্চল: জমির ধরন ও সেচ সুবিধা অনুযায়ী জিংক ও প্রোটিনসমৃদ্ধ বোরো জাত চাষ করা যায়। দক্ষিণ ও উপকূলীয় অঞ্চল: লবণাক্ততা, জোয়ার-ভাটা ও পানি নিষ্কাশনের অবস্থা বিবেচনা করে জাত নির্বাচন করতে হবে। শুধু পুষ্টিগুণের কারণে লবণাক্ত জমিতে অনুপযোগী জাত নির্বাচন করা উচিত নয়। আমনপ্রধান এলাকা: ব্রি ধান৬২ ও ব্রি ধান৭২ জিংকসমৃদ্ধ আমন জাত হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
কৃষকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
পুষ্টিসমৃদ্ধ ধানের চাষে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন—
১. অনুমোদিত ও বিশুদ্ধ বীজ ব্যবহার করতে হবে।
২. জমির মাটি পরীক্ষা করে সার প্রয়োগ করা উচিত।
৩. জাতের মৌসুম ও স্থানীয় কৃষি পরিবেশ বিবেচনা করে চাষ করতে হবে।
৪. বোরো মৌসুমে সেচের নিশ্চয়তা ছাড়া পানি-নির্ভর জাত নির্বাচন করা উচিত নয়।
৫. রোগ ও পোকার আক্রমণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
৬. অতিরিক্ত ইউরিয়া বা জিংক সার প্রয়োগ করা যাবে না।
৭. ধান কাটার পর দ্রুত শুকিয়ে নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।
৮. পুষ্টিসমৃদ্ধ ধানকে শুধু উচ্চমূল্যের বিশেষ চাল হিসেবে নয়, স্থানীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার অংশ হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে।
উপসংহার
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার পরবর্তী ধাপ হলো পুষ্টি নিরাপত্তা। এ লক্ষ্য পূরণে ব্রি উদ্ভাবিত জিংকসমৃদ্ধ, উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ ধানের জাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে ব্রি’র সরকারি তথ্য অনুযায়ী জিংকসমৃদ্ধ জাতগুলোর মধ্যে ব্রি ধান৬২, ৬৪, ৭২, ৭৪, ৮৪, ১০০ ও ১০২; উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ জাতের মধ্যে ব্রি ধান৬৬, ৮৬ ও ৯৬ এবং নতুন সংযোজন হিসেবে ভিটামিন-ই ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ কালো চালের ব্রি ধান১১৫ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে ব্রি ধান১১৫ বাংলাদেশের পুষ্টিসমৃদ্ধ ধান গবেষণায় একটি নতুন দিগন্ত তৈরি করেছে। জাতটির কালো চাল ও ভিটামিন-ই সমৃদ্ধ বৈশিষ্ট্য এটিকে প্রচলিত সাদা চালের তুলনায় বিশেষ বাজার সম্ভাবনা দিতে পারে। তবে কৃষকের জন্য জাত নির্বাচন করতে হবে ফলন, উৎপাদন খরচ, জমির উপযোগিতা, সেচ সুবিধা এবং বাজার চাহিদা বিবেচনা করে। সঠিক জাত নির্বাচন, মানসম্মত বীজ, সুষম সার, পানি ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা এবং যথাযথ সংগ্রহ-সংরক্ষণ প্রযুক্তি অনুসরণ করা গেলে পুষ্টিসমৃদ্ধ ধান বাংলাদেশের কৃষি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত হতে পারে।
তথ্যসূত্র
- বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)—জাত ও পুষ্টিসমৃদ্ধ ধানের সরকারি তথ্য।
- BRRI—জীবপ্রযুক্তি বিভাগের সাফল্য ও উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ ধানের তথ্য।
- BRRI—উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের সাফল্য ও জিংকসমৃদ্ধ জাতের তথ্য।
- BRRI—ব্রি ধান১১৫-এর অনুমোদন ও ভিটামিন-ই/অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সম্পর্কিত তথ্য।