ভূমিকা
বাংলাদেশের কৃষি একদিকে যেমন দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির প্রধান ভিত্তি, অন্যদিকে তেমনি জলবায়ু পরিবর্তন, আবাদি জমির সংকোচন, পানি সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং কৃষিশ্রমিকের পরিবর্তিত বাস্তবতার কারণে ক্রমেই নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি নিরাপদ, বৈচিত্র্যময় ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করাও এখন জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে খাদ্যশস্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ শুধু বেশি ধান উৎপাদন নয়; বরং কম জমি, কম পানি ও পরিবর্তিত জলবায়ুর মধ্যে কম খরচে, নিরাপদ, পুষ্টিকর এবং টেকসইভাবে বেশি খাদ্য উৎপাদন করা। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে প্রচলিত কৃষির পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ সম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, আকস্মিক বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ, লবণাক্ততা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষি উৎপাদনের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে। FAO-এর তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক অভিঘাত খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের কৃষির সামনে মূল প্রশ্ন হলো—বাড়তি মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা কীভাবে পূরণ করা হবে এবং একই সঙ্গে কৃষিকে কীভাবে জলবায়ু সহনশীল ও টেকসই করা যাবে। উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের এগোতে হবে Climate-Smart Agriculture বা জলবায়ু স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবস্থাপনার দিকে।
খাদ্য নিরাপত্তা থেকে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা
একসময় বাংলাদেশের কৃষিনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার আলোচনায় ধান উৎপাদন এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। ধান নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থার কেন্দ্রীয় ফসল। তবে একজন মানুষের সুস্থ জীবনযাপনের জন্য শুধু ভাত যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন শাকসবজি, ডাল, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ফল, তেলবীজসহ বৈচিত্র্যময় খাদ্য। অর্থাৎ ভবিষ্যতের কৃষিকে “Food Security” থেকে “Food and Nutrition Security”-এর দিকে যেতে হবে। FAO-এর বাংলাদেশবিষয়ক অগ্রাধিকারেও উৎপাদনশীল ও বৈচিত্র্যময় কৃষি, স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাদ্য এবং জলবায়ু সহনশীল ও কম-কার্বনভিত্তিক টেকসই কৃষিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কারণে কৃষির উৎপাদন পরিকল্পনায় শুধু “কত টন খাদ্য উৎপাদিত হলো”—এই হিসাব যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে সেই খাদ্যে মানুষের প্রয়োজনীয় পুষ্টি কতটা নিশ্চিত হচ্ছে।
কেন জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি জরুরি
বাংলাদেশের কৃষির বড় বৈশিষ্ট্য হলো সীমিত জমিতে উচ্চ ফসল নিবিড়তা। একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল উৎপাদনের ফলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এর সঙ্গে মাটি, পানি ও পরিবেশের ওপর চাপও বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই চাপ আরও বাড়ছে। কোথাও অতিরিক্ত পানি, কোথাও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, কোথাও লবণাক্ততা, আবার কোথাও খরা ও তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি কৃষির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই আগামী দিনের কৃষিতে এমন প্রযুক্তি প্রয়োজন, যা একই সঙ্গে—
- উৎপাদন বাড়াবে;
- পানি ও সার সাশ্রয় করবে;
- মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করবে;
- জলবায়ুজনিত ঝুঁকি কমাবে;
- কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাবে;
- কৃষকের আয় বাড়াবে;
- খাদ্যের পুষ্টিমান ও নিরাপত্তা উন্নত করবে।
FAO-এর Climate-Smart Agriculture ধারণার মূল লক্ষ্যও হলো খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষিকে খাপ খাওয়ানো এবং যেখানে সম্ভব কৃষির পরিবেশগত প্রভাব কমানো।
জলবায়ু সহনশীল জাত হবে ভবিষ্যতের কৃষির প্রথম প্রযুক্তি
বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর প্রযুক্তিগুলোর একটি হলো স্ট্রেস-সহনশীল ফসলের জাত। খরাপ্রবণ এলাকায় খরা সহনশীল জাত, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা সহনশীল জাত, আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকায় জলমগ্নতা সহনশীল জাত এবং স্বল্পমেয়াদি জাত কৃষকের ঝুঁকি কমাতে পারে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য হলো পরিবর্তিত জলবায়ু ও ক্রমহ্রাসমান সম্পদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কৃষকবান্ধব ধানের জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলোতেও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উপযুক্ত জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। ভবিষ্যতে শুধু উচ্চফলনশীল জাত নয়, উচ্চফলনশীল + পুষ্টিসমৃদ্ধ + জলবায়ু সহনশীল + স্বল্পমেয়াদি + রোগ-পোকা সহনশীল জাত উদ্ভাবন ও কৃষকের মাঠে দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে।
কম পানিতে বেশি উৎপাদন: পানি সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি
বাংলাদেশের কৃষিতে সেচ একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন উপকরণ। বিশেষ করে বোরো ধান উৎপাদনে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা অনেক এলাকায় বেশি। এ কারণে ভবিষ্যতের কৃষিতে “প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ” ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। ধানের ক্ষেত্রে Alternate Wetting and Drying বা AWD পদ্ধতি, সবজি ও ফলের ক্ষেত্রে ড্রিপ সেচ, স্প্রিংকলার, পাইপের মাধ্যমে পানি সরবরাহ এবং সেন্সরভিত্তিক সেচ ব্যবস্থাপনা পানি অপচয় কমাতে পারে। জলবায়ু স্মার্ট কৃষি বিষয়ক বাংলাদেশের নীতিগত কাঠামোতেও AWD, ড্রিপ সেচ, মালচিং, কম চাষ এবং buried pipe-এর মতো পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে সৌরশক্তিচালিত পাম্প, IoT সেন্সর এবং স্বয়ংক্রিয় সেচ নিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে ব্যবহার করে কৃষিতে পানি ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় আরও বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা না করলে টেকসই কৃষি সম্ভব নয়
উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে মাটির জৈব পদার্থ কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই টেকসই কৃষির অন্যতম ভিত্তি হলো মাটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা। মাটির পরীক্ষার ভিত্তিতে সার প্রয়োগ, জৈবসার ও কম্পোস্ট ব্যবহার, ফসলের অবশিষ্টাংশের সঠিক ব্যবস্থাপনা, সবুজ সার, ডালজাতীয় ফসলের অন্তর্ভুক্তি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চাষ পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে।“যত বেশি সার, তত বেশি ফলন”—এই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের যেতে হবে “সঠিক সার, সঠিক মাত্রা, সঠিক সময় ও সঠিক স্থানে প্রয়োগ”-এর দিকে। মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকলে পানি ও সার ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ে, ফসলের উৎপাদনশীলতা স্থিতিশীল থাকে এবং কৃষকের ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
ফসল বৈচিত্র্যই পুষ্টি নিরাপত্তার অন্যতম চাবিকাঠি
বাংলাদেশের কৃষিতে ধানের আধিপত্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও পুষ্টি নিরাপত্তার জন্য কৃষিকে আরও বৈচিত্র্যময় করতে হবে। একটি জমিতে শুধু ধান উৎপাদনের পরিবর্তে উপযুক্ত এলাকায় ধান-ডাল, ধান-সরিষা, ধান-সবজি, ভুট্টা-ডাল, ফল-সবজি কিংবা কৃষি-প্রাণিসম্পদ সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। বাড়ির আঙিনা, পতিত জমি, রাস্তার পাশের উপযুক্ত জায়গা, ছাদ ও বারান্দাতেও নিরাপদ সবজি ও ফল উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে শাকসবজি, ডাল, ফল, মসলা ও তেলবীজের উৎপাদন বৃদ্ধি খাদ্যব্যবস্থাকে বৈচিত্র্যময় করার পাশাপাশি পুষ্টি ঘাটতি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
স্মার্ট কৃষিতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার
আগামী দিনের কৃষিতে মোবাইল ফোন, GPS, GIS, ড্রোন, IoT সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং স্যাটেলাইট তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মাটির আর্দ্রতা সেন্সর কৃষককে জানাতে পারে কখন সেচ প্রয়োজন। আবহাওয়া তথ্য ঝড়, অতিবৃষ্টি বা তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা সম্পর্কে আগাম সতর্ক করতে পারে। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে রোগ-পোকার ছবি শনাক্ত করে প্রাথমিক পরামর্শ দেওয়া সম্ভব। স্যাটেলাইট তথ্যের মাধ্যমে বড় এলাকায় ফসলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। এভাবে কৃষি ধীরে ধীরে অনুমাননির্ভর কৃষি থেকে তথ্যনির্ভর কৃষিতে রূপান্তরিত হতে পারে। তবে প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে—প্রযুক্তি যেন কৃষকের জন্য জটিলতা না বাড়ায়। বরং সহজ ভাষায়, কম খরচে এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রযুক্তি দিতে হবে।
সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা হবে টেকসই কৃষির ভিত্তি
অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার শুধু উৎপাদন খরচ বাড়ায় না, পরিবেশ ও কৃষি প্রতিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই Integrated Pest Management বা IPM আরও বিস্তৃত করতে হবে। রোগ-পোকা পর্যবেক্ষণ, সহনশীল জাত, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ, যান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, ফেরোমোন ফাঁদ, আলোক ফাঁদ এবং প্রয়োজন হলে অর্থনৈতিক ক্ষতির মাত্রা বিবেচনা করে অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে। এতে কৃষকের খরচ কমার পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের সম্ভাবনাও বাড়বে।
উপকূল, চর, হাওর ও বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য এক প্রযুক্তি নয়
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো কৃষির বৈচিত্র্য। কিন্তু এ বৈচিত্র্যের কারণে সারা দেশে একই কৃষি প্রযুক্তি কার্যকর হবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা মোকাবিলায় উঁচু বেড, মালচিং, মিষ্টি পানির সংরক্ষণ, লবণ সহনশীল জাত ও উপযোগী ফসল নির্বাচন প্রয়োজন। চরাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি ফসল, বালুময় মাটির উপযোগী ফসল ও পানি ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। হাওর এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বোরো জাত, দ্রুত কর্তন ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা কৃষকের ঝুঁকি কমাতে পারে। বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সাশ্রয়ী সেচ, মাটিতে জৈব পদার্থ বৃদ্ধি, মালচিং এবং খরা সহনশীল ফসলের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন স্থানভিত্তিক জলবায়ু স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি।
কৃষকের আয় ছাড়া টেকসই কৃষি সম্ভব নয়
কৃষি প্রযুক্তি যত আধুনিকই হোক, কৃষক যদি লাভ না পান, তাহলে সেই প্রযুক্তি দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকবে না। তাই কৃষি পরিকল্পনায় উৎপাদনের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজনকে গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষককে জানতে হবে—কোন ফসলের চাহিদা আছে, কখন বাজারে সরবরাহ কম থাকে, কোন পণ্যের মূল্য সংযোজন করা যায় এবং কীভাবে সরাসরি বাজারজাত করা যায়। বিশেষ করে নারী ও যুবকদের কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুললে কৃষির সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।
কৃষির নতুন মডেল: “কম সম্পদে বেশি ফলন, কম ঝুঁকিতে বেশি আয়”
বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতের কৃষি মডেলকে কয়েকটি মূল নীতির ওপর দাঁড় করানো যেতে পারে। প্রথমত, জলবায়ু সহনশীল জাত। দ্বিতীয়ত, মাটি ও পানি সংরক্ষণ। তৃতীয়ত, ফসল বৈচিত্র্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা। চতুর্থত, পানি ও সার ব্যবহারের দক্ষতা। পঞ্চমত, IPM ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন। ষষ্ঠত, ডিজিটাল ও স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি। সপ্তমত, কৃষিপণ্যের বাজার সংযোগ ও মূল্য সংযোজন। অষ্টমত, কৃষক প্রশিক্ষণ ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রযুক্তি সম্প্রসারণ। এই আটটি বিষয়কে একত্রে বাস্তবায়ন করতে পারলে কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্র থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে পুষ্টি, কর্মসংস্থান, পরিবেশ সংরক্ষণ ও গ্রামীণ অর্থনীতির টেকসই ভিত্তি।
গবেষণা, সম্প্রসারণ ও কৃষকের মধ্যে সংযোগ আরও শক্তিশালী করতে হবে
বাংলাদেশে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে বিভিন্ন জলবায়ু সহনশীল জাত ও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। BRRI-এর গবেষণার লক্ষ্যগুলোর মধ্যে জলবায়ুবান্ধব ও সম্পদ-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং কৃষকের কাছে প্রযুক্তি হস্তান্তর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে রয়েছে। কিন্তু শুধু গবেষণাগারে প্রযুক্তি উদ্ভাবন করলেই হবে না। প্রযুক্তির মাঠপর্যায়ের গ্রহণযোগ্যতা, কৃষকের খরচ, লাভ, ঝুঁকি এবং স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনা করে সম্প্রসারণ করতে হবে। এখানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি খাত, এনজিও, কৃষক সংগঠন ও স্থানীয় সরকারকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
ভবিষ্যতের কৃষি হবে “ডেটা + বিজ্ঞান + স্থানীয় জ্ঞান”-এর সমন্বয়
কৃষকের বহু বছরের স্থানীয় জ্ঞান বাংলাদেশের কৃষির বড় সম্পদ। আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে সেই জ্ঞানকে প্রতিস্থাপন নয়, বরং আরও কার্যকর করতে হবে। একজন কৃষক জানেন তার জমির পানি কোথায় জমে, কোন মৌসুমে কোন পোকা বেশি হয়, কোন ফসল স্থানীয় বাজারে ভালো বিক্রি হয়। অন্যদিকে আধুনিক প্রযুক্তি দিতে পারে মাটির তথ্য, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, রোগ-পোকার সতর্কতা এবং বাজারের তথ্য। এই দুই জ্ঞানকে একত্রিত করাই হতে পারে ভবিষ্যতের স্মার্ট কৃষির অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি।
উপসংহার
বাংলাদেশের কৃষির সামনে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—ক্রমবর্ধমান মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন করতে হবে, অথচ কৃষিজমি, পানি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন কৃষির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই বাস্তবতায় শুধুমাত্র উৎপাদন বাড়ানোর প্রচলিত পদ্ধতি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন কৃষি ব্যবস্থা, যা একই সঙ্গে উৎপাদনশীল, লাভজনক, পুষ্টিসমৃদ্ধ, জলবায়ু সহনশীল এবং পরিবেশগতভাবে টেকসই। সেই কৃষির ভিত্তি হবে জলবায়ু সহনশীল জাত, পানি সাশ্রয়ী সেচ, মাটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, ফসল বৈচিত্র্য, IPM, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, ডিজিটাল কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আধুনিক যান্ত্রিকীকরণ এবং বাজারভিত্তিক উৎপাদন। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে কৃষিতে প্রযুক্তির শক্তি দিয়ে খাদ্য উৎপাদনে বড় অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখন সময় এসেছে সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে “খাদ্য নিরাপত্তা” থেকে “খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা” এবং “উৎপাদনমুখী কৃষি” থেকে “জলবায়ু সহনশীল ও টেকসই স্মার্ট কৃষি”-তে রূপান্তরের। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—কম জমিতে বেশি নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য, কম পানিতে বেশি উৎপাদন, কম খরচে বেশি কৃষকের আয় এবং কম পরিবেশগত ক্ষতিতে দীর্ঘমেয়াদি কৃষি উৎপাদন। এটাই হতে পারে আগামী দিনের বাংলাদেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।
তথ্যসূত্র
· ১. FAO Bangladesh — খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, টেকসই কৃষি এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি বিষয়ে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার।
· ২. FAO, Climate-Smart Agriculture — খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় Climate-Smart Agriculture-এর ধারণা ও নীতিমালা।
· ৩. FAO Bangladesh Emergency and Resilience — বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি ও জলবায়ু ঝুঁকির বর্তমান প্রেক্ষাপট।
· ৪. বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) — ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, সীমিত জমি এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা।
· ৫. বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) — টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ুবান্ধব ধানের জাত ও সম্পদ-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি।
· ৬. বাংলাদেশের Climate-Smart Agriculture নীতিগত কাঠামো — স্ট্রেস-সহনশীল জাত, ফসল বৈচিত্র্য, precision agriculture, AWD, ড্রিপ সেচ ও মালচিংসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি।