জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কম খরচে লাভজনক সবজি চাষের আধুনিক মডেল

বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন কৃষকের মাঠে সরাসরি দৃশ্যমান। কোথাও খরা তীব্র তাপ, কোথাও অতিবৃষ্টি জলাবদ্ধতা, আবার উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসসব মিলিয়ে প্রচলিত পদ্ধতিতে সবজি চাষ ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। অথচ সারা বছর বাজারে সবজির চাহিদা থাকায় পরিকল্পিতভাবে জলবায়ু সহনশীল সবজি উৎপাদন করা গেলে ছোট কৃষকও তুলনামূলক কম বিনিয়োগে ভালো আয় করতে পারেন। এই বাস্তবতায় প্রয়োজন এমন একটি কম খরচে অধিক লাভজনক সবজি চাষের মডেল, যা শুধু একটি নির্দিষ্ট এলাকার জন্য নয়; বরং বাংলাদেশের উপকূলীয়, খরাপ্রবণ, চরাঞ্চল, জলাবদ্ধ এবং বন্যাপ্রবণ এলাকায় স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী কিছুটা পরিবর্তন করে ব্যবহার করা যায়। এই মডেলের মূল দর্শন হলোকম পানি, কম ঝুঁকি, কম অপচয় এবং এক জমি থেকে একাধিকবার আয়।

জলবায়ু সহনশীল সবজি চাষ মডেলের প্রয়োজনীয়তা

বাংলাদেশের কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব একেক অঞ্চলে একেক রকম। উপকূলীয় এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততা বাড়ে এবং বর্ষায় অতিবৃষ্টি জলাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে বরেন্দ্র অঞ্চলে খরা, উচ্চ তাপমাত্রা সেচের পানির সংকট বড় সমস্যা। হাওর নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ফসলের ক্ষতি করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা, বন্যা ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সবজি অন্যান্য ফসলের উল্লেখযোগ্য ফলন ক্ষতি হতে পারে। একই গবেষণায় সরজন পদ্ধতি, ভাসমান কৃষি, বাড়ির আঙিনায় চাষ এবং লবণ খরা সহনশীল জাতকে সম্ভাবনাময় অভিযোজন কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই একই নিয়মে সব জায়গায় সবজি চাষ না করে এলাকার জলবায়ু ঝুঁকি অনুযায়ী উৎপাদন মডেল পরিবর্তন করতে হবে।

প্রস্তাবিত সবজি চাষ মডেল

একজন ক্ষুদ্র বা মাঝারি কৃষকের জন্য এই মডেলটি প্রায় ২০৩৩ শতক জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা যেতে পারে। জমির আকার কম-বেশি হলে একই অনুপাত অনুসরণ করা যাবে। মডেলটির প্রধান উপাদান হলোউঁচু বেড + নালা + মালচিং + জৈবসার + পানি সাশ্রয়ী সেচ + পর্যায়ক্রমিক সবজি + রোগবালাই সমন্বিত ব্যবস্থাপনা + বাজারভিত্তিক জাত নির্বাচন। এর উদ্দেশ্য হলো একটি ফসল নষ্ট হলেও যেন পুরো বিনিয়োগ নষ্ট না হয়।

প্রথম ধাপ: জমিকে জলবায়ু সহনশীল করে তৈরি করা

জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সবজি চাষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জমির পানি ব্যবস্থাপনা। বর্ষায় অতিরিক্ত পানি বের করে দিতে এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি ধরে রাখতে জমিকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে উঁচু বেড মাঝখানে নালা থাকে। উঁচু বেডে সবজি লাগানো হবে এবং নালা দিয়ে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন করা হবে। প্রয়োজন হলে নালা থেকেই সেচের পানি সরবরাহ করা যাবে। উপকূলীয় এলাকায় আরও উঁচু বেড তৈরি করে তার ওপর সবজি চাষ করা যেতে পারে। যেখানে জলাবদ্ধতা বেশি, সেখানে সরজন পদ্ধতি বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। এই পদ্ধতিতে উঁচু নিচু অংশ সমন্বিত করে একই জমিতে সবজি, ফলগাছ এবং প্রয়োজনে মাছ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়।  বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সরজন পদ্ধতিতে সারা বছর সবজি উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণাও হয়েছে।

দ্বিতীয় ধাপ: কম খরচে বেড তৈরি

বেড তৈরির জন্য অতিরিক্ত মাটি বাইরে থেকে কেনার প্রয়োজন নেই। জমির নালা কাটার মাটি দিয়েই বেড উঁচু করা যায়। প্রতিটি বেড এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে সেচের পানি গাছের গোড়ায় পৌঁছায় কিন্তু পানি দীর্ঘ সময় জমে না থাকে। বেড তৈরির সময় পচা গোবর, কম্পোস্ট, ভার্মিকম্পোস্ট বা অন্যান্য নিরাপদ জৈব উপাদান মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া যেতে পারে। জৈব পদার্থ মাটির গঠন পানি ধারণক্ষমতা উন্নত করতে সাহায্য করে। তবে কাঁচা গোবর সরাসরি গাছের গোড়ায় ব্যবহার না করে ভালোভাবে পচানো গোবর বা কম্পোস্ট ব্যবহার করাই নিরাপদ।

তৃতীয় ধাপ: একই জমিতে একাধিক সবজি

লাভজনক মডেলের মূল কৌশল হলো একটি মাত্র ফসলের ওপর নির্ভর না করা। উদাহরণ হিসেবে একটি মৌসুমে জমির এক অংশে লাউ বা মিষ্টিকুমড়া, অন্য অংশে শসা বা বরবটি, আরেক অংশে ঢেঁড়স, মরিচ বা বেগুন চাষ করা যেতে পারে। মাচায় লাউ, শসা, ঝিঙা বা করলা চাষ করলে নিচের জমি অন্য ফসলের জন্য ব্যবহার করা যায়। এতে জমির উল্লম্ব স্থানও কাজে লাগে। তবে একই জমিতে অনেক ফসল একসঙ্গে লাগানোর আগে প্রতিটি ফসলের আলো, পানি, সার রোগবালাইয়ের চাহিদা বিবেচনা করতে হবে।

চতুর্থ ধাপ: দ্রুত ফলনশীল পর্যায়ক্রমিক ফসল

জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি একক ফসলের পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি পর্যায়ক্রমিক সবজি বেশি নিরাপদ। যেমনলালশাক, ডাঁটাশাক, পালংশাক, ধনেপাতা, ঢেঁড়স, শিম, বরবটি, শসা ইত্যাদি স্থানীয় বাজার মৌসুম অনুযায়ী নির্বাচন করা যেতে পারে। একসঙ্গে পুরো জমিতে বীজ বপন না করে ১৫ দিন ব্যবধানে কয়েক ধাপে বপন করা যেতে পারে। এতে সবজি একসঙ্গে বাজারে না গিয়ে পর্যায়ক্রমে বাজারজাত করা সম্ভব হয়। ফলে দাম কমে গেলে পুরো ফসল একই সময়ে কম দামে বিক্রি করার ঝুঁকি কমে।

উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকায় বিশেষ মডেল

উপকূলীয় এলাকায় সাধারণ সবজি চাষের পাশাপাশি লবণাক্ততা সহনশীল বা তুলনামূলক সহনশীল ফসল নির্বাচন করতে হবে। মাটির সেচের পানির লবণাক্ততা আগে পরীক্ষা করা সম্ভব হলে সবচেয়ে ভালো। মিষ্টিকুমড়া, কিছু কুমড়াজাতীয় ফসল, ঢেঁড়স, শাকজাতীয় স্থানীয়ভাবে পরীক্ষিত সহনশীল জাত পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্বাচন করা যেতে পারে। উপকূলীয় এলাকায় মিষ্টিকুমড়া নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় BARI Misti Kumra-1-এর লবণাক্ত এলাকায় ভালো ফলনের সম্ভাবনা পাওয়া গেছে; পরীক্ষায় এর ফলন ৩৩.৮৭ টন/হেক্টর পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়েছিল। তবে গবেষণার ফলনকে সরাসরি কৃষকের বাণিজ্যিক ফলন ধরে নেওয়া উচিত নয়স্থানীয় লবণাক্ততা, ব্যবস্থাপনা বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী ফলন পরিবর্তিত হবে। লবণাক্ত এলাকায় মালচিং, উঁচু বেড, জৈব পদার্থ এবং নিরাপদ মিষ্টি সেচের পানি ব্যবহার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। উপকূলীয় মাটির লবণাক্ততা ব্যবস্থাপনায় মালচিং, জমি সমতলকরণ, জৈব পদার্থ প্রয়োগ উপযুক্ত ফসল নির্বাচনের গুরুত্ব গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বরেন্দ্র খরাপ্রবণ এলাকায় মডেল

বরেন্দ্র অন্যান্য খরাপ্রবণ এলাকায় মডেলের মূল লক্ষ্য হবে কম পানিতে বেশি উৎপাদন এখানে ড্রিপ সেচ বা কম পানি অপচয়কারী সেচব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে। গাছের গোড়ায় প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পৌঁছানো হবে, পুরো জমি ভিজিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। বেডের ওপর খড়, শুকনো পাতা, ফসলের অবশিষ্টাংশ বা উপযুক্ত জৈব মালচ ব্যবহার করলে মাটির পানি দ্রুত শুকিয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমানো যায়। অঞ্চলে ফসল নির্বাচনের সময় খরা সহনশীল স্বল্পমেয়াদি জাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। বাংলাদেশের জলবায়ু-সহনশীল কৃষি পরিকল্পনাতেও খরাপ্রবণ এলাকায় পানি ব্যবস্থাপনা, ড্রিপ স্প্রিংকলার সেচ এবং উপযোগী জাত ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বন্যা জলাবদ্ধ এলাকায় মডেল

নিম্নাঞ্চল বা জলাবদ্ধ এলাকায় প্রধান সমস্যা হলো অতিরিক্ত পানি। এখানে মাটিতে সরাসরি সবজি লাগানোর পরিবর্তে উঁচু বেড, মাচা অথবা ভাসমান বেড ব্যবহার করা যেতে পারে। যেখানে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে, সেখানে ভাসমান কৃষি বিশেষভাবে বিবেচনা করা যায়। ভাসমান বেডে বিভিন্ন শাকসবজি উৎপাদন বাংলাদেশের জলাবদ্ধ বন্যাপ্রবণ এলাকায় অভিযোজনের একটি পরিচিত পদ্ধতি। আর যেখানে স্বল্পমেয়াদি জলাবদ্ধতা হয়, সেখানে নালা-সহ উঁচু বেডই তুলনামূলক কম খরচের সমাধান।

পানি ব্যবস্থাপনার কৌশল

এই মডেলে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলোগাছের প্রয়োজন বুঝে পানি, অভ্যাস অনুযায়ী নয়। মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকলে সেচ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। মাটির ওপরের অংশ শুকিয়ে গেলেই সবসময় গভীর সেচ প্রয়োজন হয় না। কম খরচের মাটির আর্দ্রতা সেন্সর ব্যবহার করা গেলে কৃষক আরও নির্ভুলভাবে সেচের সময় নির্ধারণ করতে পারেন। বড় খামারে IoT সেন্সর ব্যবহার করে মাটির আর্দ্রতা মোবাইল ফোনে পর্যবেক্ষণ এবং নির্দিষ্ট সীমার নিচে নামলে সেচের ব্যবস্থা করা সম্ভব। তবে ছোট কৃষকের ক্ষেত্রে শুরুতেই ব্যয়বহুল স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা না করে মালচিং + ড্রিপ/পাইপ সেচ + নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ দিয়েই শুরু করা বেশি অর্থনৈতিক হতে পারে।

সার ব্যবস্থাপনায় কম খরচের কৌশল

সবজি চাষে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার করলে খরচ বাড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। প্রথমে মাটি পরীক্ষা করা সবচেয়ে ভালো। এরপর মাটির উর্বরতা অনুযায়ী সার প্রয়োগ করতে হবে। জৈবসার ব্যবহার করে মাটির স্বাস্থ্য উন্নত করার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী রাসায়নিক সার সুষমভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে। বেশি সার = বেশি ফলন”—এই ধারণা বাদ দিতে হবে। ফসলের বয়স বৃদ্ধি পর্যায় অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করাই অর্থনৈতিকভাবে বেশি কার্যকর।

রোগ পোকা ব্যবস্থাপনায় আইপিএম

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তাপমাত্রা আর্দ্রতার পরিবর্তন ঘটায় অনেক পোকা রোগের আক্রমণের মাত্রা পরিবর্তিত হতে পারে। তাই সবজিতে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা IPM অনুসরণ করা উচিত। প্রথমে রোগাক্রান্ত গাছ বা অংশ শনাক্ত করতে হবে। আক্রান্ত পাতা বা ফল দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে। জমি পরিষ্কার রাখতে হবে এবং অতিরিক্ত সেচ এড়িয়ে চলতে হবে। হলুদ স্টিকি ট্র্যাপ, ফেরোমোন ট্র্যাপ, আলোক ফাঁদসহ উপযোগী যান্ত্রিক জৈবিক পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহার প্রয়োজন হলে ফসল বালাই অনুযায়ী অনুমোদিত পণ্য, সঠিক মাত্রা, সঠিক সময় এবং অপেক্ষাকাল মেনে ব্যবহার করতে হবে। নির্বিচারে কীটনাশক ব্যবহার করলে উৎপাদন খরচ, পরিবেশ খাদ্যনিরাপত্তাতিনটিই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

মাচা পদ্ধতিতে অতিরিক্ত আয়

লাউ, শসা, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, করলা অন্যান্য লতানো সবজির জন্য বাঁশ বা স্থানীয় উপকরণ দিয়ে মাচা তৈরি করা যায়। মাচা তৈরিতে স্থানীয় বাঁশ, খুঁটি দড়ি ব্যবহার করলে প্রাথমিক বিনিয়োগ কম রাখা সম্ভব। এর বড় সুবিধা হলোগাছের লতা ওপরে উঠে যায় এবং নিচের জমি অন্য ফসলের জন্য ব্যবহার করা যায়। ফলে একই জমি থেকে উৎপাদন আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।

বাজার আগে, চাষ পরে

অধিক লাভজনক সবজি চাষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অবহেলিত বিষয় হলো বাজার পরিকল্পনা কৃষককে বীজ কেনার আগেই জানতে হবেকোন সবজির চাহিদা বেশি, কোন সময়ে দাম তুলনামূলক ভালো থাকে, স্থানীয় বাজারে পাইকার, খুচরা বিক্রেতা আড়তদারের চাহিদা কী, কোন সবজি দ্রুত নষ্ট হয়, কোন সবজি কয়েক দিন সংরক্ষণ করা যায়, এই তথ্যের ভিত্তিতে ফসল নির্বাচন করতে হবে। একই সময়ে এলাকার অনেক কৃষক একই সবজি চাষ করলে বাজারে সরবরাহ বেড়ে দাম পড়ে যেতে পারে। তাই কৃষক দল বা সমবায়ের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমিক উৎপাদন যৌথ বিপণন করা যেতে পারে।

কম খরচে লাভ বাড়ানোর মূল কৌশল

এই মডেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো খরচ কমানো। তার জন্যনিজের উৎপাদিত মানসম্মত বীজ যেখানে সম্ভব সংরক্ষণ করতে হবে। স্থানীয় উপকরণ দিয়ে মাচা তৈরি করতে হবে। খামারের জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট তৈরি করতে হবে। পাইপ বা ড্রিপের মাধ্যমে পানি দিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় কীটনাশক ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। ফসল পর্যায়ক্রমে লাগাতে হবে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা অনুযায়ী জাত নির্বাচন করতে হবে। সম্ভব হলে কৃষক দল গঠন করে বীজ, সার অন্যান্য উপকরণ যৌথভাবে কিনতে হবে। এতে এককভাবে কেনাকাটার তুলনায় খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

একটি বাস্তবসম্মত আয় পরিকল্পনা

এই মডেলে নির্দিষ্ট লাভের অঙ্ক আগে থেকে বলা ঠিক নয়, কারণ সবজির দাম, ফলন, শ্রমের মূল্য, জমির ভাড়া, পরিবহন ব্যয় এবং রোগ-পোকার আক্রমণ অঞ্চল মৌসুমভেদে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। তবে লাভের ঝুঁকি কমানোর কৌশল নির্ধারণ করা যায়। ২০৩৩ শতক জমিতে পুরো জমিতে একই ফসল না করেএক অংশে দ্রুত ফলনশীল শাক, এক অংশে স্বল্পমেয়াদি সবজি, এক অংশে দীর্ঘমেয়াদি লতানো সবজি, এবং একটি অংশে বাজারদর ভালো এমন উচ্চমূল্যের সবজিএভাবে ভাগ করা যেতে পারে। ফলে একটি ফসলের দাম পড়ে গেলেও অন্য ফসল থেকে আয় আসবে।

জলবায়ু ঝুঁকির বিরুদ্ধেতিন স্তরের সুরক্ষা

এই মডেলে কৃষককে তিন স্তরে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা করতে হবে। প্রথম স্তরজমি সুরক্ষা:
উঁচু বেড, নালা, মাচা মালচিংয়ের মাধ্যমে পানি তাপমাত্রার ঝুঁকি কমানো। দ্বিতীয় স্তরফসল সুরক্ষা: স্বল্পমেয়াদি, স্থানীয়ভাবে অভিযোজিত প্রয়োজন অনুযায়ী লবণ/ খরা সহনশীল জাত নির্বাচন। তৃতীয় স্তরআয় সুরক্ষা: একাধিক সবজি, পর্যায়ক্রমিক বপন এবং বাজারভিত্তিক উৎপাদন। এই তিনটি ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করলে জলবায়ুজনিত একটি ধাক্কায় পুরো কৃষি বিনিয়োগ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমে।

কোন এলাকায় কোন কৌশল বেশি উপযোগী

·         উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকা: উঁচু বেড, সরজন, মালচিং, নিরাপদ মিষ্টি পানি, লবণ সহনশীল বা স্থানীয়ভাবে পরীক্ষিত জাত।

·         বরেন্দ্র খরাপ্রবণ এলাকা: ড্রিপ/সাশ্রয়ী সেচ, মালচিং, স্বল্পমেয়াদি খরা সহনশীল জাত, কম পানির ফসল।

·         বন্যাপ্রবণ এলাকা: উঁচু বেড, দ্রুত নিষ্কাশন, মাচা এবং প্রয়োজন হলে ভাসমান কৃষি।

·         চরাঞ্চল: দ্রুত ফলনশীল সবজি, বালুমাটিতে জৈব পদার্থ মালচিং, পানি সংরক্ষণ এবং বাজারমুখী উৎপাদন।

·         শহরসংলগ্ন এলাকা: নিরাপদ সবজি, বিষমুক্ত উৎপাদন পদ্ধতি, ছোট জমিতে উচ্চমূল্যের ফসল এবং সরাসরি বাজারজাতকরণ।

কেন এই মডেলকেস্মার্টবলা হচ্ছে

স্মার্ট কৃষি মানেই ব্যয়বহুল প্রযুক্তি নয়। একজন কৃষক যদি আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে বীজ বপনের সময় ঠিক করেন, মাটির আর্দ্রতা দেখে সেচ দেন, বাজারদর দেখে ফসল নির্বাচন করেন এবং রোগ দেখা দিলে সঠিক ব্যবস্থা নেনতাহলেও সেটি স্মার্ট কৃষি। অর্থাৎ এই মডেলের মূল হলোতথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত + পানি সাশ্রয় + মাটির স্বাস্থ্য + জলবায়ু সহনশীলতা + বাজারমুখী উৎপাদন।

উপসংহার

বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভবিষ্যতের সবজি চাষকে শুধু বেশি ফলনের দিকে তাকালে হবে না; একই সঙ্গে কম খরচ, কম পানি, কম ঝুঁকি এবং নিশ্চিত বাজারএই চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। উঁচু বেড, নালা, মালচিং, জৈব পদার্থ, পানি সাশ্রয়ী সেচ, পর্যায়ক্রমিক ফসল, মাচা, IPM এবং বাজারভিত্তিক জাত নির্বাচনএই কৌশলগুলো সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করলে ছোট কৃষকের জন্য একটি বাস্তবসম্মত জলবায়ু সহনশীল সবজি চাষ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় সরজন পদ্ধতি উঁচু বেড, খরাপ্রবণ এলাকায় পানি সাশ্রয়ী সেচ এবং জলাবদ্ধ এলাকায় উঁচু/ভাসমান বেডএলাকাভেদে আলাদা কৌশল গ্রহণ করতে হবে। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও উপকূলীয় সরজন চাষে ফসলের নিবিড়তা অর্থনৈতিক সুবিধা বৃদ্ধির সম্ভাবনা পাওয়া গেছে। সবশেষে মনে রাখতে হবেলাভজনক সবজি চাষের সেরা সূত্র হলোআগে বাজার, পরে ফসল; আগে পানি ব্যবস্থাপনা, পরে চাষ; আগে ঝুঁকি বিশ্লেষণ, পরে বিনিয়োগ। এই নীতিতে পরিকল্পিতভাবে চাষ করলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিকে শুধু মোকাবিলা করা নয়, বরং সেটিকে একটি নতুন লাভজনক কৃষি উদ্যোগে রূপান্তর করা সম্ভব।

 

 

তথ্যসূত্র

·         . বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI)-ভিত্তিক গবেষণা, উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকায় মিষ্টিকুমড়ার ফলন অভিযোজন।

·         . বাংলাদেশের উপকূলীয় কৃষিতে জলবায়ু অভিযোজন গবেষণাসরজন পদ্ধতি, ভাসমান কৃষি, লবণ খরা সহনশীল ফসলসহ বিভিন্ন অভিযোজন কৌশল।

·         . Soil salinity management practices in coastal area of Bangladeshমালচিং, উঁচু জমি, খামার-পুকুর, সরজন, জৈব পদার্থ উপযোগী ফসল ব্যবস্থাপনা।

·         . International Rice Research Institute (IRRI)/CGIAR, Sorjan Farming: A Sustainable Solution for Climate Resilience in Coastal Bangladesh

·         . FAO AGRIS বাংলাদেশভিত্তিক গবেষণাজলবায়ু সহনশীল জাত ফসল নির্বাচন বিষয়ে গবেষণা।