ভূমিকা
টমেটু বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও অর্থকরী সবজি। শীতকালীন ফসল হিসেবে এর চাষ বেশি হলেও আধুনিক জাত, সুরক্ষিত চাষ ব্যবস্থা, উন্নত সেচ ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে টমেটুর উৎপাদন মৌসুম সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। তবে টমেটু চাষে মাটিবাহিত রোগ, বিশেষ করে ব্যাকটেরিয়াল উইল্ট, ফিউজেরিয়ামজনিত রোগ, নিমাটোড এবং অন্যান্য রোগজীবাণু অনেক সময় উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একই জমিতে বারবার টমেটু, বেগুন, মরিচ বা অন্যান্য সোলানেসিয়াস ফসল চাষ করলে এ ধরনের সমস্যার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। এই পরিস্থিতিতে গ্রাফটিং টমেটু চাষ একটি আধুনিক ও সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি। এ পদ্ধতিতে উন্নত ফলন ও গুণসম্পন্ন টমেটু জাতের উপরের অংশ বা সায়ন (Scion)-কে শক্তিশালী, রোগপ্রতিরোধী বা প্রতিকূলতা সহনশীল রুটস্টক (Rootstock)-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ফলে একটি গাছে উন্নত ফলের বৈশিষ্ট্য এবং শক্তিশালী মূলতন্ত্র—দুই ধরনের সুবিধা একত্রিত করা সম্ভব হয়। Purdue University-এর কৃষি সম্প্রসারণ নির্দেশিকাতেও টমেটু গ্রাফটিংকে মাটিবাহিত রোগ ব্যবস্থাপনা, প্রতিকূল পরিবেশ সহনশীলতা এবং ফলন বৃদ্ধির সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বাংলাদেশেও টমেটু গ্রাফটিং নিয়ে গবেষণা হয়েছে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় গ্রীষ্মকালীন টমেটুতে বিভিন্ন রুটস্টকের সঙ্গে গ্রাফটিংয়ের সামঞ্জস্য, রোগসহনশীলতা, বৃদ্ধি ও ফলন নিয়ে কাজ করা হয়েছে।
গ্রাফটিং টমেটু কী?
গ্রাফটিং হলো দুটি উদ্ভিদ অংশকে কেটে এমনভাবে জোড়া দেওয়ার কৌশল, যাতে পরবর্তীতে তারা একটি কার্যকর গাছ হিসেবে বৃদ্ধি পায়। গ্রাফটিংয়ে সাধারণত দুটি অংশ থাকে। প্রথমটি হলো রুটস্টক, যার মূলতন্ত্র গাছকে পানি ও পুষ্টি সরবরাহ করে এবং রোগ বা প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দ্বিতীয়টি হলো সায়ন, যার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত জাতের ফল, আকৃতি, রং, স্বাদ ও বাজারযোগ্য বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ সহজভাবে বলা যায়, রুটস্টক গাছের শক্তিশালী ভিত্তি এবং সায়ন হলো কাঙ্ক্ষিত ফল উৎপাদনের অংশ।
গ্রাফটিং টমেটু চাষের প্রধান সুবিধা
গ্রাফটিংয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো একই গাছে রুটস্টক ও সায়নের কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য একত্র করা। রোগপ্রতিরোধী রুটস্টক ব্যবহার করলে মাটিবাহিত রোগের ঝুঁকি কমানো যেতে পারে। শক্তিশালী রুটস্টক গাছের পানি ও পুষ্টি গ্রহণের সক্ষমতা বাড়াতেও সহায়তা করতে পারে। কিছু রুটস্টক লবণাক্ততা ও অন্যান্য অজৈবিক চাপ মোকাবিলায়ও সায়নকে সহায়তা করতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় রোগপ্রতিরোধী রুটস্টকের মাধ্যমে টমেটুর লবণাক্ততা সহনশীলতা উন্নত হওয়ার সম্ভাবনাও দেখা গেছে। তবে গ্রাফটিং করলেই সব রোগ দূর হয়ে যাবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। কোন রুটস্টক কোন রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর, তা অবশ্যই যাচাই করতে হবে।
রুটস্টক নির্বাচন
গ্রাফটিং টমেটু চাষের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে সঠিক রুটস্টক নির্বাচনের ওপর। রুটস্টক নির্বাচনের সময় শুধু গাছের বৃদ্ধি নয়, স্থানীয় রোগবালাই ও পরিবেশগত সমস্যাও বিবেচনা করতে হবে।
ভালো রুটস্টকের বৈশিষ্ট্য হলো—
- শক্তিশালী ও সুস্থ মূলতন্ত্র;
- প্রয়োজনীয় মাটিবাহিত রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বা সহনশীলতা;
- নিমাটোডের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় সহনশীলতা;
- প্রতিকূল পরিবেশে তুলনামূলক ভালো বৃদ্ধি;
- সায়নের সঙ্গে ভালো গ্রাফটিং সামঞ্জস্য;
- দ্রুত ও শক্তিশালী চারার বৃদ্ধি।
বাংলাদেশের জন্য রুটস্টক নির্বাচনে স্থানীয় গবেষণার ফলাফলকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। গাজীপুরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা খামারে বিভিন্ন রুটস্টকের সঙ্গে গ্রীষ্মকালীন টমেটুর গ্রাফটিং নিয়ে গবেষণা হয়েছে।
সায়ন নির্বাচন
সায়ন হিসেবে উচ্চফলনশীল, বাজারে চাহিদাসম্পন্ন এবং উন্নত মানের ফল উৎপাদনকারী জাত নির্বাচন করা উচিত। সায়ন নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিবেচনা করতে হবে—
ফলের আকার ও আকৃতি: বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
ফলের দৃঢ়তা: পরিবহন ও সংরক্ষণের জন্য দৃঢ় ফল বেশি উপযোগী।
ফলন: স্থানীয় পরিবেশে জাতটির সম্ভাব্য ফলন বিবেচনা করতে হবে।
রোগ প্রতিরোধ: পাতার রোগ বা অন্যান্য উপরিভাগের রোগের বিরুদ্ধে জাতটির নিজস্ব সক্ষমতা থাকা ভালো।
বাজারমূল্য: স্থানীয় বাজারে কোন ধরনের টমেটুর চাহিদা বেশি তা বিবেচনা করা জরুরি।
সুস্থ চারা উৎপাদন
গ্রাফটিংয়ের আগে রুটস্টক ও সায়নের সুস্থ চারা তৈরি করতে হবে। রোগাক্রান্ত, দুর্বল বা অতিরিক্ত কচি চারা দিয়ে গ্রাফটিং করা উচিত নয়। রুটস্টক ও সায়নের কাণ্ডের ব্যাস প্রায় সমান হলে গ্রাফটিং সহজ হয়। Purdue-এর নির্দেশনা অনুযায়ী সাধারণত প্রায় ১.৫–২ মিলিমিটার কাণ্ডের ব্যাস গ্রাফটিংয়ের উপযোগী পর্যায় হতে পারে। তবে প্রকৃত সময় জাত ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। রুটস্টক ও সায়নের বৃদ্ধির হার ভিন্ন হলে বীজ বপনের সময় সামান্য এগিয়ে বা পিছিয়ে দিতে হতে পারে, যাতে গ্রাফটিংয়ের সময় উভয়ের কাণ্ডের আকার কাছাকাছি থাকে।
গ্রাফটিংয়ের প্রয়োজনীয় উপকরণ
গ্রাফটিংয়ের জন্য প্রয়োজন হবে সুস্থ রুটস্টক ও সায়ন চারা, ধারালো পরিষ্কার ব্লেড বা গ্রাফটিং নাইফ, উপযুক্ত গ্রাফটিং ক্লিপ, পরিষ্কার ট্রে এবং হিলিং চেম্বার বা আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা। গ্রাফটিংয়ের সময় ব্লেড অবশ্যই পরিষ্কার ও ধারালো হতে হবে। একই অপরিষ্কার ব্লেড দিয়ে অনেক চারা কাটলে রোগজীবাণু এক চারা থেকে অন্য চারায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। Purdue-এর নির্দেশিকায় প্রয়োজনে নিয়মিত ব্লেড জীবাণুমুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্প্লাইস গ্রাফটিং পদ্ধতি
টমেটুতে splice grafting সবচেয়ে প্রচলিত গ্রাফটিং পদ্ধতিগুলোর একটি। এ পদ্ধতিতে রুটস্টক ও সায়নের কাণ্ড একই ধরনের তির্যক কোণে কেটে ক্লিপের মাধ্যমে যুক্ত করা হয়।
প্রথম ধাপ: রুটস্টক কাটা: কাণ্ড ধারালো ব্লেড দিয়ে তির্যকভাবে কাটতে হবে। খুব ভোঁতা বা অসমান কাট করা যাবে না। তির্যক কাটের ফলে সংযোগের জন্য তুলনামূলক বেশি কাটা পৃষ্ঠ তৈরি হয়।
দ্বিতীয় ধাপ: গ্রাফটিং ক্লিপ বসানো রুটস্টকের কাটা অংশে উপযুক্ত আকারের গ্রাফটিং ক্লিপ বসাতে হবে। ক্লিপটি এমনভাবে রাখতে হবে যাতে পরে সায়ন সহজে যুক্ত করা যায়।
তৃতীয় ধাপ: সায়ন কাটা সায়নের কাণ্ডও রুটস্টকের সঙ্গে প্রায় একই কোণে কাটতে হবে। দুই অংশের কাটা পৃষ্ঠ যেন পরস্পরের সঙ্গে ভালোভাবে মিলে যায়।
চতুর্থ ধাপ: সায়ন যুক্ত করা সায়নের কাটা অংশ ক্লিপের মধ্যে বসিয়ে রুটস্টকের কাটা অংশের সঙ্গে ভালোভাবে মিলিয়ে দিতে হবে। কাটা পৃষ্ঠের মধ্যে ফাঁক থাকলে গ্রাফটিং ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
পঞ্চম ধাপ: দ্রুত হিলিং চেম্বারে নেওয়া গ্রাফটিং শেষ হওয়ার পর চারাকে দেরি না করে নিয়ন্ত্রিত আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার হিলিং পরিবেশে নিতে হবে।
গ্রাফটিংয়ের পর হিলিং বা নিরাময়
গ্রাফটিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি হলো post-graft healing। গ্রাফটিংয়ের পর সায়নের নিজস্ব শিকড় না থাকায় পানি শোষণ সাময়িকভাবে সীমিত থাকে। ফলে সায়ন দ্রুত পানি হারিয়ে নেতিয়ে পড়তে পারে। Purdue-এর নির্দেশনায় গ্রাফটিংয়ের পর প্রথম ৪৮–৭২ ঘণ্টা প্রায় ৮৫–৯৫ শতাংশ আপেক্ষিক আর্দ্রতা এবং প্রায় ২২–২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখার কথা বলা হয়েছে। প্রথম কয়েক দিন আলো কম রাখতে হয়, যাতে অতিরিক্ত বাষ্পমোচন না ঘটে। UC Davis-এর গাইডেও প্রায় ৯০ শতাংশ আর্দ্রতা, কম আলো এবং নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় কয়েক দিন healing করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
হিলিং চেম্বার কীভাবে পরিচালনা করবেন
গ্রাফটেড চারা প্রথমে উচ্চ আর্দ্রতার পরিবেশে রাখতে হবে। চারার ওপর স্বচ্ছ প্লাস্টিক ডোম বা উপযুক্ত আবরণ ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রথম দুই দিন আর্দ্রতা বেশি রাখতে হবে। এরপর ধীরে ধীরে ডোম খুলে বাতাস চলাচল বাড়াতে হবে এবং আলোও ধীরে ধীরে বাড়াতে হবে। হঠাৎ করে উচ্চ আর্দ্রতা থেকে কম আর্দ্রতায় অথবা অন্ধকার পরিবেশ থেকে তীব্র সূর্যালোকে নেওয়া যাবে না। এতে চারা অতিরিক্ত নেতিয়ে যেতে পারে এবং গ্রাফট নষ্ট হতে পারে। Purdue-এর নির্দেশনায় কয়েক দিন ধরে ধীরে ধীরে আর্দ্রতা কমানো ও আলো বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
গ্রাফটেড চারা জমিতে রোপণ
হিলিং সম্পন্ন হওয়ার পর চারাকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পরিবেশে অভ্যস্ত করতে হবে। এরপর জমিতে রোপণ করা যায়। রোপণের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গ্রাফটের সংযোগস্থল মাটির নিচে দেওয়া যাবে না। সংযোগস্থল মাটির নিচে থাকলে সায়ন অংশ থেকে নতুন শিকড় বের হতে পারে। তখন রোগপ্রতিরোধী রুটস্টকের সুবিধা কমে যেতে পারে। তাই গ্রাফটের জোড়া অংশ মাটির ওপর রাখতে হবে।
জমি ও সার ব্যবস্থাপনা
গ্রাফটেড টমেটুর জন্য উর্বর ও সুনিষ্কাশিত জমি নির্বাচন করা উচিত। পানি জমে থাকে এমন জমি এড়িয়ে চলতে হবে। মাটি পরীক্ষা করে সার প্রয়োগ করা সবচেয়ে ভালো। নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অণুপুষ্টিও জমির অবস্থা অনুযায়ী দিতে হবে। গ্রাফটেড গাছের মূলতন্ত্র শক্তিশালী বলে অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করা যাবে—এ ধারণা ভুল। বরং সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করতে হবে।
সেচ ও মালচিং
টমেটুতে নিয়মিত কিন্তু নিয়ন্ত্রিত সেচ প্রয়োজন। অতিরিক্ত পানি জমে গেলে শিকড়ের ক্ষতি ও রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ড্রিপ সেচ গ্রাফটেড টমেটুর জন্য বিশেষভাবে উপযোগী হতে পারে। এর মাধ্যমে গাছের গোড়ায় নিয়ন্ত্রিতভাবে পানি ও প্রয়োজন অনুযায়ী তরল সার দেওয়া যায়। মালচ ব্যবহার করলে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা, আগাছা নিয়ন্ত্রণ এবং মাটি থেকে রোগজীবাণু পাতায় ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানো যায়।
গাছের পরিচর্যা
গ্রাফটেড টমেটু অনেক সময় শক্তিশালীভাবে বৃদ্ধি পায়। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী বাঁশ, খুঁটি, দড়ি বা trellis ব্যবহার করে গাছকে সোজা রাখতে হবে। নিচের পুরোনো ও রোগাক্রান্ত পাতা নিয়মিত অপসারণ করা যেতে পারে। তবে একসঙ্গে অতিরিক্ত পাতা কেটে ফেলা উচিত নয়। গ্রাফটের নিচে রুটস্টক থেকে নতুন কুশি বের হলে তা দ্রুত হাতে অপসারণ করতে হবে। এসব কুশি রেখে দিলে মূলকাণ্ডের বৃদ্ধি বেড়ে সায়নের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে।
গ্রাফটিং কি সব রোগ থেকে টমেটুকে রক্ষা করে?
না। এটি মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি। গ্রাফটিং মূলত নির্দিষ্ট মাটিবাহিত রোগ ও কিছু মাটিবাহিত কীটের চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু টমেটুর ভাইরাস, পাতার বিভিন্ন রোগ, সাদা মাছি, জাবপোকা, থ্রিপস বা অন্যান্য বালাই থেকে গ্রাফটেড গাছ সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। তাই গ্রাফটিংয়ের পাশাপাশি সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা IPM অনুসরণ করতে হবে। রোগমুক্ত চারা, পরিষ্কার জমি, আগাছা নিয়ন্ত্রণ, সঠিক সেচ, সুষম সার এবং নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ একসঙ্গে করতে হবে।
বাংলাদেশে গ্রাফটিং টমেটুর সম্ভাবনা
বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালীন ও রোগপ্রবণ এলাকায় গ্রাফটিং টমেটুর বিশেষ সম্ভাবনা রয়েছে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গাজীপুরের গবেষণা খামারে গ্রীষ্মকালীন টমেটুর বিভিন্ন রুটস্টক নিয়ে কাজ করা হয়েছে। বাংলাদেশে টমেটু ও আলু গ্রাফটিং নিয়েও গবেষণা হয়েছে। IUBAT-এর একটি গবেষণায় টমেটুকে আলুর ওপর গ্রাফটিং করে একই গাছে টমেটু ও আলু উৎপাদনের সম্ভাবনা পরীক্ষা করা হয়। তবে এটি মূলত গবেষণামূলক উদাহরণ; সাধারণ বাণিজ্যিক টমেটু উৎপাদনের জন্য প্রচলিত রোগপ্রতিরোধী রুটস্টক ব্যবহারই অধিক বাস্তবসম্মত।
গ্রাফটিং টমেটু চাষে যে ভুলগুলো এড়াতে হবে
গ্রাফটিংয়ের সময় কয়েকটি ভুল করলে সফলতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। অসুস্থ চারা দিয়ে গ্রাফটিং করা যাবে না। রুটস্টক ও সায়নের কাণ্ডের আকারে বড় পার্থক্য রাখা যাবে না। কাটিং অসমান বা ভোঁতা করা যাবে না। দুই কাটা পৃষ্ঠ ঠিকমতো না মিলিয়ে ক্লিপ লাগানো যাবে না। গ্রাফটিংয়ের পর চারাকে সরাসরি রোদে দেওয়া যাবে না। আবার দীর্ঘদিন অতিরিক্ত আর্দ্র পরিবেশেও রাখা যাবে না। এতে সায়ন অংশে adventitious root বা অতিরিক্ত শিকড় তৈরি হতে পারে, যা পরবর্তীতে মাটির রোগজীবাণুর সংস্পর্শে এসে রুটস্টকের রোগপ্রতিরোধী সুবিধা নষ্ট করতে পারে।
কৃষকের জন্য বাস্তব পরামর্শ
বাণিজ্যিকভাবে গ্রাফটিং টমেটু চাষ শুরু করার আগে ছোট পরিসরে পরীক্ষা করা ভালো। একই সায়ন জাতের কিছু সাধারণ চারা এবং কিছু গ্রাফটেড চারা পাশাপাশি চাষ করলে পার্থক্য সহজে বোঝা যাবে। গাছের বৃদ্ধি, রোগের মাত্রা, ফলের সংখ্যা, বাজারযোগ্য ফলন এবং মোট উৎপাদন খরচ নথিবদ্ধ করতে হবে। স্থানীয় পরিবেশে যে রুটস্টক ও সায়নের সমন্বয় ভালো ফল দেয়, পরবর্তী মৌসুমে সেটির পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে।
উপসংহার
গ্রাফটিং টমেটু চাষ আধুনিক কৃষিতে রোগ ব্যবস্থাপনা, শক্তিশালী মূলতন্ত্র তৈরি এবং প্রতিকূল পরিবেশে টমেটু উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। উন্নত ফলের জাতকে রোগপ্রতিরোধী ও শক্তিশালী রুটস্টকের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে গাছের কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যগুলো একত্র করা যায়। তবে গ্রাফটিং সফল করতে হলে শুধু জোড়া লাগানোই যথেষ্ট নয়। সুস্থ চারা উৎপাদন, সঠিক রুটস্টক ও সায়ন নির্বাচন, সমান কাণ্ডের ব্যাস, পরিষ্কার ধারালো ব্লেড, নিখুঁত কাটিং, কাটা অংশের ভালো সংযোগ, উচ্চ আর্দ্রতায় healing এবং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পরিবেশে অভ্যস্ত করা—প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে বিশেষ করে মাটিবাহিত রোগপ্রবণ এলাকা, গ্রীষ্মকালীন টমেটু উৎপাদন এবং পলিহাউস বা নেটহাউসভিত্তিক আধুনিক চাষে গ্রাফটিং প্রযুক্তি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে স্থানীয় পরিবেশে পরীক্ষিত রুটস্টক ব্যবহার এবং গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে প্রযুক্তি প্রয়োগ করাই হবে সবচেয়ে নিরাপদ ও লাভজনক পদ্ধতি।
তথ্যসূত্র
১. Purdue University, Department of Horticulture and Landscape Architecture — Techniques for Tomato Grafting.
২. University of California, Davis — Tomato Grafting Guide.
৩. Sher-e-Bangla Agricultural University/BARI গবেষণা — গ্রীষ্মকালীন টমেটুতে বিভিন্ন রুটস্টকের কার্যকারিতা ও গ্রাফটিং সামঞ্জস্য।
৪. Farooque et al. (2024), IUBAT Review — Production of “Tomaloo” Plant Through Grafting Tomato on Potato at IUBAT.
৫. Alam et al. (2026) — Grafting on resistant rootstocks alleviates salt stress on tomato.