নুর উদ্দীন মোঃ জাহাংগীর, প্রধান লেখক ও সম্পাদক
বাংলাদেশের কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতে যে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে, তার পেছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হলো বাণিজ্যিক ফিড বা প্রাণিখাদ্য শিল্প। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার আমিষের চাহিদা—ডিম, দুধ, মাংস ও মাছ—মেটাতে প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের আধুনিকায়নের কোনো বিকল্প নেই। আর এই আধুনিকায়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো গুণগত মানসম্পন্ন, পুষ্টিকর ও সুষম ফিড।
বর্তমান বাজারের আকার ও উৎপাদন সক্ষমতা
বাংলাদেশের প্রাণিখাদ্যের বাজার বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের অন্যতম বড় শিল্পে পরিণত হয়েছে। সরাসরি প্রস্তুতকৃত ফিডের বার্ষিক বাজারমূল্য প্রায় ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে কাঁচামাল সরবরাহ, হ্যাচারি, ওষুধসহ ফিড শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য উপখাত যুক্ত করলে পুরো বাজারের আকার ৭০,০০০ থেকে ৮০,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
দেশে প্রতি বছর প্রক্রিয়াজাত প্রাণিখাদ্যের চাহিদা প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ লাখ মেট্রিক টন। মার্কিন কৃষি বিভাগ (USDA) এবং বাংলাদেশ ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (FIAB)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ফিড মিলগুলোর সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৮০ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ বর্তমানে দেশের স্থানীয় চাহিদার সিংহভাগই দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণ হচ্ছে।
এই খাতে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে আনুমানিক ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। ফলে ফিড শিল্প শুধু প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের প্রয়োজন মেটাচ্ছে না, একই সঙ্গে এটি একটি বড় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হিসেবেও গড়ে উঠেছে।
কোন খাতে কত ফিড ব্যবহার হচ্ছে
বাংলাদেশের ফিড শিল্পকে মূলত পোলট্রি, মৎস্য এবং গবাদিপশু—এই তিনটি প্রধান খাতে ভাগ করা যায়। পোলট্রি ফিড মোট ব্যবহারের প্রায় ৬০ শতাংশ। ব্রয়লার, লেয়ার ও সোনালী মুরগির বাণিজ্যিক খামারের কারণে এই খাতে ফিডের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। মৎস্য ফিডের ব্যবহার মোট বাজারের প্রায় ২৫ শতাংশ। বিশেষ করে আধুনিক মাছ চাষে ভাসমান বা Floating এবং তলাঘেঁষা বা Sinking ফিডের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।গবাদিপশুর ফিডের অংশ প্রায় ১৫ শতাংশ। দেশে ডেইরি ও ক্যাটল ফ্যাটেনিং বা গবাদিপশু হৃষ্টপুষ্টকরণ খামারের বাণিজ্যিক প্রসারের সঙ্গে এই খাতেও ফিডের চাহিদা বাড়ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিল মিলিয়ে প্রায় ৪০০টি ফিডমিল রয়েছে। এর মধ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (DLS) অধীনে নিবন্ধিত কারখানা রয়েছে প্রায় ৩০০টি।
বাজারে নারিশ পোলট্রি, এসিআই গোদরেজ, কাজী ফার্মস, প্যারাগন, আরআরপি অ্যাগ্রো, সিপি বাংলাদেশ, কোয়ালিটি ফিডস, আফতাব এবং আকিজ ফিডসসহ বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
স্থানীয় উৎপাদনে ইতিবাচক পরিবর্তন
ফিড শিল্পের একটি ইতিবাচক দিক হলো, একসময় যেখানে কাঁচামালের জন্য বাংলাদেশ অনেক বেশি আমদানিনির্ভর ছিল, সেখানে বর্তমানে ফিড তৈরির অন্যতম প্রধান উপাদান ভুট্টার প্রায় ৭০ শতাংশ দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে।
স্থানীয়ভাবে ভুট্টার উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে ফিড শিল্পের পাশাপাশি দেশের কৃষি অর্থনীতিতেও নতুন গতি এসেছে। কৃষকরা ভুট্টাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ফসল হিসেবে গ্রহণ করছেন এবং এর সঙ্গে ফিড শিল্পের একটি শক্তিশালী সংযোগ তৈরি হয়েছে।
ভবিষ্যতে ফিড বাজার কতটা বাড়তে পারে
বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ফিডের বাজার ভবিষ্যতে আরও বড় হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ফিডের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ১ কোটি বা ১০ মিলিয়ন মেট্রিক টনে পৌঁছাতে পারে।
এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো দেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন। মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিস্তার, নগরায়ন এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে মাংস, ডিম, দুধ ও মাছের চাহিদা বাড়ছে। আর এসব প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে বাণিজ্যিক ও পুষ্টিকর ফিডের প্রয়োজনও বাড়ছে।
একই সঙ্গে গবাদিপশু ও মাছের খামারিরাও ধীরে ধীরে প্রচলিত কুঁড়া-ভুষি বা সাধারণ খাবারের পরিবর্তে সুষম পেলেটেড ও এক্সট্রুডেড ফিড ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন। সুষম ফিড ব্যবহারের ফলে Feed Conversion Ratio বা FCR উন্নত করা সম্ভব হয়, যা খামারের উৎপাদন দক্ষতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মৎস্য খাতেও ফিডের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে বদ্ধ জলাশয়ে আধুনিক মাছ চাষে অপচয় কমানোর জন্য Floating Fish Feed-এর ব্যবহার জনপ্রিয় হচ্ছে। ফলে এই বাজারে ভবিষ্যতে আরও বড় প্রবৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে।
ডেইরি ও ক্যাটল ফ্যাটেনিং খামারও ফিডের চাহিদা বাড়ানোর অন্যতম চালিকাশক্তি। কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে গবাদিপশু হৃষ্টপুষ্টকরণ এবং সারা বছর ডেইরি খামারের বিস্তারের কারণে বাণিজ্যিক ক্যাটল বা কাউ ফিডের বাজার ক্রমেই বড় হচ্ছে।
এর পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন উদীয়মান বাজারে প্রক্রিয়াজাত মৎস্য ও পোলট্রি ফিড রপ্তানিরও সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতে উৎপাদনের মান ও সক্ষমতা বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের ফিড শিল্প আঞ্চলিক বাজারেও জায়গা করে নিতে পারে।
ফিড শিল্পের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
সম্ভাবনা অনেক থাকলেও বাংলাদেশের ফিড শিল্প এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা। দেশের ভুট্টার প্রায় ৭০ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হলেও সয়াবিন মিল, প্রোটিন কনসেন্ট্রেট, প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন ও মিনারেল প্রিমিক্সের প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হয়।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বেড়ে গেলে বা ডলারের মূল্য বৃদ্ধি পেলে দেশের ফিড উৎপাদন খরচও দ্রুত বেড়ে যায়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত খামারিদের ওপর পড়ে এবং ডিম, মাংস, দুধ ও মাছের উৎপাদন খরচও বাড়তে পারে।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ফিডের গুণগত মান নিশ্চিত করা। মাইক্রোটক্সিন, ক্ষতিকর ভারী ধাতু এবং ভেজালের ঝুঁকি থাকলে ফিডের পুষ্টিমান ও নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই ফিড উৎপাদন থেকে শুরু করে কাঁচামাল সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি।
সামনে এগিয়ে যেতে যা প্রয়োজন
ফিডের দাম ও মান নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে দেশে প্রোটিনজাতীয় কাঁচামালের স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে। বিশেষ করে সয়াবিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে ফিড উৎপাদনে আধুনিক ও এনার্জি-ইফিশিয়েন্ট প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এতে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি ফিডের গুণগত মানও আরও উন্নত করা সম্ভব হবে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক মনিটরিং ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। কাঁচামাল পরীক্ষা, উৎপাদন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ এবং বাজারে বিক্রি হওয়া ফিডের মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে ভেজাল ও নিম্নমানের ফিডের ঝুঁকি কমবে।
উপসংহার
বাংলাদেশের প্রাণিখাদ্য শিল্প শুধু পোলট্রি, মৎস্য ও গবাদিপশু খাতের সহায়ক বা Backward Linkage শিল্প নয়। এটি দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
দেশে প্রাণিজ আমিষের চাহিদা যত বাড়বে, বাণিজ্যিক ফিডের প্রয়োজনও তত বাড়বে। তাই এই শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কার্যকর নীতিগত সহায়তা জরুরি।
এসব ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের ফিড শিল্প শুধু দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণেই সক্ষম হবে না, বরং ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষি ও প্রাণিসম্পদ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিকেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।
---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
লেখক পরিচিতি: নুর উদ্দীন মোঃ জাহাংগীর, বিএজিএড, এমএসএস, প্রধান লেখক ও সম্পাদক, কৃষি ও কৃষক ডট কম (krishiokrishok.com) সাবেক সহকারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, ডিএই, কৃষি মন্ত্রণালয়।