শীতকাল মানেই মাঠজুড়ে আলুর চাষ। দেশের অনেক কৃষকের জন্য আলু একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। কিন্তু শীতের কুয়াশা, অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং দিন-রাতের তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারণে আলুর জমিতে বিভিন্ন ধরনের ছত্রাকজনিত রোগ দেখা দিতে পারে। সময়মতো রোগ শনাক্ত করে ব্যবস্থা না নিলে অল্প সময়ের মধ্যেই একটি জমির বড় অংশ আক্রান্ত হতে পারে। বিশেষ করে লেট ব্লাইট বা নাবি ধসা রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আলুর ফলনে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে। তাই আলুর রোগ দমনে শুধু রোগ দেখা দেওয়ার পর ওষুধ ব্যবহার করলেই হবে না। ভালো বীজ নির্বাচন, জমি পরিষ্কার রাখা, সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা, ফসল পর্যায়ক্রম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ছত্রাকনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে শুরু থেকেই রোগের ঝুঁকি কমাতে হবে।
লেট ব্লাইট বা নাবি ধসা রোগ
আলুর সবচেয়ে ভয়ংকর রোগগুলোর একটি হলো লেট ব্লাইট বা নাবি ধসা। Phytophthora infestans নামের ছত্রাকসদৃশ অণুজীবের কারণে এই রোগ হয়। রোগের শুরুতে সাধারণত নিচের পাতার কিনারা বা ডগায় পানিতে ভেজা দাগের মতো ছোট ছোট দাগ দেখা যায়। পরে দাগগুলো দ্রুত কালচে বাদামি হয়ে যায়। কুয়াশাচ্ছন্ন ও ভেজা সকালে আক্রান্ত পাতার নিচের দিকে দাগের চারপাশে তুলার মতো সাদা ছত্রাক দেখা যেতে পারে। আবহাওয়া রোগের অনুকূলে থাকলে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই পুরো জমির গাছ কালচে হয়ে পুড়ে যাওয়ার মতো দেখাতে পারে। শুধু গাছের পাতাই নয়, মাটির নিচে থাকা আলুতেও এই রোগের প্রভাব পড়তে পারে। আক্রান্ত কন্দে বাদামি বা লালচে দাগ এবং পরে পচন দেখা দিতে পারে। লেট ব্লাইট সাধারণত ঠান্ডা, কুয়াশাচ্ছন্ন ও বেশি আর্দ্র আবহাওয়ায় দ্রুত ছড়ায়। তাই শীতকালে কুয়াশার সময় আলুর জমিতে নিয়মিত নজর রাখা অত্যন্ত জরুরি।
আর্লি ব্লাইট বা আগাম ধসা রোগ
আলুর আরেকটি পরিচিত রোগ হলো আর্লি ব্লাইট বা আগাম ধসা। Alternaria solani নামের ছত্রাকের কারণে এই রোগ হয়। সাধারণত গাছের নিচের বা পুরোনো পাতায় প্রথমে ছোট ছোট শুকনো বাদামি দাগ দেখা যায়। দাগের মধ্যে একটির ভেতরে আরেকটি গোলাকার রেখা তৈরি হয়। দেখতে অনেকটা লক্ষ্যবস্তুর মতো হওয়ায় একে Target Spot বলা হয়। রোগ বাড়তে থাকলে ছোট ছোট দাগ একসঙ্গে মিশে যায় এবং আক্রান্ত পাতা শুকিয়ে মচমচে হয়ে ঝরে পড়ে। তুলনামূলক উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়ায় এ রোগের আক্রমণ বাড়তে পারে।
কাণ্ড পচা বা ঢলে পড়া রোগ
Sclerotium rolfsii নামের ছত্রাকের কারণে কাণ্ড পচা বা Sclerotium Wilt দেখা দিতে পারে।
এ রোগে প্রথমে মাটির কাছাকাছি কাণ্ডে জলছাপের মতো পচন দেখা যায়। পরে কাণ্ডের গোড়ায় সাদা সুতার মতো ছত্রাকের জাল তৈরি হয়। এর সঙ্গে সরিষার দানার মতো ছোট ছোট বাদামি স্ক্লেরোশিয়ামও দেখা যেতে পারে। আক্রান্ত গাছ দ্রুত ঢলে পড়ে এবং ধীরে ধীরে শুকিয়ে মারা যায়। জমিতে পানি জমে থাকা এবং স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ থাকলে এ রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ড্রাই রট বা শুষ্ক পচন
ড্রাই রট সাধারণত Fusarium প্রজাতির ছত্রাকের কারণে হয়। সংরক্ষণের সময় বা বীজ আলুতে এ রোগ বেশি দেখা যায়। আক্রান্ত আলুর বাইরের চামড়া কুঁচকে যায় এবং আলুর ভেতরের অংশ ধীরে ধীরে শুকিয়ে শক্ত ও ফাঁপা হয়ে যায়। আলু কেটে দেখলে ভেতরে সাদা, গোলাপি বা হলুদাভ ছত্রাক দেখা যেতে পারে।তাই শুধু মাঠের রোগ নয়, আলু সংগ্রহ ও সংরক্ষণের সময়ও রোগাক্রান্ত আলু আলাদা করে রাখা জরুরি।
কোন রোগ কীভাবে চিনবেন?
লেট ব্লাইট হলে পাতার কিনারায় কালচে বাদামি দাগ এবং ভেজা আবহাওয়ায় পাতার নিচে সাদা ছত্রাক দেখা যায়। কুয়াশা ও উচ্চ আর্দ্রতায় রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আর্লি ব্লাইট হলে পাতায় শুকনো বাদামি দাগ তৈরি হয় এবং দাগের মধ্যে গোল গোল চক্র দেখা যায়। তুলনামূলক উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়ায় এ রোগ বাড়তে পারে। কাণ্ড পচা রোগ হলে গাছের গোড়ায় সাদা ছত্রাকের জাল এবং সরিষার দানার মতো বাদামি স্ক্লেরোশিয়াম দেখা যায়। স্যাঁতসেঁতে মাটি ও বেশি তাপমাত্রা এ রোগের জন্য অনুকূল।
রোগ প্রতিরোধ শুরু হবে ভালো বীজ থেকে
আলুর রোগ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোগমুক্ত ও ভালো মানের বীজ ব্যবহার করা। সম্ভব হলে বিএডিসি বা স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের প্রত্যায়িত রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করুন। রোগাক্রান্ত বা পচা আলু কখনো বীজ হিসেবে ব্যবহার করবেন না। কারণ আক্রান্ত বীজের মাধ্যমে রোগ সহজেই নতুন জমিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
জমি প্রস্তুতের সময় আগের ফসলের আক্রান্ত গাছপালা ও অবশিষ্টাংশ পরিষ্কার করে ফেলুন। জমিতে সুষম সার ব্যবহার করুন এবং বিশেষ করে পটাশ সারের ঘাটতি যেন না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখুন। আলুর জমিতে পানি জমে থাকলে রোগের ঝুঁকি বাড়ে। তাই ভালোভাবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। আলুর গাছের গোড়ায় মাটি তুলে উঁচু ভেল তৈরি করলে পানি জমে থাকা কমে এবং কন্দও মাটির বাইরে বেরিয়ে আসার ঝুঁকি কমে।
একই জমিতে বারবার আলু চাষ করবেন না
একই জমিতে বছরের পর বছর আলু বা টমেটোর মতো একই পরিবারের ফসল চাষ করলে মাটিতে রোগজীবাণু জমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই সম্ভব হলে ফসল পর্যায়ক্রম অনুসরণ করুন। আলুর পর সরিষা বা ধানের মতো অন্য ফসল চাষ করলে মাটিতে রোগজীবাণুর চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে।
বীজ আলু শোধন
রোপণের আগে বীজ আলু সঠিকভাবে শোধন করা রোগ প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বীজ শোধনের জন্য স্থানীয়ভাবে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ব্যবহার করুন এবং পণ্যের লেবেলে দেওয়া মাত্রা ও ব্যবহারের নির্দেশনা মেনে চলুন। বীজ শোধনের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ বা মাত্রা ব্যবহারের আগে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা বা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শ নেওয়া ভালো। কারণ নিবন্ধিত বালাইনাশকের নাম ও অনুমোদিত ব্যবহার সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।
লেট ব্লাইট দেখা দিলে কী করবেন?
লেট ব্লাইটের ঝুঁকি বেশি থাকলে রোগ দেখা দেওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কুয়াশাচ্ছন্ন ও অতিরিক্ত আর্দ্র আবহাওয়ায় জমি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুন। প্রয়োজনে স্থানীয়ভাবে অনুমোদিত ম্যানকোজেব জাতীয় প্রতিরোধক ছত্রাকনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে কোন পণ্য কত মাত্রায় এবং কতদিন পরপর ব্যবহার করতে হবে, তা অবশ্যই পণ্যের লেবেল ও স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করতে হবে। রোগের আক্রমণ দেখা দিলে পরিস্থিতি অনুযায়ী মেটাল্যাক্সিল+ম্যানকোজেব, সাইমোক্সানিল+ম্যানকোজেব বা ডাইমেথোমর্ফ জাতীয় অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ব্যবহার করা হয়। এ ক্ষেত্রে একই ওষুধ বারবার ব্যবহার না করে অনুমোদিত বিভিন্ন কার্যকর উপাদানের মধ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা গুরুত্বপূর্ণ। এতে ছত্রাকের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কমে।
কাণ্ড পচা ও ড্রাই রট হলে
কাণ্ড পচা রোগে আক্রান্ত গাছ জমিতে রেখে দেবেন না। আক্রান্ত গাছ গোড়াসহ তুলে জমির বাইরে নিয়ে নিরাপদভাবে ধ্বংস করুন। মাটির গোড়ায় প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে রোগের ধরন নিশ্চিত না হয়ে ওষুধ ব্যবহার না করাই ভালো। ড্রাই রটের ক্ষেত্রে আক্রান্ত আলু আলাদা করে ফেলুন। সুস্থ আলু থেকে আক্রান্ত আলু আলাদা রাখুন এবং সংরক্ষণের জায়গা পরিষ্কার, শুকনো ও বাতাস চলাচল উপযোগী রাখুন।
কুয়াশার সময় অতিরিক্ত সেচ এড়িয়ে চলুন
লেট ব্লাইট প্রতিরোধে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার—কুয়াশাচ্ছন্ন ও ভেজা আবহাওয়ায় অপ্রয়োজনীয় সেচ দেবেন না। পাতা ও জমি যখন এমনিতেই বেশি ভেজা থাকে, তখন অতিরিক্ত পানি রোগের পরিবেশ আরও অনুকূল করে তুলতে পারে। তাই জমির প্রয়োজন বুঝে সেচ দিতে হবে এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ভালো রাখতে হবে।
আলু তোলার আগেও সতর্ক থাকুন
আলু তোলার আগে রোগের ঝুঁকি কমানোর জন্য গাছের ওপরের অংশ বা Haulm সঠিক সময়ে কেটে ফেলার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। বিশেষ করে কন্দে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলে এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে গাছ কাটার সঠিক সময় ও পদ্ধতি আলুর জাত, মাঠের অবস্থা এবং রোগের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। তাই স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া ভালো।
শেষ কথা
আলুর ছত্রাকজনিত রোগ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়মতো রোগ শনাক্ত করা এবং শুরু থেকেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। ভালো ও রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করুন, জমিতে পানি জমতে দেবেন না, সুষম সার ব্যবহার করুন এবং একই জমিতে বারবার আলু বা টমেটো চাষ না করে ফসল পর্যায়ক্রম অনুসরণ করুন। কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ করুন। আর রোগ দেখা দিলে আগে রোগটি সঠিকভাবে শনাক্ত করুন। প্রয়োজন হলে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়ে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক সঠিক মাত্রায় ব্যবহার করুন।
মনে রাখবেন, রোগ দেখা দেওয়ার পর শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর করার চেয়ে রোগ হওয়ার আগেই প্রতিরোধ করা অনেক বেশি কার্যকর ও সাশ্রয়ী। সুস্থ বীজ, পরিচ্ছন্ন জমি, সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ—এই চারটি অভ্যাসই হতে পারে আপনার আলুর ভালো ফলনের অন্যতম চাবিকাঠি।
তথ্যসূত্র :
১. বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI)। আলুর উৎপাদন প্রযুক্তি ও রোগ-বালাই ব্যবস্থাপনা।
২. কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE)। আলু চাষ ও রোগ-বালাই ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা।
৩. কৃষি তথ্য সার্ভিস (AIS)। আলুর রোগ ও দমন ব্যবস্থা।
৪. International Potato Center (CIP). Potato Late Blight Management.
৫. FAO. Integrated Pest Management for Potato Diseases.