সজিনা শুধু পরিচিত একটি সবজি গাছ নয়, পুষ্টিগুণের কারণে এটি এখন বিশ্বজুড়েসুপারফুডহিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে সজিনার পাতা ভিটামিন, খনিজ অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ভালো উৎস। তাই পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবেও সজিনা পাতার উৎপাদন করে আয় করা সম্ভব। বারোমাসি সজিনার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, অল্প জায়গায় এর চাষ করা যায় এবং সঠিক পরিচর্যা করলে বছরের বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার পাতা সংগ্রহ করা সম্ভব। এমনকি বাড়ির আঙিনা, ছোট জমি কিংবা ছাদবাগানেও পরিকল্পিতভাবে সজিনা চাষ করা যায়। তবে বেশি পাতা পেতে হলে শুধু গাছ লাগালেই হবে না। সঠিক দূরত্বে চারা রোপণ, নিয়মিত ছাঁটাই, সুষম সার পানি ব্যবস্থাপনা এবং সঠিক সময়ে পাতা সংগ্রহসবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ।

জমি চারা রোপণের প্রস্তুতি

সজিনা গাছ সাধারণত খুব বেশি পানি সহ্য করতে পারে না। তাই পাতা উৎপাদনের জন্য এমন জায়গা বেছে নিতে হবে যেখানে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পড়ে এবং পানি সহজে বের হয়ে যেতে পারে। দোআঁশ বা বেলে-দোআঁশ মাটি সজিনা চাষের জন্য ভালো। মাটির pH . থেকে .-এর মধ্যে থাকলে গাছ ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। শুধু পাতা উৎপাদনের উদ্দেশ্যে সজিনা চাষ করলে তুলনামূলক ঘন করে চারা লাগানো যায়। ক্ষেত্রে সারি থেকে সারির দূরত্ব প্রায় থেকে . ফুট এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ইঞ্চি থেকে ফুট রাখা যেতে পারে। এতে গাছ বেশি ছড়িয়ে না গিয়ে দ্রুত কচি শাখা পাতা উৎপাদন করে। সজিনার বীজ সরাসরি জমিতে বপন করা যায়। আবার পলিব্যাগে চারা তৈরি করেও জমিতে লাগানো যায়। ফেব্রুয়ারি-মার্চ এবং মে-জুন মাস চারা রোপণের জন্য উপযুক্ত সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বেশি পাতা পেতে ছাঁটাই করুন নিয়ম মেনে

বারোমাসি সজিনা থেকে বেশি পাতা পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো নিয়মিত ছাঁটাই। চারা লাগানোর পর গাছ যখন প্রায় থেকে ফুট লম্বা হবে, তখন প্রধান কাণ্ডের আগা মাটি থেকে প্রায় থেকে . ফুট ওপরে কেটে দিতে হবে। এতে গাছ শুধু ওপরের দিকে না বেড়ে চারদিকে নতুন শাখা বের করতে শুরু করবে। নতুন শাখাগুলো যখন প্রায় থেকে . ফুট লম্বা হবে, তখন সেগুলোর আগাও সামান্য ছেঁটে দেওয়া যায়। এতে প্রতিটি শাখা থেকে আরও নতুন কচি ডাল বের হবে এবং গাছে পাতার পরিমাণ বাড়বে। পাতার জন্য সজিনা চাষ করলে গাছকে বেশি লম্বা হতে দেওয়া উচিত নয়। বরং গাছকে ঝোপালো নিচু রাখা গেলে পাতা সংগ্রহ করা সহজ হয় এবং নতুন শাখা তৈরির সুযোগ বাড়ে।

সার পানি ব্যবস্থাপনায় নজর দিন

বারবার পাতা সংগ্রহ করতে হলে গাছকে নিয়মিত পুষ্টি দিতে হবে। বিশেষ করে প্রতিবার পাতা বা কচি ডাল সংগ্রহের পর গাছের গোড়ায় পরিমাণমতো জৈব সার দেওয়া ভালো। ভার্মিকম্পোস্ট, পচা গোবর বা কম্পোস্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। জৈব পদ্ধতিতে সরিষার খৈলও ব্যবহার করা যায়। তবে খৈল সরাসরি বেশি পরিমাণে না দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে। পাতা উৎপাদনের জন্য গাছের সবুজ বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী নাইট্রোজেনসমৃদ্ধ সার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত সার ব্যবহার না করে মাটির অবস্থা গাছের বৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে সার প্রয়োগ করাই ভালো। সজিনা গাছের মাটি হালকা ভেজা রাখা প্রয়োজন। কিন্তু গোড়ায় পানি জমে থাকলে শিকড় কাণ্ড পচে যেতে পারে। শুষ্ক মৌসুমে নিয়মিত সেচ দিতে হবে এবং বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

কখন এবং কীভাবে সজিনা পাতা সংগ্রহ করবেন

সজিনা পাতার পুষ্টিমান ভালো রাখতে এবং গাছের দ্রুত পুনরায় পাতা উৎপাদন নিশ্চিত করতে সঠিক নিয়মে পাতা সংগ্রহ করা জরুরি। বীজ থেকে গাছ তৈরি করলে সাধারণত ৬০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে প্রথমবার পাতা সংগ্রহের উপযোগী হতে পারে। তবে গাছের বৃদ্ধি পরিচর্যার ওপর সময় কিছুটা কম-বেশি হতে পারে। পাতা সংগ্রহের জন্য খুব ভোর বা বিকেলের সময় বেছে নেওয়া ভালো। প্রচণ্ড রোদের সময় পাতা সংগ্রহ না করাই ভালো। হাত দিয়ে টেনে পাতা ছিঁড়ে না নিয়ে ধারালো কাঁচি বা সিকেচার দিয়ে কচি ডালসহ পাতা কেটে নেওয়া উচিত। এতে কাণ্ডের ক্ষতি কম হয় এবং গাছে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকিও কমে। গাছের একেবারে নিচের অংশ না কেটে মাটি থেকে অন্তত . থেকে ফুট উচ্চতা বজায় রেখে ওপরের কচি শাখাগুলো সংগ্রহ করা ভালো। সঠিক পরিচর্যা পর্যাপ্ত পানি-সার পেলে সাধারণত ৩৫ থেকে ৪৫ দিন পরপর নতুন পাতা সংগ্রহ করা সম্ভব। এভাবে বছরে একাধিকবার পাতা সংগ্রহ করা যায়।

সংগ্রহের পর পাতার পুষ্টিগুণ ধরে রাখুন

সজিনা পাতা সংগ্রহের পর দ্রুত পরিষ্কার শুকানোর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রথমে পরিষ্কার ঠান্ডা পানিতে পাতাগুলো ধুয়ে ধুলাবালি দূর করতে হবে। এরপর ভালোভাবে পানি ঝরিয়ে নিতে হবে। সজিনা পাতা শুকানোর ক্ষেত্রে সরাসরি কড়া রোদ এড়িয়ে চলা ভালো। আলো-বাতাস চলাচল করে এমন ছায়াযুক্ত জায়গায় পাতাগুলো পাতলা করে ছড়িয়ে শুকাতে হবে। পাতা সম্পূর্ণ শুকিয়ে মচমচে হয়ে গেলে তা গুঁড়ো করে বায়ুরোধী পাত্রে সংরক্ষণ করা যায়। পরিষ্কার শুষ্ক পরিবেশে সংরক্ষণ করলে সজিনা পাতার গুণমান দীর্ঘ সময় ভালো রাখা সম্ভব।

রোগ পোকা থেকে গাছ রক্ষা করুন

সজিনার কচি পাতায় বিভিন্ন ধরনের পোকা মাকড়ের আক্রমণ হতে পারে। নিয়মিত গাছ পর্যবেক্ষণ করলে শুরুতেই সমস্যা শনাক্ত করা সম্ভব। জৈব পদ্ধতিতে পোকা নিয়ন্ত্রণের জন্য নিম তেল ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে যেকোনো জৈব বা রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারের আগে পণ্যের লেবেলে দেওয়া অনুমোদিত মাত্রা ব্যবহারের নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি। সজিনা গাছের গোড়ায় পানি জমে থাকলে ছত্রাকজনিত রোগ গোড়া পচনের ঝুঁকি বাড়ে। তাই জমিতে ভালো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। প্রয়োজনে অনুমোদিত জৈব ছত্রাকনাশক, যেমন ট্রাইকোডার্মাভিত্তিক পণ্য, লেবেলের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার করা যেতে পারে।

অল্প জায়গায় সজিনা হতে পারে বাড়তি আয়ের উৎস

বারোমাসি সজিনার চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, একই গাছ থেকে বারবার পাতা সংগ্রহ করা যায়। পরিকল্পিতভাবে ঘন করে চারা লাগানো, নিয়মিত ছাঁটাই, সঠিক সার পানি ব্যবস্থাপনা এবং সময়মতো পাতা সংগ্রহ করতে পারলে অল্প জমি থেকেও ভালো পরিমাণ পাতা উৎপাদন করা সম্ভব। শুধু বাণিজ্যিক চাষ নয়, বাড়ির আঙিনা বা ছাদবাগানেও কয়েকটি সজিনা গাছ পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মনে রাখবেন, সজিনা চাষে বেশি ফলনের মূল রহস্য শুধু বেশি গাছ লাগানো নয়; বরং গাছকে নিয়মিত ছাঁটাই করে নতুন শাখা তৈরি করা এবং প্রতিটি কাটাইয়ের পর গাছকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পানি দেওয়া। সঠিক পরিচর্যা করতে পারলে বারোমাসি সজিনা একই সঙ্গে পুষ্টি, পারিবারিক খাদ্যনিরাপত্তা এবং বাড়তি আয়ের একটি কার্যকর উৎস হয়ে উঠতে পারে।