টবে অর্গানিক (জৈব) উপায়ে স্ট্রবেরি চাষ করা বেশ সহজ এবং রোমাঞ্চকর। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়া সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যকর ও বিষমুক্ত স্ট্রবেরি পাওয়ার জন্য সঠিক জাত নির্বাচন, মাটি তৈরি এবং সঠিক পরিচর্যাই মূল চাবিকাঠি।
নিচে টবে অর্গানিক স্ট্রবেরি চাষের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দেওয়া হলো:
উপযুক্ত সময় ও জাত নির্বাচন উপযুক্ত সময়: বাংলাদেশে স্ট্রবেরি চাষের আদর্শ সময় হলো অক্টোবর থেকে নভেম্বর (কার্তিক-অগ্রহায়ণ) মাস। এই সময়ে চারা রোপণ করলে শীতকালে (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) ভালো ফলন পাওয়া যায়। জাত নির্বাচন: টবে চাষের জন্য Festival, Sweet Charlie, RABI-1 বা BARI Strawberry-1 জাতগুলো বেশ জনপ্রিয় ও মিষ্টি ফল দেয়।
টব নির্বাচন ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা টবের আকার: ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি প্লাস্টিক বা মাটির টব অথবা টবের ড্রাম নির্বাচন করুন। স্ট্রবেরির শিকড় খুব গভীরে যায় না, তাই খুব গভীর টবের প্রয়োজন নেই, তবে চওড়া হওয়া ভালো। পানি নিষ্কাশন: টবের নিচে অন্তত ২-৩টি ছিদ্র থাকতে হবে। ছিদ্রের ওপর ইটের কুচি বা চাড়ির টুকরো এবং তার ওপর কিছুটা মোটা বালু বিছিয়ে দিন, যাতে অতিরিক্ত পানি সহজে বের হয়ে যেতে পারে।
অর্গানিক মাটির রেসিপি: অর্গানিক উপায়ে আদর্শ মাটি তৈরি স্ট্রবেরি গাছ হালকা, ঝুরঝুরে ও পানি নিষ্কাশন উপযোগী মাটি পছন্দ করে। বেলে-দোআঁশ মাটি: ৫০% পচাগোবর/ভার্মিকম্পোস্ট (কেঁচো সার): ৩০% কোকোপিট ও কাঠের গুঁড়ো/বালু: ১০% নিমখৈল, হাঁড়ের গুঁড়ো ও কাঠের ছাই: ১০% (নিমখৈল মাটিবাহিত রোগ ও পোকা প্রতিরোধে কাজ করে, ছাই পটাশিয়ামের চাহিদা মেটায়)। টিপস: মাটির সব উপকরণ ভালোভাবে মিশিয়ে টবে ভরে ১০-১২ দিন হালকা পানি দিয়ে রোদে রেখে দিন, এতে মাটি জীবাণুমুক্ত ও পুষ্টিকর হয়ে উঠবে।
চারা রোপণ পদ্ধতি: ১. সুস্থ চারা সংগ্রহ: টিস্যু কালচার বা রানার থেকে তৈরি সুস্থ, সতেজ এবং রোগমুক্ত চারা সংগ্রহ করুন। ২. রোপণের নিয়ম: চারার গোড়ার ক্রাউন (Crown) অংশটি (যেখান থেকে পাতা বের হয়) মাটির ঠিক ওপরে রাখতে হবে। ক্রাউন মাটির নিচে চাপা পড়লে পচে যাবে, আবার বেশি ওপরে থাকলে চারা শুকিয়ে যাবে। চারা রোপণের পর হালকা হাতে চারপাশের মাটি চেপে দিন এবং স্প্রে করে পানি দিন। রোপণের প্রথম ৩-৪ দিন চারাটি ছায়াযুক্ত স্থানে রাখুন, তারপর আলো-বাতাসযুক্ত জায়গায় নিয়ে যান।
আলো, সেচ ও মালচিং (Mulching) সূর্যের আলো: স্ট্রবেরি গাছের জন্য দিনে অন্তত ৫–৬ ঘণ্টা রোদ অত্যন্ত জরুরি। টবটি ছাদের বা বারান্দার রোদযুক্ত স্থানে রাখুন। সেচ ব্যবস্থাপনা: স্ট্রবেরি গাছে অতিরিক্ত পানি দিলে শিকড় ও পাতা পচে যায়। মাটির ওপরের অংশ শুকিয়ে গেলে তবেই পানি দিন। সবসময় সকালের দিকে গাছে পানি দেওয়া ভালো। মালচিং (খুবই গুরুত্বপূর্ণ): স্ট্রবেরি ফল যদি সরাসরি মাটির সংস্পর্শে আসে, তবে পচে যায়। তাই টবের মাটির ওপর শুকনো খড়, শুকনো পাতা বা কোকোপিট দিয়ে ঢেকে (Mulching) দিন। এতে ফল মাটিতে ঠেকবে না এবং মাটির আর্দ্রতাও বজায় থাকবে।
পরিচর্যা: অর্গানিক সার ও পরিচর্যা গাছে ফুল ও ফল ধরে রাখতে এবং ভালো ফলনের জন্য জৈব উপায়ে সার প্রয়োগ করতে হবে: সরিষার খৈল পচা পানি: প্রতি ১৫ দিনে একবার খৈল ১ সপ্তাহ ভিজিয়ে রেখে সেই পানি ৪ গুণ পাতলা করে গাছের গোড়ায় দিন। কলা খোসার তরল সার: পটাশিয়ামের জোগান দিতে কলার খোসা ২-৩ দিন পানিতে ভিজিয়ে রেখে সেই পানি গাছে দিন। এতে প্রচুর ফুল-ফল আসবে। হাঁড়ের গুঁড়ো: মাসে একবার ১ চামচ হাঁড়ের গুঁড়ো মাটির চারপাশে খুঁচিয়ে ছড়িয়ে দিন।
পোকা-মাকড়: পোকা-মাকড় ও রোগবালাই প্রতিকার (১০০% অর্গানিক) অর্গানিক চাষে রাসায়নিক কীটনাশক সম্পূর্ণ বর্জনীয়। পিঁপড়া ও মাকড়সা: স্ট্রবেরি ফল মিষ্টি হওয়ায় গুঁড়ো পিঁপড়ার আক্রমণ হতে পারে। প্রতিরোধে টবের চারপাশে কাঠের ছাই ছড়িয়ে দিন। ছত্রাক বা পচন রোগ: পাতা বা ডালে বাদামি দাগ দেখলে আক্রান্ত অংশ কেটে ফেলুন। প্রতি ১০ দিনে একবার নিম তেল (১ লিটার পানিতে ১ চা চামচ নিমতেল ও কয়েক ফোটা তরল সাবান মিশিয়ে) ভালো করে স্প্রে করুন। পাখির আক্রমণ: ফল লাল হতে শুরু করলে পাখি বা দাঁড়কাক খেতে পারে। এর জন্য নেটিং (Netting) বা জাল দিয়ে টবটি ঢেকে রাখতে পারেন।
ফল সংগ্রহ: রোপণ থেকে ফল সংগ্রহ রোপণের প্রায় ৬০ থেকে ৮০ দিনের মধ্যে গাছে ফল পাকা শুরু হয়। ফল যখন সম্পূর্ণ লাল টকটকে হবে, তখন কাঁচি দিয়ে বোঁটাসহ কেটে সংগ্রহ করুন। গাছের অতিরিক্ত লতি বা রানার (Runner) বের হলে তা কেটে দিন, এতে গাছের শক্তি ফলের পুষ্টিতে ব্যবহৃত হবে।
সঠিক পরিচর্যা ও নিয়মিত যত্ন নিলে একটি টবের গাছ থেকেই পুরো শীতকালজুড়ে সুস্বাদু ও বিষমুক্ত অর্গানিক স্ট্রবেরি উপহার পাওয়া সম্ভব।