বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ফল চাষের ক্ষেত্রে থাই ও ভিয়েতনামী বারোমাসি মাল্টা দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। প্রচলিত অনেক মাল্টা জাতের তুলনায় এই জাতের অন্যতম আকর্ষণ হলো, সঠিক পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনা করলে একই গাছে একই সময়ে ফুল, কাঁচা ফল এবং পাকা ফল দেখা যেতে পারে। ফলে বছরের বিভিন্ন সময়ে ফল বাজারজাত করার সুযোগ তৈরি হয় এবং কৃষক ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনাও পান। তবে ভালো ফলন ও দীর্ঘমেয়াদি লাভের জন্য শুধু উন্নত জাতের চারা রোপণ করলেই হবে না। জমি নির্বাচন থেকে শুরু করে চারা রোপণ, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা, ছাঁটাই, রোগ-পোকা নিয়ন্ত্রণ এবং সময়মতো ফল সংগ্রহ—প্রতিটি ধাপেই যত্নশীল হতে হবে।
মাল্টা চাষের জন্য কেমন জমি দরকার
মাল্টা গাছের জন্য উঁচু, পর্যাপ্ত সূর্যালোকযুক্ত এবং সুনিষ্কাশিত জমি সবচেয়ে উপযোগী। বেলে-দোআঁশ বা দোআঁশ মাটি এই চাষের জন্য ভালো। মাটির pH সাধারণত ৫.৫ থেকে ৭.৫-এর মধ্যে থাকলে গাছ ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে। মাল্টা গাছ জলাবদ্ধতা একেবারেই পছন্দ করে না। জমিতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে শিকড় পচে যেতে পারে এবং ধীরে ধীরে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই বাগান করার আগে পানি নিষ্কাশনের বিষয়টি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
সুস্থ ও ভালো জাতের চারা নির্বাচন করুন
বাণিজ্যিক মাল্টা বাগানের সফলতা অনেকটাই নির্ভর করে ভালো চারার ওপর। থাই বা ভিয়েতনামী বারোমাসি মাল্টার ক্ষেত্রে সুস্থ, সবল ও রোগমুক্ত কলমের চারা নির্বাচন করা উচিত। বীজ থেকে তৈরি গাছে মাতৃগাছের বৈশিষ্ট্য সবসময় ঠিকভাবে বজায় থাকে না এবং ফল ধরতেও বেশি সময় লাগতে পারে। তাই বিশ্বস্ত ও অনুমোদিত নার্সারি থেকে মানসম্মত কলমের চারা সংগ্রহ করা নিরাপদ। চারা কেনার সময় গাছের গোড়া, শিকড়, কাণ্ড ও পাতায় কোনো রোগ বা পোকার আক্রমণ আছে কি না, সেটিও ভালোভাবে দেখে নিতে হবে।
জমি প্রস্তুত ও গর্ত তৈরি
চারা রোপণের অন্তত ১৫ থেকে ২০ দিন আগে জমি ভালোভাবে চাষ করে আগাছামুক্ত ও সমতল করে নিতে হবে। বাগানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের জন্য সাধারণভাবে ৫ মিটার × ৫ মিটার দূরত্বে চারা লাগানো যেতে পারে। নির্ধারিত স্থানে প্রায় ২ ফুট দৈর্ঘ্য, ২ ফুট প্রস্থ ও ২ ফুট গভীরতার গর্ত তৈরি করা ভালো। গর্ত করার পর কিছুদিন খোলা রেখে রোদে শুকিয়ে নিলে মাটির ক্ষতিকর জীবাণু ও পোকামাকড়ের ঝুঁকি কমে। গর্ত ভরাটের সময় পচা গোবর বা ভার্মিকম্পোস্টের সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী টিএসপি, পটাশ, জিপসাম, বোরন ও জিংকসহ অন্যান্য সার মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। তবে মাটির পরীক্ষা অনুযায়ী সার ব্যবহার করাই সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি।
চারা রোপণের সঠিক সময় ও পদ্ধতি
মে-জুন এবং সেপ্টেম্বর-নভেম্বর মাস মাল্টার চারা রোপণের জন্য উপযুক্ত সময়। পর্যাপ্ত সেচের ব্যবস্থা থাকলে অন্যান্য সময়েও চারা রোপণ করা যায়। চারা রোপণের সময় পলিব্যাগ সাবধানে খুলে মাটির বলসহ গর্তের মাঝখানে সোজা করে বসাতে হবে। চারার গোড়ার মাটি সামান্য উঁচু করে দিতে হবে, যাতে বৃষ্টির পানি সেখানে জমে না থাকে। রোপণের পর চারাটি যাতে বাতাসে হেলে না পড়ে, সেজন্য খুঁটি দিয়ে বেঁধে দেওয়া ভালো। পাশাপাশি গবাদিপশু ও অন্যান্য ক্ষতি থেকে চারা রক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
বারোমাসি ফলনের জন্য সার ব্যবস্থাপনা
মাল্টা গাছ দীর্ঘদিন ধরে ফল দিতে হলে গাছকে নিয়মিত পুষ্টি দিতে হবে। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছে বছরে জৈব সার, ইউরিয়া, টিএসপি, পটাশ এবং প্রয়োজনীয় অনুখাদ্য দিতে হয়। তবে সব সার একবারে প্রয়োগ না করে বছরের বিভিন্ন সময়ে ভাগ করে দেওয়া ভালো। সাধারণভাবে বর্ষার শুরু, বর্ষার শেষ এবং শীতের শেষের দিকে সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। সার গাছের একেবারে গোড়ায় না দিয়ে গাছের কাণ্ড থেকে কিছুটা দূরে ছাতার আকৃতিতে ছড়িয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। এতে গাছের বিস্তৃত শিকড় সার থেকে পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে। সারের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে মাটি পরীক্ষা ও গাছের বয়স বিবেচনা করা উচিত।
সেচ ও পানি নিষ্কাশনে সতর্ক থাকুন
মাল্টা গাছ যেমন অতিরিক্ত পানি সহ্য করতে পারে না, তেমনি দীর্ঘদিন পানির অভাবও সহ্য করতে পারে না। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে এবং ফুল ও ফল গুটি বাঁধার সময় মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকা জরুরি। মাটি বেশি শুকিয়ে গেলে হালকা সেচ দিতে হবে। পানির অভাবে ফুল ঝরে যেতে পারে এবং ফলের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে বর্ষাকালে বাগানে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। প্রতিটি সারির মাঝখানে নালা বা ড্রেনেজ ব্যবস্থা রাখলে অতিরিক্ত পানি দ্রুত বের করে দেওয়া সম্ভব হয়।
গাছ ছাঁটাই করলে ফলন ও গাছের স্বাস্থ্য ভালো থাকে
মাল্টা গাছের কাঠামো সুন্দর ও শক্ত রাখতে ছোটবেলা থেকেই নিয়মিত ছাঁটাই করা দরকার। মাটির ওপর থেকে অন্তত ১ থেকে ১.৫ ফুট পর্যন্ত কাণ্ড ডালপালামুক্ত রাখা ভালো। গাছের ভেতরের মরা, রোগাক্রান্ত ও দুর্বল ডাল নিয়মিত কেটে ফেলতে হবে। এতে গাছের ভেতরে আলো-বাতাস সহজে প্রবেশ করে এবং রোগের ঝুঁকি কমে। শুষ্ক মৌসুমে গাছের গোড়ায় খড়, শুকনো পাতা বা অন্যান্য জৈব উপাদান দিয়ে মালচিং করলে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা যায়। একই সঙ্গে আগাছার বৃদ্ধিও কিছুটা কমে।
রোগ ও পোকামাকড় থেকে বাগান রক্ষা
মাল্টা বাগানে সাইট্রাস ক্যানকার, ডাইব্যাক ও গ্রিনিং রোগের ঝুঁকি থাকে। এছাড়া লেদা পোকা ও সাইট্রাস সাইলার মতো পোকার আক্রমণও দেখা দিতে পারে। রোগাক্রান্ত ডাল বা অংশ দ্রুত কেটে বাগান থেকে সরিয়ে ধ্বংস করতে হবে। প্রয়োজনে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। একইভাবে পোকার উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। কোনো কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহারের সময় অবশ্যই পণ্যের লেবেলে উল্লেখ করা অনুমোদিত মাত্রা, ব্যবহারের সময় এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। অপ্রয়োজনীয়ভাবে বারবার কীটনাশক ব্যবহার না করে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করাই ভালো।
কখন মাল্টা সংগ্রহ করবেন
সঠিকভাবে পরিচর্যা করা কলমের মাল্টা চারা সাধারণত রোপণের প্রায় দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে ফল দিতে শুরু করতে পারে। তবে প্রথম দিকে গাছে অতিরিক্ত ফল না রাখলে গাছের কাঠামো ও শিকড় আরও শক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। ফল পরিপক্ব হতে সাধারণত কয়েক মাস সময় লাগে। ফলের রং গাঢ় সবুজ থেকে হালকা সবুজ বা হলুদাভ হতে শুরু করলে তা সংগ্রহের উপযুক্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে কি না তা যাচাই করা যায়। পরিপক্বতার পাশাপাশি বাজারের চাহিদা ও দূরত্ব বিবেচনা করেও ফল সংগ্রহের সময় নির্ধারণ করা উচিত। ভালো পরিচর্যা ও উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা থাকলে একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফলন পাওয়া সম্ভব। তবে ফলনের পরিমাণ গাছের জাত, বয়স, মাটি, পরিচর্যা, আবহাওয়া এবং রোগ-পোকার পরিস্থিতির ওপর অনেকটাই নির্ভর করে।
দীর্ঘমেয়াদি লাভের জন্য পরিকল্পিত পরিচর্যা
থাই ও ভিয়েতনামী বারোমাসি মাল্টা শুধু একটি ফলের গাছ নয়, সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটি দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক বিনিয়োগে পরিণত হতে পারে। ভালো চারা নির্বাচন, সুনিষ্কাশিত জমি, সঠিক দূরত্বে রোপণ, নিয়মিত সার ও সেচ, সময়মতো ছাঁটাই এবং রোগ-পোকা নিয়ন্ত্রণ—এই বিষয়গুলো ঠিকভাবে অনুসরণ করলে মাল্টা বাগান থেকে দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। একজন কৃষকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বারোমাসি মাল্টাকে শুধু ‘বারোমাসি ফলন দেয়’ এমন একটি জাত হিসেবে না দেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি বাগান ফসল হিসেবে পরিকল্পনা করা। সঠিক জাত, সুস্থ চারা এবং নিয়মিত পরিচর্যার সমন্বয়ই পারে একটি মাল্টা বাগানকে লাভজনক ও টেকসই কৃষি উদ্যোগে পরিণত করতে।