বাংলাদেশে নারিকেল একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ও গৃহস্থালি ফসল। উপকূলীয় অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় নারিকেল চাষ ক্রমেই বাড়ছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারিকেলের সবচেয়ে ক্ষতিকর কীটের মধ্যে মাকড়সা পোকা (Coconut Mite বা Aceria guerreronis) অন্যতম। এ ক্ষুদ্রাকার পোকা খালি চোখে প্রায় দেখা যায় না, কিন্তু এটি কচি নারিকেলের খোসার নিচে লুকিয়ে থেকে রস শোষণ করে। ফলে নারিকেলের আকার ছোট হয়ে যায়, খোসা খসখসে ও কালচে হয়, অনেক সময় ফল ফেটে যায় এবং অকালে ঝরে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, মারাত্মক আক্রমণে নারিকেল উৎপাদন ৩০–৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। তাই সময়মতো সঠিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
নারিকেলের মাকড়সা পোকা কী?
নারিকেলের মাকড়সা পোকা একটি অতি ক্ষুদ্র এরিওফাইড মাইট (Eriophyid mite)। এটি সাধারণত সদ্য গঠিত কচি নারিকেলের বোঁটার চারপাশের আবরণী অংশ (perianth)-এর নিচে আশ্রয় নেয়। সেখানে ডিম পাড়ে, বংশবিস্তার করে এবং ফলের কোমল অংশ থেকে রস শোষণ করে।
আক্রমণের লক্ষণ
কৃষক সহজেই নিচের লক্ষণ দেখে মাকড়সা পোকার আক্রমণ শনাক্ত করতে পারেন:
- কচি নারিকেলের বোঁটার চারপাশে বাদামি বা কালচে দাগ দেখা যায়।
- খোসা খসখসে, কর্কশ ও শক্ত হয়ে যায়।
- ফলের গায়ে ফাটল বা চির ধরতে পারে।
- নারিকেলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং ফল ছোট আকারের হয়।
- ভেতরের শাঁস কমে যায় এবং পানির পরিমাণ হ্রাস পায়।
- কচি ফল অকালে ঝরে পড়ে।
- বেশি আক্রমণে একই গাছে অধিকাংশ ফল বিকৃত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশে শুষ্ক ও শীতকালে এ পোকার আক্রমণ সাধারণত বেশি দেখা যায়, আর বর্ষাকালে আর্দ্রতা ও বৃষ্টিপাত বাড়লে এর সংখ্যা অনেক সময় কমে যায়।
কেন এই পোকার আক্রমণ বাড়ে?
মাকড়সা পোকার বিস্তারে কয়েকটি কারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে:
- দীর্ঘদিন শুষ্ক আবহাওয়া,
- বাগানে অপরিষ্কার পরিবেশ,
- আক্রান্ত ফল গাছে রেখে দেওয়া,
- দুর্বল ও অপরিচর্য গাছ,
- একই এলাকায় একাধিক আক্রান্ত গাছের উপস্থিতি।
কৃষকের করণীয়: সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা (IPM)
নারিকেলের মাকড়সা পোকা দমনে শুধুমাত্র কীটনাশকের ওপর নির্ভর না করে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (Integrated Pest Management-IPM) অনুসরণ করা সবচেয়ে কার্যকর।
১. নিয়মিত পর্যবেক্ষণ
প্রতি ১০–১৫ দিন অন্তর গাছের কচি ফল পরীক্ষা করতে হবে। বোঁটার চারপাশে বাদামি দাগ, খসখসে খোসা বা ফাটল দেখা গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
২. আক্রান্ত ফল অপসারণ
- বেশি আক্রান্ত কচি ফল সংগ্রহ করে মাটিতে পুঁতে ফেলতে বা নষ্ট করতে হবে।
- আক্রান্ত ফল গাছের নিচে ফেলে রাখা যাবে না।
- বাগান সবসময় পরিষ্কার রাখতে হবে।
৩. গাছের পরিচর্যা ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা
সুস্থ ও সবল গাছে পোকার ক্ষতি তুলনামূলক কম হয়। তাই:
- প্রয়োজন অনুযায়ী জৈব সার, পচা গোবর বা কম্পোস্ট ব্যবহার করতে হবে।
- সুষম মাত্রায় ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি ও জিপসাম প্রয়োগ করতে হবে।
- দীর্ঘ সময় খরা থাকলে সেচের ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. নিমভিত্তিক দমন পদ্ধতি
নিমজাতীয় উপাদান মাকড়সা পোকার সংখ্যা কমাতে সহায়ক।
- নিম তেল (Neem oil) ২% দ্রবণ কচি ফলের বোঁটার চারপাশে ভালোভাবে স্প্রে করা যেতে পারে।
- স্প্রের সঙ্গে অল্প পরিমাণ তরল সাবান মিশালে দ্রবণটি ফলের গায়ে ভালোভাবে লেগে থাকে।
- ১৫–২০ দিন পর পুনরায় স্প্রে করলে কার্যকারিতা বাড়ে।
৫. অনুমোদিত মাইটনাশক (Acaricide) ব্যবহার
যদি আক্রমণ অর্থনৈতিক ক্ষতির পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তবে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী অনুমোদিত মাইটনাশক ব্যবহার করতে হবে। সাধারণভাবে ব্যবহৃত কিছু কার্যকর উপাদান হলো:
- Abamectin,
- Spiromesifen,
- Fenpyroximate,
- Propargite (অনুমোদিত হলে)।
ব্যবহারের সময় অবশ্যই:
- লেবেলে উল্লেখিত মাত্রা ও নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে,
- কচি ফলের বোঁটার চারপাশে ও আবরণী অংশে স্প্রে পৌঁছাতে হবে,
- প্রয়োজন হলে ১৫–২০ দিন পর দ্বিতীয়বার প্রয়োগ করতে হবে,
- একই ধরনের মাইটনাশক বারবার ব্যবহার না করে পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন করতে হবে।
৬. প্রতিবেশী গাছেও ব্যবস্থা নেওয়া
মাকড়সা পোকা সহজেই এক গাছ থেকে অন্য গাছে ছড়িয়ে পড়ে। তাই একটি গাছে আক্রমণ দেখা দিলে পাশের নারিকেল গাছগুলোও পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এলাকায় সমন্বিতভাবে দমন কার্যক্রম পরিচালনা করলে ফলাফল অনেক ভালো হয়।
রাসায়নিক ব্যবহারে সতর্কতা
- অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করবেন না।
- ফল সংগ্রহের আগে প্রস্তাবিত অপেক্ষাকাল (Pre-harvest interval) মেনে চলতে হবে।
- স্প্রে করার সময় হাতমোজা, মাস্ক ও সুরক্ষা পোশাক ব্যবহার করা উচিত।
- শিশু, গবাদিপশু ও পানির উৎস থেকে কীটনাশক দূরে রাখতে হবে।
কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ কেন জরুরি?
অনেক সময় নারিকেলের ফল ফেটে যাওয়া বা খসখসে হওয়ার কারণ ছত্রাক, পুষ্টির ঘাটতি বা অন্যান্য বালাই-ও হতে পারে। তাই নিশ্চিতভাবে মাকড়সা পোকার আক্রমণ শনাক্ত করতে উপজেলা কৃষি অফিস বা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (DAE) কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর উপায়।
উপসংহার
নারিকেলের মাকড়সা পোকা বাংলাদেশের নারিকেল চাষে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বালাই। তবে নিয়মিত বাগান পর্যবেক্ষণ, আক্রান্ত ফল অপসারণ, সুষম সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা, নিমভিত্তিক স্প্রে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদিত মাইটনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে এ পোকার আক্রমণ সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, ফলের গুণগত মান উন্নত হবে এবং কৃষকের লাভও বাড়বে।
সংক্ষিপ্ত তথ্যসূত্র
Plantwise Knowledge Bank. Coconut Mite (Aceria guerreronis).
১. Islam, M.N. et al. (2018). Management of Coconut Mite in Bangladesh Involving Communities as Implanter. Journal of Coconut Community.
২. বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE), বিভিন্ন বালাই ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা.
৩. Wikipedia. Aceria guerreronis (Coconut mite).