ভূমিকা
আমের গাছে মুকুল আসা মানেই কাঙ্ক্ষিত ফলনের সম্ভাবনা তৈরি হওয়া। কিন্তু মুকুল আসার পর ফুল শুকিয়ে যাওয়া, ঝরে পড়া এবং পরবর্তীতে কচি আম ঝরে যাওয়ার কারণে অনেক বাগানেই ফলন প্রত্যাশার তুলনায় কম হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের আম উৎপাদনকারী অঞ্চলে মুকুল ও ফল ঝরার সঙ্গে প্রতিকূল আবহাওয়া, পানির ঘাটতি, পুষ্টির ভারসাম্যহীনতা, হপারসহ ক্ষতিকর পোকা এবং ছত্রাকজনিত রোগের সম্পর্ক রয়েছে। তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—আমগাছে বিপুলসংখ্যক ফুল এলেও সব ফুল ফলে পরিণত হয় না। স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় অনেক ফুল ও কচি ফল ঝরে যায়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের চাঁপাইনবাবগঞ্জের গবেষণায় বিভিন্ন জাতের আমে ফল সেটের পর প্রথম ২০ দিনেই প্রায় ৫০ শতাংশ ফল ঝরে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে এবং পরবর্তী প্রায় ৫০ দিন পর্যন্ত ফল ঝরা চলতে দেখা গেছে। জাতভেদে মোট ফল ঝরার হারও ব্যাপকভাবে ভিন্ন ছিল। অতএব লক্ষ্য হওয়া উচিত স্বাভাবিক ফল ঝরা বন্ধ করা নয়; বরং অস্বাভাবিক মুকুল ও ফল ঝরা কমিয়ে সুস্থ ফল সেট নিশ্চিত করা।
আমের মুকুল কেন ঝরে পড়ে?
আমের মুকুল ঝরে পড়ার একটি মাত্র কারণ নেই। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক কারণ একই সঙ্গে কাজ করে। বাংলাদেশের গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী প্রধান কারণগুলো হলো—
১. প্রতিকূল আবহাওয়া; ২. মাটিতে পর্যাপ্ত রস বা আর্দ্রতার অভাব; ৩. অতিরিক্ত বৃষ্টি বা জলাবদ্ধতা; ৪. হপার ও অন্যান্য রসচোষা পোকার আক্রমণ; ৫. পাউডারি মিলডিউ ও অন্যান্য রোগ; ৬. পুষ্টির ঘাটতি বা ভারসাম্যহীনতা; ৭. পরাগায়নের সমস্যা; ৮. অতিরিক্ত ছায়া ও ঘন ডালপালা; ৯. অনুপযুক্ত কীটনাশক প্রয়োগ; ১০. জাতভেদে স্বাভাবিক ফল ঝরার পার্থক্য।
বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের তথ্যেও রোগ, পোকা, পুষ্টির ঘাটতি এবং পানির ঘাটতিকে আমের ফল ঝরা ও অন্যান্য ফলজনিত সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মুকুল ঝরা রোধে প্রথম কাজ—কারণ শনাক্ত করা
মুকুল ঝরছে দেখেই কীটনাশক স্প্রে করা সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি। প্রথমে দেখতে হবে মুকুলে কী ধরনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। যদি মুকুল শুকিয়ে বাদামি হয়ে যায় এবং সাদা গুঁড়ার মতো আবরণ দেখা যায়, তাহলে ছত্রাকজনিত রোগের সম্ভাবনা বেশি। মুকুলে অসংখ্য ছোট পোকা দেখা গেলে বা আঠালো পদার্থ থাকলে হপার বা রসচোষা পোকার আক্রমণ হতে পারে। আবার রোগ-পোকার লক্ষণ না থাকলেও দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলে মাটির আর্দ্রতার ঘাটতির কারণে মুকুল ও কচি ফল ঝরতে পারে। অর্থাৎ লক্ষণ দেখে কারণ নির্ণয়, তারপর ব্যবস্থা গ্রহণ—এটাই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।
১. আমের মুকুলে হপার পোকা দমন
আমের মুকুল ঝরার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ ম্যাঙ্গো হপার। পূর্ণবয়স্ক ও নিম্ফ উভয় অবস্থায় এরা মুকুল ও কচি অংশের রস শোষণ করে। আক্রমণ বেশি হলে মুকুল শুকিয়ে যায় এবং ফুল ও কচি ফল ঝরে পড়ে। হপার আক্রমণের আরেকটি ক্ষতিকর দিক হলো, পোকা আঠালো মধুরস নিঃসরণ করে। এই মধুরস মুকুলে জমে গেলে পরাগরেণু আটকে যেতে পারে এবং পরাগায়ন ব্যাহত হয়। বাংলাদেশি কৃষি সম্প্রসারণমূলক তথ্যেও হপারকে মুকুল শুকিয়ে ঝরে পড়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
হপার দমনে করণীয়
মুকুল বের হওয়ার পর থেকে নিয়মিত মুকুল পরীক্ষা করতে হবে। বাগান অতিরিক্ত ঘন হলে হালকা ছাঁটাই করে আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা উচিত। পোকা দেখা দিলে প্রথমে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে। আক্রমণ অর্থনৈতিক ক্ষতির পর্যায়ে পৌঁছালে বাংলাদেশে নিবন্ধিত কীটনাশক অনুমোদিত মাত্রায় এবং লেবেলের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে।একই কীটনাশক বারবার ব্যবহার না করে প্রয়োজনে ভিন্ন কার্যপদ্ধতির অনুমোদিত উপাদান পর্যায়ক্রমে ব্যবহার করা উচিত।
২. পাউডারি মিলডিউ থেকে মুকুল রক্ষা
আমের মুকুল ঝরে পড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছত্রাকজনিত কারণ হলো পাউডারি মিলডিউ। আক্রান্ত মুকুল ও ফুলে সাদা গুঁড়ার মতো আবরণ দেখা যায়। পরে মুকুল বাদামি হয়ে শুকিয়ে যেতে পারে। আক্রান্ত ফুলে স্বাভাবিক ফল সেট বাধাগ্রস্ত হয়। মুকুলের সময় আর্দ্র ও মেঘলা আবহাওয়া এ রোগের জন্য অনুকূল হতে পারে। তাই বাগানে অতিরিক্ত ঘনত্ব কমিয়ে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রতিকার
আক্রান্ত মুকুল বা উদ্ভিদাংশ যতটা সম্ভব অপসারণ করে বাগানের বাইরে ধ্বংস করতে হবে। রোগের প্রকোপ দেখা দিলে বাংলাদেশে নিবন্ধিত ছত্রাকনাশক কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করা উচিত। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে অকারণে বারবার ছত্রাকনাশক স্প্রে করা উচিত নয়।
৩. অ্যানথ্রাকনোজ ও অন্যান্য রোগ ব্যবস্থাপনা
অ্যানথ্রাকনোজ আমের ফুল, মুকুল ও কচি ফলে ক্ষতি করতে পারে। আক্রান্ত অংশে কালচে বা বাদামি দাগ দেখা দিতে পারে এবং মুকুল শুকিয়ে যেতে পারে। বাগানে পড়ে থাকা রোগাক্রান্ত পাতা, মুকুল ও ফল সরিয়ে ফেলতে হবে। অতিরিক্ত ঘন ডালপালা ছাঁটাই করে আলো-বাতাস চলাচল বাড়াতে হবে। রোগের প্রকোপ বেশি হলে স্থানীয়ভাবে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে রোগ শনাক্ত না করে ওষুধ নির্বাচন করা উচিত নয়।
৪. মুকুলের সময় পানির ঘাটতি দূর করুন
বাংলাদেশের অনেক আমবাগানে শুষ্ক মৌসুমে মাটিতে আর্দ্রতার ঘাটতি দেখা দেয়। বিশেষ করে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে শুষ্ক আবহাওয়া আম উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০২৬ সালের রাজশাহী অঞ্চলের মাঠ পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাপপ্রবাহ ও খরাকে কচি আম ঝরার অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে অতিরিক্ত পানি বা জলাবদ্ধতাও গাছের শিকড়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে।
তাই করণীয়
মুকুল ও ফল সেটের সময়ে মাটির আর্দ্রতা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। প্রয়োজন হলে সেচ দিতে হবে, কিন্তু গাছের গোড়ায় পানি জমিয়ে রাখা যাবে না। গাছের চারপাশে শুকনো ঘাস, খড় বা জৈব মালচ ব্যবহার করলে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা যায়। বাংলাদেশের একটি BARI গবেষণা কর্মসূচিতেও পূর্ণ মুকুল ও ফল সেটের পর্যায়ে সেচ ব্যবস্থাপনা নিয়ে পরীক্ষা পরিচালিত হয়েছে, যা এ পর্যায়ের পানি ব্যবস্থাপনার গুরুত্বকে নির্দেশ করে।
৫. সুষম সার ব্যবস্থাপনা করুন
মুকুল ও ফল সেটের সময় গাছের পুষ্টির চাহিদা বেশি থাকে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে মুকুল দেখামাত্র বেশি ইউরিয়া দিতে হবে। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন প্রয়োগে গাছের কচি vegetative growth বাড়তে পারে এবং গাছের স্বাভাবিক ফুল-ফল উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। বরং মাটি পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশ, জিংক, বোরনসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করতে হবে। বাংলাদেশের BARI-এর গবেষণা কার্যক্রমে আমবাগানে গোবর, ইউরিয়া, TSP, MOP, জিংক ও বোরিক অ্যাসিডসহ বিভিন্ন পুষ্টি ব্যবস্থাপনা নিয়ে মাঠ পরীক্ষা পরিচালিত হয়েছে। তবে গবেষণার কোনো নির্দিষ্ট মাত্রা সব বাগানে সরাসরি প্রয়োগ করা উচিত নয়। গাছের বয়স, জাত, মাটির উর্বরতা ও ফলন লক্ষ্যের ভিত্তিতে সার ব্যবস্থাপনা নির্ধারণ করা উচিত।
৬. বোরন ও অণুপুষ্টির বিষয়ে সতর্ক থাকুন
ফুলের স্বাভাবিক বিকাশ, পরাগায়ন ও ফল সেটে বোরনসহ কিছু অণুপুষ্টির ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশে মুকুল ও ফল ঝরা কমানোর জন্য বোরিক অ্যাসিডসহ বিভিন্ন উপাদানের ব্যবহার নিয়ে গবেষণাও হয়েছে। তবে বোরনের ঘাটতি আছে কি না তা না জেনে বেশি মাত্রায় প্রয়োগ করা উচিত নয়। অতিরিক্ত বোরনও গাছের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। মাটি ও সম্ভব হলে পাতার নমুনা পরীক্ষা করে ঘাটতি অনুযায়ী প্রয়োগ করা সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।
৭. মৌমাছি ও পরাগায়নকারী পোকা সংরক্ষণ করুন
আমের ফুলে ফল সেট হওয়ার জন্য পরাগায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই মুকুলের সময় নির্বিচারে কীটনাশক প্রয়োগ করলে হপার কমলেও পরাগায়নকারী পোকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাগানে মৌমাছি পালন করা এবং আশপাশে উপকারী ফুলের গাছ রাখা পরাগায়নে সহায়ক হতে পারে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ব্যবস্থায় আমের flower and fruit dropping এবং honeybee foraging behaviour—দুই বিষয়েই গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে, যা মুকুল ও ফল ধারণে পরাগায়ন ব্যবস্থার গুরুত্বের প্রতি গবেষকদের আগ্রহ নির্দেশ করে। ফুল ফোটার সময় প্রয়োজন ছাড়া কীটনাশক প্রয়োগ না করাই উত্তম।
৮. মুকুল আসার আগে বাগান প্রস্তুত করুন
মুকুল আসার পর পরিচর্যা শুরু করলে অনেক সময় দেরি হয়ে যায়। তাই মুকুল আসার আগেই—১. শুকনো ও রোগাক্রান্ত ডালপালা কেটে ফেলতে হবে; ২. গাছের ভেতরের অতিরিক্ত ঘন ডাল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে; ৩. বাগানের আগাছা পরিষ্কার করতে হবে; ৪. রোগাক্রান্ত পাতা ও ফল অপসারণ করতে হবে; ৫. মাটি পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ করতে হবে; ৬. পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ঠিক রাখতে হবে। গাছের canopy অতিরিক্ত ঘন হলে আর্দ্রতা বেড়ে রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
৯. মুকুল ঝরা কমাতে রাসায়নিক বৃদ্ধিনিয়ন্ত্রক ব্যবহারে সতর্কতা
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের একটি গবেষণায় আমের ফল ঝরা কমানোর জন্য 2,4-D, NAA, IAA এবং ইউরিয়া বিভিন্ন মাত্রায় পরীক্ষা করা হয়েছিল। গবেষণায় 2,4-D-এর সঙ্গে ২ শতাংশ ইউরিয়া প্রয়োগে পরীক্ষিত অবস্থায় সর্বোচ্চ fruit retention পাওয়া যায়। গবেষণাটি ল্যাংড়া জাতের ১৫ বছর বয়সী গাছে পরিচালিত হয়েছিল এবং ফুল আসার পর্যায় থেকে ১৫ দিন অন্তর তিনবার স্প্রে করা হয়েছিল। এটি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হলেও একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে—গবেষণায় ব্যবহৃত মাত্রা ও প্রয়োগ পদ্ধতি কৃষকের প্রতিটি বাগানে সরাসরি প্রয়োগযোগ্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে 2,4-D, NAA বা অন্য plant growth regulator ভুল মাত্রায় প্রয়োগ করলে ফুল, কচি ফল ও নতুন বৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই বাংলাদেশে নিবন্ধিত পণ্য ও অনুমোদিত ব্যবহারবিধি ছাড়া এসব উপাদান ব্যবহার করা উচিত নয়।
১০. কচি আম ঝরা শুরু হলে কী করবেন
ফুল ঝরে ফলের গুটি হওয়ার পরও কিছু ফল ঝরা স্বাভাবিক। BARI-এর চাঁপাইনবাবগঞ্জের গবেষণায় বিভিন্ন জাতের মধ্যে ফল ঝরার হার উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন পাওয়া গেছে। ল্যাংড়া জাতের ক্ষেত্রে পরীক্ষিত জাতগুলোর মধ্যে fruit retention তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।
তাই কচি আম ঝরছে দেখেই আতঙ্কিত না হয়ে প্রথমে পরীক্ষা করুন—
গাছের নিচে অতিরিক্ত শুকনো ফল পড়ছে কি ? পাতা ও মুকুলে পোকার আক্রমণ আছে কি ? মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা আছে কি ? ফলে রোগের দাগ আছে কি ? গাছের পাতা স্বাভাবিক সবুজ আছে কি ? কারণ শনাক্ত হওয়ার পর ব্যবস্থা নিলে অপ্রয়োজনীয় কীটনাশক প্রয়োগের ঝুঁকি কমে।
আমের মুকুল রক্ষায় কৃষকের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ করণীয়
১. মুকুল আসার আগেই বাগান পরিষ্কার ও প্রয়োজনীয় ছাঁটাই করুন। ২. মাটি পরীক্ষা করে সুষম সার প্রয়োগ করুন। ৩. মুকুলের সময় হপার ও থ্রিপস নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুন। ৪. মুকুলে সাদা আবরণ দেখলে পাউডারি মিলডিউয়ের সম্ভাবনা যাচাই করুন। ৫. রোগাক্রান্ত মুকুল ও ডাল পালা দ্রুত অপসারণ করুন। ৬. দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলে প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দিন।৭. গাছের গোড়ায় পানি জমতে দেবেন না।৮. ফুল ফোটার সময় মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগায়নকারী পোকা রক্ষা করুন। ৯. কারণ শনাক্ত না করে কীটনাশক বা হরমোন প্রয়োগ করবেন না। ১০. বালাই নাশক ব্যবহার করলে বাংলাদেশে নিবন্ধিত পণ্য ও লেবেলে নির্দেশিত মাত্রা অনুসরণ করুন।
যে ভুলগুলো আমের মুকুল বেশি ঝরাতে পারে
অনেক কৃষক মুকুল আসার সঙ্গে সঙ্গে একাধিক কীটনাশক, ছত্রাকনাশক ও সার একসঙ্গে প্রয়োগ করেন। এটি সবসময় ফলন বাড়ায় না; বরং উপকারী পোকা ধ্বংস, ফুলের ক্ষতি এবং অপ্রয়োজনীয় উৎপাদন খরচ বাড়াতে পারে। আরেকটি ভুল হলো দীর্ঘদিন সেচ না দেওয়া অথবা উল্টো অতিরিক্ত সেচ দেওয়া। একইভাবে অতিরিক্ত ইউরিয়া প্রয়োগ, রোগাক্রান্ত মুকুল গাছে রেখে দেওয়া এবং একই ধরনের কীটনাশক বারবার ব্যবহার করাও ক্ষতিকর। সবচেয়ে বড় ভুল হলো সমস্যার কারণ না জেনে ওষুধ প্রয়োগ করা।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি
বাংলাদেশের বাস্তবতায় আমের মুকুল রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো সমন্বিত ব্যবস্থাপনা বা IPM এর মূলনীতি হলো—প্রথমে ভালো বাগান ব্যবস্থাপনা, তারপর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, এরপর রোগ-পোকার সঠিক শনাক্তকরণ এবং সর্বশেষে প্রয়োজন হলে অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার। এ পদ্ধতিতে একই সঙ্গে পানি, পুষ্টি, ছাঁটাই, রোগ, পোকা এবং পরাগায়ন ব্যবস্থাপনা করা হয়। এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ বাংলাদেশের গবেষণায় দেখা গেছে, আমের ফল ঝরা কোনো একক কারণের ফল নয়; জাতভেদেও ফল ঝরার প্রবণতা ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়।
উপসংহার
আমের মুকুল ঝরে পড়া সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব নয়, কারণ ফুল ও কচি ফলের একটি অংশ স্বাভাবিকভাবেই ঝরে যায়। কিন্তু অস্বাভাবিক মুকুল ঝরা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। বাংলাদেশের গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের তথ্যের আলোকে এর প্রধান কৌশল হলো সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত কিন্তু নিয়ন্ত্রিত সেচ, সঠিক ছাঁটাই, হপার ও অন্যান্য পোকা পর্যবেক্ষণ, পাউডারি মিলডিউসহ রোগের সময়মতো ব্যবস্থাপনা এবং পরাগায়নকারী পোকা সংরক্ষণ। বিশেষ করে মুকুল আসার সময় অকারণে বারবার কীটনাশক প্রয়োগ না করে লক্ষণ দেখে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর 2,4-D, NAA, বোরন বা অন্য কোনো বৃদ্ধিনিয়ন্ত্রক ব্যবহারের ক্ষেত্রে গবেষণার তথ্যকে প্রেক্ষাপট হিসেবে নিয়ে স্থানীয় বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও বাংলাদেশে অনুমোদিত ব্যবহারবিধি অনুসরণ করা জরুরি। সঠিক সময়ে সঠিক পরিচর্যা করলে আমের মুকুল সুস্থ রাখা, ফল সেট বাড়ানো এবং শেষ পর্যন্ত বাগানের উৎপাদনশীলতা ও কৃষকের আয় বাড়ানো সম্ভব।
তথ্যসূত্র
১. বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI), ফল গবেষণা কেন্দ্র, রাজশাহী: আমের ফল ঝরা কমানোর ওপর গবেষণা; 2,4-D, NAA, IAA ও ইউরিয়ার বিভিন্ন প্রয়োগের প্রভাব।
২. বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI), আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, চাঁপাইনবাবগঞ্জ: বাংলাদেশের বিভিন্ন আমের জাতের fruit set ও fruit drop-এর ওপর মাঠ গবেষণা।
৩. বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (BAU Research System): আমের flower and fruit dropping এবং honeybee foraging behaviour বিষয়ে গবেষণা কার্যক্রম।
৪. বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা প্রতিবেদন: আমে পানি ব্যবস্থাপনা, ফল ঝরা, ফল ফাটা ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত মাঠ গবেষণা।
৫. Bangladesh Journal of Agricultural Research: বাংলাদেশে বিভিন্ন আমের জাতের ফুল আসা, ফলন ও ফলন-সম্পর্কিত বৈশিষ্ট্য নিয়ে BARI গবেষণা।